Why Sharing Child Abuse Videos in Protest Can Further Harm Children
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু নিপীড়নের কোনো ভিডিও সামনে এলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা ও বিচারের দাবিতে অনেকেই সেটি নিজেদের প্রোফাইল, পেজ বা বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার করেন। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুর মুখ, পোশাক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অবস্থান গোপন করা হয় না।
সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকটি মাদরাসায় শিশুদের হেনস্তা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগসংক্রান্ত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দ্য ডিসেন্ট অভিযুক্ত শিক্ষকদের পরিচয়সহ একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিষয়গুলো আলোচনায় এলে অনেক ব্যবহারকারী প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভুক্তভোগী শিশুদের দৃশ্যও পুনরায় আপলোড করেন।
অনেক ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্যামেরার পেছনে থাকায় পুনঃপ্রকাশিত ভিডিওতে তার চেয়ে শিশুটিই বেশি দৃশ্যমান হয়। এভাবে একটি পোস্ট বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ, ইউটিউব চ্যানেল ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়লে মূল উৎস থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরও অসংখ্য কপি অনলাইনে থেকে যেতে পারে। এসব দৃশ্য শিশুটির সহপাঠী, প্রতিবেশী বা স্বজনদের কাছে পৌঁছালে তাকে সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
শিশু সুরক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো উদ্দেশ্যে করা এমন প্রচারও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করে এবং তাকে বুলিং, অপমান ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সংকটের মুখে ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সতর্ক হয়ে মূল পোস্ট বা অ্যাকাউন্ট মুছে দিতে পারেন, যা তাকে শনাক্ত করা এবং নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের কাজ কঠিন করে তোলে।
‘শিশুর ট্রমা আরও গভীর হয়’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী দ্য ডিসেন্টকে বলেন, যৌন হয়রানির মতো ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও ছবি গোপন রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“মূল বিষয়টি হলো তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং নিশ্চিত করা যে কোনোভাবেই তারা আরও ক্ষতির মুখে না পড়ে,” বলেন তিনি।
তার মতে, ছোট শিশুরা তাৎক্ষণিকভাবে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার গুরুত্ব পুরোপুরি না-ও বুঝতে পারে। কিন্তু বড় হওয়ার পর সেই ভিডিও সামনে এলে তাদের মধ্যে অস্বস্তি, লজ্জাবোধ, হীনম্মন্যতা ও মানসিক সংকট তৈরি হতে পারে।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও অন্যরা সংরক্ষণ করে রাখতে পারে। পরে সেগুলো অপব্যবহার, বুলিং বা শোষণের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।
অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, “শিশুটি ছবি প্রকাশের কারণেই প্রথমবার ট্রমার শিকার হয় না। নির্যাতনের মুহূর্তেই সে মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। ছবি প্রকাশ সেই ট্রমাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর করে তুলতে পারে।”
তার মতে, অনেকে দায়িত্ববোধ থেকে ঘটনা জানাতে বা প্রতিবাদ করতে গিয়ে শিশুর ছবি শেয়ার করেন। কিন্তু তারা বুঝতে পারেন না, একই কাজ শিশুটিকে নতুন করে হয়রানি ও অপমানের মুখে ফেলতে পারে।
ভিডিওটি সহপাঠী বা সমবয়সীদের হাতে পৌঁছালে শিশুকে নিয়ে কটূক্তি, বিদ্রূপ কিংবা বুলিংয়ের সুযোগ তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ভয়, লজ্জা ও অপমানবোধ শিশুর স্বাভাবিক জীবন, শিক্ষা ও সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ভাইরাল হলে সতর্ক হন অভিযুক্তরাও
আপত্তিকর কোনো ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি দ্রুত সতর্ক হয়ে যেতে পারেন।
তিনি মূল ভিডিও মুছে ফেলতে, অ্যাকাউন্টের নাম পরিবর্তন করতে কিংবা অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে পারেন। এতে তদন্তকারীদের পক্ষে মূল উৎস ও অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারীকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো ডাউনলোড করা ভিডিও বা স্ক্রিনরেকর্ড একেবারেই প্রমাণ নয়, এমনটি বলা ঠিক হবে না। এগুলো অভিযোগের সূত্র বা সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে শুধু একটি ডাউনলোড করা ভিডিও থেকে সেটি প্রথম কে প্রকাশ করেছিলেন, কখন প্রকাশ হয়েছিল কিংবা পরে সম্পাদনা করা হয়েছে কি না, তা সব সময় নিশ্চিত হওয়া যায় না।
সে কারণে মূল পোস্টের লিংক, অ্যাকাউন্টের ইউনিক ইউজারনেম, প্রকাশের তারিখ ও সময়, ক্যাপশন এবং পুরো পেজের স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
‘চেইন অব কাস্টডি’ কেন গুরুত্বপূর্ণ
ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে “চেইন অব কাস্টডি” বলতে প্রমাণটি কোথা থেকে, কখন ও কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পরে কার কাছে কী অবস্থায় ছিল, তার ধারাবাহিক নথি বোঝায়।
এই ধারাবাহিকতা থেকে তদন্তকারী বা আদালত বুঝতে পারে, প্রমাণটি সংগ্রহের পর পরিবর্তন বা বিকৃত করা হয়েছে কি না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুবার ডাউনলোড ও পুনঃপ্রকাশ করা ভিডিওর মূল উৎস শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। কোনো পোস্টে শুধু কেটে নেওয়া একটি দৃশ্য থাকলে তার আগে-পরে কী ঘটেছে, সেটিও বোঝা যায় না।
অন্যদিকে মূল পোস্টের লিংক, অ্যাকাউন্টের তথ্য এবং প্রকাশের সময়সহ ভিডিওটি সংরক্ষণ করা হলে এর সত্যতা যাচাই করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
তাই কোনো ভিডিও ভাইরাল করার চেয়ে প্রথমে নির্ভরযোগ্যভাবে তথ্য সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো বেশি কার্যকর হতে পারে।
আইন কী বলে
বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু।
আইনটির ৮১ ধারায় আইনের সংস্পর্শে আসা বা আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত কোনো শিশুর স্বার্থের পরিপন্থী প্রতিবেদন, ছবি বা তথ্য প্রকাশে বিধিনিষেধ রয়েছে, যদি তা দিয়ে শিশুটিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা যায়।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং তানজিম আল ইসলাম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান তানজিম আল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন, দেশের শিশু আইন এবং সাইবারসংক্রান্ত আইনে শিশুদের অনলাইনে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
“এমন কিছু করা যাবে না, যাতে শিশুদের পরিচয় প্রকাশ পায় কিংবা তাদের মানহানি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়,” বলেন তিনি।
তবে কোনো শিশুর মুখসহ ভিডিও প্রকাশ করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিশু আইনের ৮১ ধারায় অপরাধ হবে কি না, সেটি ঘটনার প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আইনি দায়ের প্রশ্নের বাইরেও ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সর্বোত্তম স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কীভাবে প্রতিবাদ করা যায়
অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা এবং শিশুর পরিচয় গোপন রাখা পরস্পরবিরোধী নয়। শিশুর মুখ বা অন্য শনাক্তকারী তথ্য প্রকাশ না করেও অপরাধের প্রতিবাদ করা সম্ভব।
কোনো আপত্তিকর ভিডিও নজরে এলে সেটি নিজের অ্যাকাউন্টে পুনরায় প্রকাশ না করে মূল পোস্টের লিংক ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
শিশুর পরিচয় প্রকাশ না করে ঘটনার ধরন, অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য তুলে ধরা যায়। ভিডিও ব্যবহার করা একান্ত প্রয়োজন হলে শিশুর মুখ, কণ্ঠ, পোশাকের শনাক্তকারী চিহ্ন অস্পষ্ট করতে হবে।
ভুক্তভোগী বা সচেতন নাগরিকরা নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করতে পারেন। জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যায়। নারী ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের সহায়তা নেওয়া যায়।
সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
শিশু নিপীড়নের ঘটনায় অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ভিডিও শেয়ার করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। কিন্তু সেটি ইন্টারনেটে কত দিন থাকবে, কোথায় পৌঁছাবে কিংবা ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার হবে, তার ওপর শেয়ারকারীর আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
অপরাধীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে গিয়ে শিশুর মুখ প্রকাশ করা হলে আলোচনার কেন্দ্রেও থেকে যায় শিশুটি। অভিযুক্ত ব্যক্তি অনলাইন থেকে সরে যেতে পারেন, কিন্তু শিশুর পরিচয়সহ ভিডিওর কপিগুলো থেকে যেতে পারে বছরের পর বছর।
ফলে যে শিশু একবার নিপীড়নের শিকার হয়েছে, প্রতিবাদের নামে একই ঘটনা ছড়িয়ে দিয়ে তাকে আবারও সেই ক্ষতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। অপরাধের প্রতিবাদ তাই এমনভাবে করতে হবে, যাতে অপরাধী সামনে আসে, কিন্তু শিশুটি নয়।