How Prothom Alo Became Part of a Coordinated PR Campaign for a Private Hospital
বেসরকারি ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে গত ২৯ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রাহেলা খাতুন। তার স্বজনের সন্দেহ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবেহলায় এই মৃত্যু হয়েছে। তারা চিকিৎসায় অবহেলার জন্য বিচার চান সংশ্লিষ্টদের। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোন ধরনের চিকিৎসা অবহেলা ঘটার বিষয় অস্বীকার করে। কিন্তু হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট এক স্বাস্থ্যকর্মীকে দায়িত্ব অবহেলার জন্য শোকজ নোটিশ দেয়া হয়েছে। রাহেলার ছেলে রায়হান হোসেন রুদ্র সেই নোটিশ সংগ্রহ করেন এবং লিগাল নোটিশ পাঠান হাসপাতালকে। জবাব না পেয়ে আদালতে মামলা করেন এবং মাকে ‘চিকিৎসা অবহেলায়’ হারানো কষ্টে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি শুরু করেন। একই সাথে অভিযোগ দায়ের করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও।
ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কর্তৃপক্ষ যখন এমন চাপের মুখে তখন ওই হাসপাতালের পক্ষে এবং রায়হান ও তার পরিবারের বিপক্ষে শুরু হয় সংঘবদ্ধ অনলাইন ক্যাম্পেইন। অন্তত ৮টি ভুয়া ওয়েবসাইটে এক যোগে প্রচার করা হয় যে, রায়হান ও তার স্বজনরা মিলে হাসপাতালে ভাঙচুর করেছেন এবং হাসপাতালের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ প্রচার করছেন। যদিও রায়হান রুদ্র যখন ভাঙচুরের প্রমাণ চেয়েছেন কর্তৃপক্ষের কাছে তখন তারা কিছুই দেখাতে পারেননি। ভুক্তভোগীর স্বজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পাশাপাশি ভুয়া ওয়েবসাইটগুলোর প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘নির্দোষতা’ তুলে ধরা হয়।
যে সময়ে এই ৮টি ভুয়া ওয়েবসাইট ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষে সংঘবদ্ধ ক্যাম্পেইন করেছে প্রায় একই সময়ে দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোও এই হাসপাতালটির ভুয়সী প্রশংসা করে ‘সংবাদ’ আকারে দীর্ঘ (৪ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড) প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত ২৪ জুন প্রথম আলোর ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদনটির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সেবায় ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ”। পুরো প্রতিবেদনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালটির প্রশংসা আর ইতিবাচক কাজের বিবরণে ভরপুর।
তবে দ্য ডিসেন্ট এর পক্ষ থেকে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষের কাছে আলোচ্য ‘সংবাদ প্রতিবেদন’ এর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জানানো হয়, এটি অর্থের বিনিময়ে প্রকাশ করা একটি বিজ্ঞাপন ছিল। এবং ১৪ জুলাই দ্য ডিসেন্ট এর যোগাযোগের পর প্রথম আলোর ফেসবুক পেইজে প্রতিবেদনটির ক্যাপশনে ‘#বিজ্ঞাপনবার্তা’ বলে একটি নোট যুক্ত করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে প্রথম আলোর ডেপুটি হেড অব অনলাইন (রিপোর্ট) রাজীব আহমেদ লিখিত বক্তব্যে জানান, “এই ভিডিও বিজ্ঞাপন বার্তা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। আমরা দেশের বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে এ ধরনের ভিডিও প্রচার করেছি। এর সংখ্যা ২৫ এর বেশি। এটি তারই অংশ। তবে ভুলবশত বিজ্ঞাপন বার্তা লেখা হয়নি। আপনারা দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর বিজ্ঞাপন বার্তা কথাটা যুক্ত করেছি।”
এক বছর আগের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে একই হাসপাতালের অনিয়মের চিত্র
ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে প্রথম আলো “নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সেবায় ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ” শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে গত ২৪ জুন। ‘সংবাদ’ হিসেবে উপস্থাপিত এই প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছে, “দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে টঙ্গী ও আশপাশের বিস্তীর্ণ শ্রমজীবী অধ্যুষিত অঞ্চলের মানুষের জন্য মানবিক, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে আসছে ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের এই অঞ্চলে হাসপাতালটি গরিব নিম্ন আয়ের ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এক নির্ভরতা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।”
আরও বলা হয়েছে, “স্বাস্থ্য সেবা যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকে এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে শুরু থেকেই হাসপাতালটি স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করে আসছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো রোগী যেন চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত না হন বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়।”
প্রতিবেদন শেষ করা হয়েছে, “মানবিক মূল্যবোধ, রোগী বান্ধব পরিবেশ এবং সেবার মান বজায় রাখার কারণে হাসপাতালটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে স্বল্পমূল্যে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা সেবা মানবিক আচরণ এবং আন্তরিক সেবার মাধ্যমেই ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এ অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। স্বাস্থ্য সেবাকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এনে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।”
কিন্তু মাত্র এক বছর আগে (২০২৫ সালের মার্চ) প্রথম আলোতে “শর্ত না মানাই বেসরকারি মেডিকেলের অভ্যাস” শিরোনামের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই হাসপাতালটির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নানান অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে প্রথম আলো লিখেছিল, “প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে রোগী কম থাকে, কলেজ ও হাসপাতালে পরিসর (স্পেস) ঘাটতি আছে, ৩টি লেকচার থিয়েটার ও ৩০টি টিউটোরিয়াল রুমের কমতি আছে, ৬টি বিভাগে ৩৭ জন শিক্ষকের ঘাটতি আছে। সুপারিশে বলা হয়, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ এমবিবিএস ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত ও আসনসংখ্যা ১৩০ থেকে ৫০ নির্ধারণ করা যেতে পারে। আরও বলা হয়, কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হলে ঘাটতি পূরণ করতে হবে।”
আরও লেখা হয়েছে, “প্রতিবেদনের মতামত অংশে বলা হয়েছে, কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। আরও বলা হয়েছে, ‘এক বছরের মধ্যে ঘাটতিসমূহ পূরণ করা না হলে পরবর্তীতে মেডিকেল কলেজটির অনুমোদন স্থগিত করা হবে।”
প্রথম আলো আরও লিখেছিল, “শর্ত পূরণ না করার ঘটনা ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে আগেও ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে কলেজ পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং কলেজ কর্তৃপক্ষকে দেওয়া মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে দেখা যায়, কলেজটি নিয়মিতভাবে শর্ত ভঙ্গ করে চলেছে। আবার শর্ত পুরোপুরি পূরণ না করলেও কলেজটি চালিয়ে যাওয়ার বা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।”
শুধু প্রথম আলো নয়, নিকট অতীতে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও হাসপাতালটির বিরুদ্ধে নানান ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
এক বছরের ব্যবধানে প্রথম আলোর প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনে (যেটি দ্য ডিসেন্ট এর যোগাযোগের পর বিজ্ঞাপন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে) দেয়া তথ্যের মধ্যে গরমিল আছে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ-এর একজন সহযোগী অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলম বলেন, “আসলে দুটো রিপোর্ট পাশাপাশি রেখে যদি আমরা দেখি বা পড়ি তাহলে আমরা আসলে মেলাতে পারছি না হয় প্রথমটা ভুল, নয়তো দ্বিতীয়টা ভুল। প্রথমটাতে যেহেতু ডিটেইলে বিভিন্ন ধরনের সংখ্যা নিয়ে আলাপ করা হয়েছে এবং সেখানে বিভিন্ন সময় যে পরিদর্শন প্রতিবেদন তার সংক্ষিপ্ত সার তুলে ধরা হয়েছে। ফলে প্রথমটাকে আমরা বেশি বিশ্বাস করতে পারি। কিন্তু পরের রিপোর্টে আমরা সেটা পাইনি। পরের রিপোর্টটা অনেক বেশি গালগল্প মনে হয়েছে।”

ড. আলম আরও বলেন, “এবং এখানে একটা সন্দেহ দানা বাঁধে যে, আসলে এক বছরের মাথায় একটা মেডিকেল কলেজ যার বয়স ২৬ বছর; ২৫ বছরে কোনো ডেভেলপমেন্ট হয়নি এক বছরের মাথায় সে অ্যাব্রাপ্ট ডেভেলপমেন্ট করে সেটা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে ঐ অঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে প্রিয়, সাশ্রয়ী, মানবিক, নির্ভরযোগ্য, মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবা প্রদান করে তাদের হৃদয়ে স্থান করেছে। ফলে এই প্রতিবেদন নিয়ে আমাদের একটা প্রশ্ন থেকে যায়।”
প্রথম আলোর বিজ্ঞাপনমূলক প্রতিবেদনটি প্রথমে কোন ধরনের ডিসক্লেইমার ছাড়াই ‘সংবাদ’ আকারে প্রকাশিত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে খোরশেদ আলম বলেন, “এটা সংবাদিকতার নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। পাশাপাশি যখন একটি প্রতিষ্ঠানের বহু বছরের অনিয়ম নিয়ে আগে প্রথম আলো খবর পরিবেশন করেছে, ফলে এখন সেই প্রতিষ্ঠানকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে কোন প্রতিবেদন করতে হলে আগের অভিযোগগুলোর বিষয়ে একটা আপডেট দিতে হবে। সেগুলো সমাধান হয়েছে কিনা? আর এরকম অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ‘সংবাদ’ আকারে বিজ্ঞাপন প্রচার করা সাংবাদিকতার নৈতিকতা লঙ্ঘনের চেয়েও বেশি কিছু।”
প্রসঙ্গত, ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুবিন খানের মালিকানাধীন কোম্পানি ‘এথিকস অ্যাডভান্সড টেকনোলজিস লিমিটেড (EATL)’ এবং প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রতিবছর ‘ইএটিএল-প্রথম আলো অ্যাপ কনটেস্ট’ নামে একটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। এতে তৎকালীন সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division), বিশ্বব্যাংক, কানাডা সরকার এবং চ্যানেল আই-এর মতো দেশি-বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠান পৃষ্ঠপোষক ও অংশীদার হিসেবে যুক্ত ছিল।
মায়ের মৃত্যু নিয়ে রাহয়ান রুদ্রের অভিযোগ
মৃত রাহেলা বেগমের ছেলে রুদ্র মামলায় অভিযোগ করেন, গত ২৮ ডিসেম্বর, সন্ধ্যা ৬টায় তার মায়ের শরীরে অ্যালবুমিন পুশ করা হয়। রাত ৯টার দিকে অবস্থার অবনতি ঘটতে শুরু করে। তখন রায়হান ও তার বোন কর্তব্যরত ডাক্তার আল আমিন হোসাইনকে মূল চিকিৎসক ডা. সাইদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন। তবে ডা. আল আমিন ‘বেশি রাত হয়ে গেছে’ এই অজুহাতে যোগাযোগ করতে অনীহা জানান। পরে রায়হান ও তার বোন জোরাজুরি করলে তিনি ডা. সাইদুরের সাথে কথা বলেন। ডা. সাইদুর জানান, এটি ঔষধের সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে পরিবার রোগীকে আইসিউতে স্থানান্তরের জন্য কর্তব্যরত ডাক্তারকে অনুরোধ করলেও তিনি সেটির তোয়াক্কা করেননি। এভাবে ১ ঘন্টা সময় পার হওয়ার পর রোগীর আর পালস পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে আইসিউতে নিলে আইসিউ’র কর্তব্যরত ডাক্তার রোগী গ্রহণ করতে অস্বীকার করে জানান, তিনি ইতিমধ্যেই মারা গিয়েছেন। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
রায়হান আরও অভিযোগ করেন, এর দু’দিন আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মায়ের তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন একজন চিকিৎসক নেবুলাইজার দেওয়ার নির্দেশ দিলেও কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্সদের চরম অবহেলার কারণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি ২ ঘন্টা পর রাত ৮টায় এসেও তারা দেখেন নেবুলাইজার দেওয়া হয়নি।
রায়হান রুদ্রের অভিযোগ, মায়ের মৃত্যুর পর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শেখ মাহমুদ হাসান ও ডিউটি অফিসার ডা. আল আমিন হোসাইন উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে চিকিৎসায় নিজেদের গাফিলতি ও অবহেলার কথা মৌখিকভাবে স্বীকার করেন। সে সময় তারা সুষ্ঠু মীমাংসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করেন। কিন্তু পরবর্তীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আর কোনো যোগাযোগ করেনি।
মামলা তুলে নিতে সমঝোতার প্রস্তাব ও হুমকির অভিযোগ
রাহেলা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার ‘চিকিৎসা অবহেলা’র অভিযোগ করার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেটিকে উড়িয়ে দিলে ৯ ফেব্রুয়ারি একটি লিগাল নোটিশ পাঠান ছেলে রায়হান হোসেন রুদ্র। এর কোন জবাব না পেয়ে ১৬ মার্চ আদালতে মামলা করেন (নং ৮৫/২৬)।
রুদ্র জানান, এরপর ফেসবুকে ‘হাসপাতালে অবহেলায়’ তার মায়ের মৃত্যুর বিষয়ে লেখালেখি শুরু করলে অব্যাহত হুমকি আসতে থাকে।
“নানান মানুষ দিয়ে হুমকি দিয়েছে। এসবে আমি থেমে যাইনি। ২৬ এপ্রিল আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি অভিযোগ করি। এই অভিযোগের পরে ১৪ মে থেকে আমার পরিবারের বিরুদ্ধে ভুয়া খবর ছড়ানো শুরু কয়েকটা ওয়েবসাইট থেকে। এসব রিপোর্টে বলা হয়েছে আমরা নাকি হাসপাতালে ভাঙচুর করেছি। কিন্তু আমরা এমন কিছুই করিনি। হাসপাতাল কর্তৃক্ষের কাছে চেয়েছিলাম যে, আমাদের ভাঙচুরের কোন ছবি/সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে দেখান। তারা দেখাতে পারেনি”, বলেছেন রুদ্র।
ভুয়া ওয়েবসাইটে তার পরিবারের বিরুদ্ধে অসত্য খবর দেখে রুদ্র আবারও ২১ মে এই বিষয়ে লিগাল নোটিশ পাঠান ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কর্তৃপক্ষকে।
“এরপর ২৪ মে তারিখে ওরা আমি, আমার বোন ও আমার সাক্ষীদের নামে মিথ্যা মামলা করে। এরপরে আমি আবার ফেসবুকে লেখালেখি শুরু করি। তখন গাজীপুর পশ্চিম থানার ওসি ৪ জুন আমাকে ডেকে নিয়ে নানারকম ভয় ভীতি দেখায়”, দাবি করেছেন রুদ্র।
রুদ্র বলেন, “ওসি আমাকে বলেন, আপনার বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইবুন্যালে মামলা হবে। আপনি বিপদে পড়বেন। গুমও হয়ে যেতে পারেন। দেখেন না ইতিপূর্বে কত মানুষ গুম হইছে, কোন বিচার হইছে তাদের? ১৭ বছরে যে গুম হয়েছে হার হাড্ডি ও এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে জিনিস দুই টাকা দিয়ে কেনা জানা সেটা ২০০ টাকা দিয়ে কেনা যায়। তারা সব কিনে ফেলবে তলে তলে। তারা অনেক অর্থবান তাদের সাথে আপনি পারবেন না। আপনি পোস্টগুলো ডিলিট করে হাসপাতালের এমডির কাছে সরি বলেন।”
হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, “সে একটা মামলা দায়ের করেছে, পিবিআই সেটার তদন্ত করছে। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটা অভিযোগ করেছে যে, সে তাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লেখালেখি করছে। আমি তাকে ডেকেছি এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য। আমি তাকে সতর্ক করেছি তার বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইবুন্যালে মামলা হতে যাচ্ছে। সে আদালতে মামলা করেছে, সেটার তদন্ত চলছে, তার উপর আবার লেখালেখি করার কী দরকার! তাকে সতর্ক করাটা আমার অন্যতম একটা ভুল হয়েছে। এই মুহূর্তে তাকে আমার ভালো ছেলে মনে হচ্ছে না।”
ওসি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “কেউ একটা ম্যানহোলে পড়ে যাচ্ছে, পড়ে গেলে তার হাত পা ভাঙ্গবে, আর পড়ার আগে তাকে টেনে ধরলে হয়তো একটু ব্যথা পাবে। এখন টেনে ধরাটা যদি অপরাধ হয়ে যায় তাহলে তো আর কিছু বলার নাই।”
এদিকে চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি সমঝোতার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন রুদ্র।
তিনি বলেন, “ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন আমাকে ফোন করে চেম্বারে ডেকে নিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। মামলা তুলে না নিলে বড় ধরণের ক্ষতি করা হতে পারেও বলেছেন।”
রায়হান হোসেন রুদ্র আরও দাবি করেন, সমঝোতার জন্য তাকে টাকা প্রদানেরও অফার করেছেন আইনজীবী।
মোহাম্মদ হোসেনের কাছে দ্য ডিসেন্ট এর পক্ষ থেকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি তাকে ডাকিনি, সে নিজেই কথা বলার জন্য আমার চেম্বারে এসেছে। আমি তাকে বুঝিয়েছে যে, আপনার মা তো মারা গেছে। তাকে তো আর ফিরে পাবেন না, আপনি হাসপাতালের সাথে আপস করে ফেলেন। কারণ এটা আপস করার মতই বিষয় ছিল। এটা কোন টাকার বিনিময়ে ছিল না। এটা কোন সিরিয়াস আলাপ ছিলো না। সাধারণ একটা বিষয় ছিল।”
তবে মোহাম্মদ হোসেনের চেম্বারে ধারণ করা রুদ্র ও হোসেনের মধ্যকার কথোপকথনের একটি ভিডিওতে মোহাম্মদ হোসেনকে বলতে শোনা যায়, “যাই হইছে হইছে, টুকটাক সমস্যা হবে, সমাধান হবে, আমার বক্তব্য অন্য কিছু না। আমার বক্তব্য হলো মা তো আর ফেরত দিতে পারবো না। এর মধ্যেও যেহেতু আপনি একটা মামলা করছেন, লিগ্যাল নোটিশ দিছেন, আপনি খরচপাতি নিয়ে মিটমাট করে ফেলেন।”
মোহাম্মদ হোসেনকে ভিডিওটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “আপনি তো বুদ্ধিমান মানুষ, ওইটা তো ভিডিওতে অনেক কিছু হইতে পারে, ভিডিও এডিট হইতে পারে, অনেক কিছু হইতে পারে। আমি এ ধরণের কোন কথা বলিনাই।”

তবে দ্য ডিসেন্ট এর যাচাইয়ে ভিডিওটিতে এডিটের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এবং ভিডিওটি মোহাম্মদ হোসেনের চেম্বারেই ধারণ করা বলা নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডিসেন্ট।
রুদ্র ১৬ মার্চ তারিখে একটি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। সেখানে মোহাম্মদ হোসেন নামে আরেক স্থানীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ করেছেন।
সাধারণ ডায়েরি মতে, একটি মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে তাকে হুমকি প্রদান করা হয়।
এই নম্বরে দ্য ডিসেন্ট এর পক্ষ থেকে ফোন করলে মোহাম্মদ হোসেন নামের এই দ্বিতীয় ব্যক্তি (প্রথমজন হাসপাতালের আইনজীবী) রিসিভ করে জানান, তিনি স্থানীয় ৪৯ নং এরশাদনগর ওয়ার্ড থেকে ইতিপূর্বে ঘুড়ি মার্কায় নির্বাচন করেছিলেন।
রায়হান রুদ্রকে হুমকি দিয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, “এটা একটা ভুল বুঝাবুঝি ছিল। আমরা পরে মিলে গেছি। হসপিটাল কর্তৃপক্ষ থেকে আমাকে রিকুয়েস্ট করছে বিষয়টা একটু দেখার জন্য। তাই আমি কল দিছি কথা বলার জন্য। কিন্তু আমি জানতাম না সে (রায়হান) আমার বন্ধু নয়নের ভাগিনা। তো ফোন দেওয়ার পর ও আমাকে চিনে নাই, এজন্য একটু রাগারাগি হইছে। এছাড়া কিছু না।”
মোহাম্মদ হোসেন দাবি করেন তিনি এখন রায়হান রুদ্রের পক্ষে আছেন। কোন সহযোগিতা লাগলে করবেন।
এই প্রতিবেদককে অনুরোধ করে তিনি বলেন, “আপনারা এটা নিয়ে লেহালেহি করেন। বিষয়টা ধামাচাপা পড়ে গেছে। আপনারা লেহালেহি করেন, পরে আমরা গিয়ে ধরবো।”
হাসপাতালে অভ্যন্তরীণ শোকজ নোটিশ
রাহেলার মৃত্যুর পর ৪ জানুয়ারি জুই আলম নামের একজন ইন্টার্ন নার্সকে দায়িত্ব অবহলোর জন্য দায়ী করে প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক স্বাক্ষরিত একটি কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়।
নোটিশে বলা হয়, “গত ২৫/১২/২০২৫ইং তারিখে রাহেলা খাতুন নামে ৫৫ বছর বয়সের একজন রোগী যার পেসেন্ট কোর্ড: ৮৫০৯৯১, অধ্যাপক ডা: মো: সাইদুর রহমান-এর অধীনে Enteric Fever è DM, Hyponatrimia, Ostreoporosis, Obs-jundice, Hypo Albumin, PMS (Premenstrual Syndrom) সমস্যা নিয়ে সুপিয়র ফিমেইল ওয়ার্ডে ভর্তি হয়। আপনার ডিউটি ছিল ভিআইপি কেবিনে সেখান থেকে আপনি সুপিয়র ফিমেইল ওয়ার্ডে এসে উপরোক্ত রোগীর অসম্পূর্ণ মেডিসিনের তালিকা প্রদান করেন। যার ফলে রোগীর সঠিক সময়ে সন্ধ্যা ৬:০০ টার সময় নেবুলাইজার শুরু করার কথা থাকা সত্ত্বেও রাত ৮:০০টা পর্যন্ত ও রোগীকে নেবুলাইজার দেয়া সম্ভব হয়নি এবং রোগীর লোকজন ক্ষিপ্ত হয়। ইহা চরমভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার সামিল। যাহা চাকুরী বিধি, শৃঙ্খলা এবং হাসপাতালে নার্সিং সেবা প্রদানের পরিপন্থি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এইরূপ অপরাধের জন্য কেন আপনার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবেনা তার ব্যাখ্যা এই পত্র প্রাপ্তির ৩(তিন) কার্যদিবসের এর মধ্যে লিখিত আকারে নিম্নস্বাক্ষরকারীর বরাবর জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।”
দায়িত্ব অবহেলার অভ্যন্তরীণ শোকজের ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল (অব:) সাজ্জাদ জিলানি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “রোগী অভিযোগ তুললে সেটা জানতে চাওয়া হবে, এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। শোকজ করা মানে কিন্তু এটা নয় যে অভিযোগ সত্য। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সরকারি তদন্ত টিমের পরিদর্শন রিপোর্টে উল্লেখিত ঘাটতিগুলোর ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা একটা রুটিন ব্যাপার। প্রতিবছরই পরিদর্শনে আসে উনারা, উনারা উনাদের অবজারভেশন দেন আমরা সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করি।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি
রাহেলার মৃত্যুতে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে চিকিৎসা অবহেলা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন তার ছেলে সেটির প্রেক্ষিতে গত ১১ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর অধিদপ্তর শহীদ তাজউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র রায়কে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটির একজন সদস্য দ্য ডিসেন্টকে জানান, কমিটি চিকিৎসা অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে।
তিনি বলেন, “রায়হান যেসব অভিযোগ তুলেছে তার বিপরীতে হসপিটাল কর্তৃপক্ষ যেসব ডকুমেন্ট উপস্থাপন করেছে তার মধ্যে সাংঘর্ষিক ব্যাপার আছে। যেমন রায়হান দাবি করেছে তার মাকে নেবুলাইজেশন দেওয়া হয়নি, কিন্তু হসপিটাল কর্তৃপক্ষের দাবি তারা নেবুলাইজেশেন দিয়েছে। কিন্তু নেবুলাইজেশন দেয়ার প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে।”
তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র রায় দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “এটার এখনও কাজ চলছে। আমরা উভয়পক্ষের সাথে কথা বলেছি, তাদের একসাথে বসিয়েছি। ওখানে যারা কাজ করে তাদের সাথে আলাদা করে কথা বলেছি। আমরা দেখছি কোথাও কোন গ্যাপ ছিল কিনা, গাফিলতির কোন বিষয় ছিল কিনা। রিপোর্ট দিয়ে দেওয়া হবে।”
হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল (অব:) সাজ্জাদ জিলানি বলেন, “উনি মামলা করেছেন, সেটার তদন্ত চলছে, তদন্তেই সত্য বেরিয়ে আসবে। আমি এ বিষয়ে আর বেশি কিছু বলতে চাই না।”
৮টি ভুয়া ওয়েবসাইটে সংঘবদ্ধ ক্যাম্পেইন
মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় যেগুলোতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ওঠে। একই সাথে তার ছেলে রায়হান রুদ্র বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে একের পর এক অভিযোগ দায়ের এবং সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি করতে থাকলে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে একযোগে অন্তত ৮টি ওয়েবসাইট থেকে রায়হান ও পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাফাই গেয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
ভুয়া পোর্টালগুলো হলোর নাম হলো: dailyjanakantho, dailyindependentbd, dailydhakatimes, businesspost24, chutirsomoy, khaborakhabor24, ekattorsomoy ও banglapratidin.

মূলধারার দৈনিক জনকন্ঠের ওয়েবসাইটের ঠিকানা হলো dailyjanakantha.com; এই পত্রিকার লোগো হুবহু কপি করে ওয়েব এড্রেসের শেষে ‘a’ এর স্থলে ‘o’ বসিয়ে হুবহু তৈরি করা হয়েছে dailyjanakantho.com নামের ভুয়া ওয়েবসাইটটি যেখানে পত্রিকার ঠিকানা, সম্পাদক ও প্রকাশক কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি।
সঙ্ঘবদ্ধ ক্যাম্পেইনে অংশ নেয়া dailyindependentbd নামের পোর্টালটিও বেক্সিমকো গ্রুপের মালিকানাধীন পত্রিকা The Independent এর ওয়েবসাইট নকল করে তৈরি করা হয়েছে। এই ওয়েবসাইটটিতেও যোগাযোগের ঠিকানা, সম্পাদক, প্রকাশকের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

একইভাবে অন্য ওয়েবসাইটগুলোতেও যোগাযোগের ঠিকানা কিংবা সম্পাদক প্রকাশকের নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি।
দ্য ডিসেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এই ৮টি ওয়েবসাইট ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে খোলা হলেও সবগুলো একটি ইমেইল ঠিকানা ব্যবহার করে নিবন্ধন করা।

ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে কেউ বিরোধে জড়ালে তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া পোর্টালগুলো থেকে এক যোগে প্রচারণা চালানো হয় বলে প্রমাণ পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট। এ ধরণের সঙ্ঘবদ্ধ প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইনের শিকার হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির একজন সাবেক নারী চিকিৎসক ও একজন সাবেক নারী শিক্ষক।

এই পোর্টালগুলোর সাথে ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কোন সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চাইলে পরিচালক কর্নেল (অব:) সাজ্জাদ জিলানি বলেন, “আমি এ ব্যাপারে আমি কিছু জানিনা। ওয়েবসাইট যে ক্লোন করা যায় সেটাই তো আমি জানি না।”
ইমেজ সংকটে পড়লেই মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনী প্রতিবেদন
একদিকে ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেলের সাথে কারো বিরোধ হলে তার বিরুদ্ধে ভুয়া ও নামসর্বস্ব ভূঁইফোড় ওয়েবসাইটে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে দেখা যায়, যখনই প্রতিষ্ঠানটি যখনই বড় ধরণের ইমেজ সংকটে পড়ে তখনই মূলধারার গণমাধ্যমে ইতিবাচক বিজ্ঞাপনী প্রতিবেদন প্রচারিত হয়।
২০২৪ সালের জুন মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত পরিদর্শক দল বিভিন্ন ঘাটতি শনাক্ত করে পরের বছর থেকে এমবিবিএস ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত ও আসনসংখ্যা ১৩০ থেকে ৫০ নির্ধারণ করার সুপারিশ করলে প্রতিষ্ঠানটি ইমেজ সংকটে পড়ে। এরপরই ওই বছরের ২৩ অক্টোবর ডিবিসি নিউজে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে ৬ মিনিটের একটি প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। প্রতিবেদনটিতে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ইতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনটিতে এটি বিজ্ঞাপনী প্রতিবেদন নাকি স্বাধীন অনুসন্ধান সে বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ ছিল না।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১১ মার্চ দৈনিক প্রথম আলো “শর্ত না মানাই বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অভ্যাস” শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করলে নেতিবাচক আলোচনায় উঠে আসে প্রতিষ্ঠানটি। এরপরই ২০ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকে “বিশ্বমানের শিক্ষা ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার বিভিন্ন ইতিবাচক দিক ও হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার উন্নত মানের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়।
ডিবিসি নিউজের প্রতিবেদনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে চ্যানেলটির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রুবেল বলেন, “এটা একটা পেইড প্রমোশনাল ভিডিও ছিল। আমরা এ ধরণের ভিডিও প্রচার করি। তবে আগে যেটা হতো বিজ্ঞাপন ট্যাগ লাগানো থাকতো না। বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান অনেক সময়ই এগুলো প্রতিবেদন হিসেবে উল্লেখ করতো। এতে অনেকে বিভ্রান্ত হতো। সে কারণে আমরা এখন থেকে এ ধরণের ভিডিওতে বিজ্ঞাপন ট্যাগ লাগিয়ে দিই। আর ওই ভিডিওটি আমাদের ধারণ করা ছিল না। তারাই সরবরাহ করেছিল। আমরা শুধু প্রচার করেছি।”
মুবিন খানের রাজনৈতিক প্রভাব
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন মুবিন খান। এছাড়াও আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন, দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী নীলুফার আহমেদ, প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, হাসিনার উপদেষ্টা কুখ্যাত হলমার্ক কেলেঙ্কারির জনক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মুবিন খানের।

ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেয়ার লিমিটিডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। মোদাচ্ছের আলীর দুই কন্যা মোনা আলী ও সাদিয়া আলী রয়েছেন কোম্পানির পরিচালক বোর্ডে।
মুবিন খানের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেয়ার লিমিটেডের বোর্ড অব ডিরেক্টরস-এ পরিচালক হিসেবে রয়েছেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সীমান্তিক এনজিও’র প্রতিষ্ঠাতা আহমদ আল কবির। আহমদ আল কবির ২০০৯ সাল থেকে দুই মেয়াদে মোট ৬ বছর রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে সিলেট-৫ আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশন চেয়ে না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন তিনি। আহমদ আল কবির সাবেক অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিত ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের আত্মীয়। আহমদ আল কবির ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেয়ার এর অন্যতম শেয়ারহোল্ডার।
কোম্পানিটির বোর্ড অব ডিরেক্টরস এর আরেক সদস্য জাতীয় অধ্যাপক ড. শাহলা খাতুন আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও আব্দুল মোমেনের আপন বোন। তিনি কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডার হিসেবেও রয়েছেন।
হাসিনার পতনের পর মুবিন খান বিএনপির সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টায় আছেন। সম্প্রতি তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সাথে একটি বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
এম এ মুবিনের ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এথিকস এডভান্স টেকনোলজি লিমিটেড (ইএটিএল) বিগত আওয়ামী আমলে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজস্ব ও আইসিটি খাতের ডিজিটালাইজেশনে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই ডজনেরও বেশি প্রজেক্টের কাজ পেয়েছে।
রাহেলা খাতুনের মৃত্যুতে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ নিয়ে দৈনিক কালের কণ্ঠ ২৪ এপ্রিল প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় তৎপর হয়ে ওঠে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর দিনই অর্থাৎ ২৫ এপ্রিলে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেনকে কলেজে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কলেজ সম্পর্কে শওকত হোসেনের প্রশংসামূলক বক্তব্য ভিডিও ধারণ করে সেটি কলেজের ফেসবুক পেজে পোস্ট করে বুস্ট করা হয়।
১ মে অর্থাৎ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে কলেজটিতে একটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়, যেখানে যমুনা টেলিভিশন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন, নিউজ টোয়েন্টি ফোর, এসএ টিভি, নাগরিক টিভি, জিটিভি, বিজয় টিভি এবং আনন্দ টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম উপস্থিত ছিল।
৩ মে কলেজটির ২৭ ব্যাচের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। এদিন উপস্থিত ছিল নিউজ টোয়েন্টি ফোর, এসএ টিভি, বিজয় টিভি, এশিয়ান টিভি, আনন্দ টিভি, বাংলা ভিশনসহ আরো অনেক গণমাধ্যম।
গত ২ মে রাতে কলেজটির ২০২২ - ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র কে এম নুরুল আমিন নিসান মৃত্যুবরণ করেন। কলেজের প্রিন্সিপাল এস এম ইকবাল চৌধুরী নিসানের জানাযায় যাওয়ার জন্য তার সহপাঠীদের জন্য কলেজের বাস দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বিএনপি নেতা মঈন খানের আতিথেয়তায় ব্যস্ত থাকায় কলেজ কর্তৃপক্ষ নিসানের মৃত্যুতে শোকবার্তা জানাতে দেরি করে। এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং ৪ মে কলেজ ক্যাম্পাসে আন্দোলন করে।
গত ৬ জুন রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন হোটেল ঢাকার বলরুমে এম এ মুবিন খান তার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইএটিএল ইনোভেশন হাব থেকে “ব্রিটিশ-চাইনিজ বিজনেস এন্ড ইনভেস্টমেন্ট ডেলিগেশন” নামে একটি নৈশভোজের আয়োজন করে। এ অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, এমপি; বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, এমপি; এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, এমপি; ব্যারিষ্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। অনুষ্ঠানটির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে জিটিভি, দৈনিক যায়যায়দিন, কালবেলা, দৈনিক প্রথম আলো, চ্যানেল আই, আরটিভি, এশিয়া পোস্টসহ আরো অনেক গণমাধ্যম। (প্রথম আলোর নিউজ লিংক
মুবিন খানের আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এলাকার বিএনপি নেতা এ্যাডভোকেট জালাল খানকে।
সম্প্রতি মুবিন খান সচিবালয়ে গিয়ে বর্তমান মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীসহ আরও অনেকে।
এম এ মুবিন খান বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এসাসিয়েশন (বিপিএমসিএ) এর কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতির পদ আকড়ে ধরে ছিলেন ৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
মুবিন খান তার প্রতিষ্ঠানের নারীদের যৌন হয়রানি করেন বলে প্রমাণ হাতে এসেছে দ্য ডিসেন্টের। একাধিক নারী শিক্ষার্থীকে তার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর জন্য জোরাজুরি করেন তিনি। তবে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা জীবন ব্যহত হওয়ার ভয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। দ্য ডিসেন্ট এর কাছে এমন একাধিক অভিযোগের বেশ কিছু প্রমাণ এলেও ভুক্তভোগীরা কথা বলতে না চাওয়ায় সেসব প্রমাণাদি উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে মুবিন খানের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোন সাড়া মিলেনি।