July Activists Targeted in Coordinated Attacks Across Multiple Countries

23 July 2026

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে জুলাই অভ্যুত্থানের সমর্থক, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা, ছাত্রনেতাদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে সংঘবদ্ধভাবে এসব আক্রমণ করা হয়েছে। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগপন্থী অ্যাকাউন্টগুলো থেকে এসব হামলার ভিডিও প্রকাশ করে হামলাকারীদের প্রতি সমর্থন ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়েছে।  

বিদেশে অন্তত ৮ জনকে লক্ষ্য করে হামলা বা হেনস্তার অভিযোগ

গত ২১ জুলাই ইতালির রোমের টর পিনাত্তারা এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর বনি আমিনকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হয়। দ্য ডিসেন্টের এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই হামলার নেতৃত্ব দেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ইতালি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন। 

হামলার পর আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বিভিন্ন ফেসবুক পেজে হামলার ভিডিও শেয়ার করে তাকে 'মৌলবাদী', 'দেশদ্রোহী', 'উগ্রবাদী' এবং 'ইসরায়েলপন্থী' আখ্যা দেওয়া হয়। 

বনি আমিন এর আগে লন্ডনেও হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন।

হামলার পর বনি আমিন ফেসবুক পোস্টে বলেন, তার রাজনৈতিক অবস্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থনের কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইতালির প্রশাসন ঘটনাটি তদন্ত করছে।

বিভিন্ন সময়ে বনি আমিনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের সমালোচনা এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে পোস্ট করতে দেখা গেছে।

এর আগে গত ১৫ জুন লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় এনসিপি নেতা এবং সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহকে দেওয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ডিম নিক্ষেপ করে। 

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখানে সহিংসতার চেষ্টা চালালে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে হামলাকারীদের সরিয়ে দেয়।

এ বছরের মে মাসে পর্তুগালের লিসবনের একটি পার্কে এনসিপির সিলেট জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মো. আকতার হোসেন ছাত্রলীগের কর্মীদের অতর্কিত হামলার শিকার হন। 

হামলাকারীরা তার দিকে ডিম নিক্ষেপ করে, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে এবং মারধর করে।

হামলার পর আকতার হোসেন ফেসবুক পোস্টে জানান, পর্তুগাল এনসিপির দায়িত্বশীলদের সাথে মিটিং শেষ হওয়ার পরপরই ছাত্রলীগের কর্মীরা পেছন থেকে অস্ত্রসহ তার ওপর এই হামলা চালায়। 

এই ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজেও তাকে আক্রমণকারীদের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে সরে যেতে দেখা যায়

২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরের বাইরে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়া এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনের ওপর আওয়ামী লীগের কর্মীরা ডিম নিক্ষেপ করে। এ সময় তাঁর সামনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাসনিম জারাও উপস্থিত ছিলেন 

এ ঘটনায় পুলিশ  আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মিজানুর রহমান চৌধুরী নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে আটক করে। পরে কুইন্স কাউন্টি ক্রিমিনাল কোর্ট মিজানুর রহমানকে জামিনে মুক্তি দেন। আদালত থেকে বের হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। 

২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে স্কুল অব আফ্রিকান অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ (সোয়াস) ক্যাম্পাসের বাইরে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে লক্ষ্য করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হামলার চেষ্টা করে। 

মাহফুজ আলম গাড়িতে রয়েছেন এমন ধারণা করে তারা বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি গাড়িতে ডিম নিক্ষেপ করে এবং গাড়িটির সামনে শুয়ে পড়ে সেটির গতিরোধেরও চেষ্টা করে।

তবে পুলিশের হস্তক্ষেপে তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার আকবর হোসেন সে সময়ে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মাহফুজ আলম মূলত অন্য একটি গাড়িতে করে নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছিলেন। 

পরবর্তীতে লন্ডনে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এই ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজ আমি আওয়ামী লীগের আক্রমণের কাছাকাছি পর্যায়ে ছিলাম’

২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বৈঠক শেষে দেশে ফেরার পথে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানবন্দরে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল হেনস্তার শিকার হন। 

সুইজারল্যান্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম জমাদার ও সাধারণ সম্পাদক শ্যামল খানের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি তাকে ঘিরে ধরে 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' স্লোগান দেয় এবং উত্ত্যক্ত করে।

পরবর্তীতে আসিফ নজরুলকে হেনস্তার ঘটনার পর সরকার ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে এবং জেনেভায় বাংলাদেশ মিশনের নিরাপত্তা ও প্রটোকল ব্যবস্থাপনায় অবহেলার অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়। 

সে সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেনেভা মিশনের শ্রম কাউন্সেলর মুহাম্মদ কামরুল ইসলামকে 'স্ট্যান্ড রিলিজ' করে দেশে ফেরার নির্দেশ দেয় এবং স্থানীয় কর্মী মিজানকে বরখাস্ত করে। 

২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্স এক বিবৃতিতে অভিযোগ করে, আওয়ামী লীগ লন্ডন প্রবাসী চিকিৎসক ড. ফাহিমের ওপর হামলা চালিয়েছে।

এছাড়া কলকাতায় অভিনেতা মোশাররফ করিমের ওপর আওয়ামী লীগ সমর্থিত কিছু লোক চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও তিনি পরে তা অস্বীকার করেন।

উল্লেখ্য, মোশাররফ করিমও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

দ্য ডিসেন্টের পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ ঘটনায় একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে। 

জনসমাগমস্থল, বিমানবন্দর বা প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে ঘিরে ধরা, ডিম নিক্ষেপ, শারীরিকভাবে হেনস্তার চেষ্টা এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। একাধিক ঘটনায় হামলাকারীরা আওয়ামী লীগের পক্ষে স্লোগানও দিয়েছেন।

বিদেশে এ ধরনের হামলার ঘটনায় সরকারের অবস্থান জানতে দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে তারা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি ও অন্যান্য অগ্রাধিকার বিষয়ক অনুবিভাগের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব এ. কে. এম. শহীদুল করিম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, এ ব্যাপারে আমাদের কাছে হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই। বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি জানা যেতে পারে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্য জানতে তাকে একাধিকবার ফোন করা হয় এবং খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।