Police and ‘View Hunters’ Team Up to Turn Private Lives into Public Spectacles
রাজধানীর আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে আটক কয়েকজন নারী একটি কক্ষে বসে আছেন। ক্যামেরা দেখে কেউ মাস্ক, কেউ ওড়না দিয়ে মুখ আড়াল করার চেষ্টা করছেন।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গোয়েন্দা পুলিশের দুজন নারী সদস্য তাদের মুখের আবরণ জোর করে সরিয়ে দিচ্ছেন। নারীরা আবারও মুখ ঢাকার চেষ্টা করছেন এবং অন্তত একজন নারীকে কাঁদতে দেখা যায়।
এ সময় একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা যায়, “সব খোল, মাস্ক খোল। ঢাকবি না। ঢাকলে কিন্তু মাইর হবে।”
প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনমতে, মাস্ক না খুললে মারধরের হুমকি দিয়েছেন ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির। যদিও তিনি তা অস্বীকার করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করার পর এটি গত মাসে ভাইরাল হয়। এমন একটি ফেসবুক পেজের নাম ‘Channel A’। পেজটি ৬ অক্টোবর ‘আবাসিক হোটেলে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, ক্যামেরার সামনে মুখ আড়াল তরুণীর!’ শিরোনামে ভিডিওটি প্রচার করে।
AK News 21 নামে আরেকটি ফেসবুক পেজে একই ভিডিওর বর্ধিত সংস্করণ পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, দুজন নারী পুলিশ সদস্য মুখ লুকাতে থাকা আরেক নারীর ওড়না জোর করে সরিয়ে দিচ্ছেন। এ সময় একজন নারী পুলিশ ভুক্তভোগী নারীর চুল টেনে ধরে ক্যামেরার সামনে ওই নারীর মুখ উন্মুক্ত করে দেন। আরেকজন পুলিশ সদস্য ওড়নার ক্লিপ খুলে মাথা থেকে ওড়না ফেলে দেন।
এ সময় একজন পুরুষ ক্যামেরার অপর পাশ থেকে ধমক দিয়ে মুখ দেখাতে বলেন।
Channel A পেজটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, শুধু গত সেপ্টেম্বর মাসে এই পেজে নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ও তল্লাশির দৃশ্য সংক্রান্ত অন্তত ১১৭টি কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এসব কনটেন্টে– যেগুলোর কোনটি কয়েক লক্ষবার ভিউ হয়েছে– সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গোপনীয়তা মানা হয়নি। কন্টেন্টগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি রয়েছে যেখানে পুলিশ বা গোয়েন্দাদের অভিযানের দৃশ্য ‘এক্সক্লুসিভ ভিডিও’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
AK News 21 পেজ থেকেও নিয়মিত নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও প্রচার করা হয়।
‘বাংলাদেশ নিউজ টাইম’ নামের সাড়ে ৪ লাখের বেশি ফলোয়ার থাকা একটি পেজেও বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে রেইড, পুলিশি অভিযান, পরকীয়ায় ধরা পড়া ও প্রেম করতে গিয়ে ধরা পড়ার প্রায় দেড়শ ভিডিও আপলোড করা হয়েছে গত কিছু দিনে। এসব কনটেন্টেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গোপনীয়তা মানা হয়নি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরাও রয়েছে এই অভিযুক্তদের তালিকায়।
‘সংবাদমাধ্যম’ আকারে নিজেদের পরিচয় দেয়া এমন ফেসবুক পেজ যারা পুলিশ বা গোয়েন্দাদের বিভিন্ন হোটেল/বারে অভিযানের ভিডিও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার তোয়াক্কা না করে নিয়মিত প্রকাশ করে থাকেন, তার সংখ্যা মোটেও হাতেগোনা কয়েকটি নয়।
দ্য ডিসেন্ট গত কয়েক দিনে এমন অন্তত ১৫০টি ফেসবুক ও ইউটিউব অ্যাকাউন্ট খুঁজে পেয়েছে যেখানে নিয়মিত এমন ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এমনকি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমেও একই রকম কন্টেন্ট প্রচারের উদাহরণ রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকতার শিক্ষকরা বলছেন, মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি/ভিডিও আপত্তি সত্ত্বেও অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া সাংবাদিকতার নীতিবিরুদ্ধ এবং আইনগত অপরাধ।
‘অভিযানের আগেই পুলিশ আমাদের খবর দেয়’
আবাসিক হোটেলে পুলিশের অভিযানের এসব ভিডিও সাংবাদিক বা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কাছে কীভাবে পৌঁছায়, জানতে দ্য ডিসেন্ট এই ধরনের ভিডিও প্রকাশ করা কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল ও পেইজে কর্মরত ৬ জনের সাথে কথা বলেছে।
তারা জানিয়েছেন, প্রচারের জন্য এ ধরনের অভিযানের আগেই পুলিশ তাদের বিশ্বস্ত কাউকে তথ্য দেয়। সেই তথ্যের আলোকে ইচ্ছুক সাংবাদিক বা কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা তাদের নিজস্ব বিভিন্ন অনলাইন চ্যাট গ্রুপে (হোয়াটসঅ্যাপ) জানিয়ে দিলে অভিযানের সময় আগ্রহী সাংবাদিক এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটররা ঘটনাস্থলে জড়ো হন।
মাতৃভূমি নামের একটি অনলাইন পোর্টালে মোবাইল সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন উত্তরার বাসিন্দা সহিদুল ইসলাম। তিনি দ্য ডিসেন্টকে জানান, “প্রতিটি এলাকাভিত্তিক পুলিশ এবং সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে। সাংবাদিকদেরও নিজস্ব গ্রুপ রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অভিযানের আগে পুলিশ সাংবাদিকদের গ্রুপে অগ্রিম তথ্য দেয়। তবে আবাসিক হোটেলে অভিযানের সময় সাধারণত পুলিশ তাদের বিশ্বস্ত কিছু সাংবাদিককে ফোন করে জানায়। পরবর্তীতে ওই সাংবাদিকরা তাদের বাকি সহকর্মীদের জানিয়ে দেন।”
তিনি বলেন, “আবাসিক হোটেলে অভিযানের সময় পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে সাংবাদিকদের ভিডিও করতে উৎসাহ দেয়। নারী-পুরুষরা তাদের মুখ ঢাকতে চাইলে পুলিশ নিজেই জোর করে মুখ উন্মুক্ত করে দেয়, যাতে তাদের ভিডিও করা যায়।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু সাংবাদিকরাই নয়, পুলিশের অভিযানকেন্দ্রিক এক ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েটর শ্রেণির আবির্ভাব হয়েছে, যারা সব সময় এ ধরনের কনটেন্ট প্রচার করে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পায়। আপনি দেখবেন হোটেলে, বাসায় আবার পুলিশের বিভিন্ন চেকপোস্টে পুলিশের সাথে সাথে সব সময় মোবাইল হাতে কয়েকজন ভিডিও করছে।”
আমার দেশের মোবাইল সাংবাদিক জাহিদুল ইসলাম পাপ্পুও একই তথ্য দিয়েছেন। তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “পুলিশ নিজেদের প্রচারণা করতেই এ ধরনের অভিযানের সময় সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নিয়ে যায়।”
তিনি বলেন, “সাংবাদিক ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা মূলত সোশাল মিডিয়ায় ভিউ এর জন্যই জেনেশুনেও এসব ভিডিও প্রকাশ করে। আমি এসব ব্যক্তিদের সাংবাদিক না বলে ভিউবাদিক বলবো।”
ফেসবুকে নিয়মিত নারী-পুরুষদের আপত্তিকর ভিডিও প্রচার করে এমন একটি পেজ ‘Channel A’। পেজটির একজন এডমিন নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “অসামাজিক এবং অশ্লীল কাজের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতেই তারা এমন ভিডিও প্রচার করে। যাতে মানুষ আবাসিক হোটেলে না যায়।”
হোটেলে পুলিশের অভিযানের তথ্য তারা কীভাবে জানেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা তো পুলিশ নিজেই কল করে বলে দেয়।”
এমন ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ব্যাহত করে অপরাধ করছেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কীসের অপরাধ? পুলিশ নিজেই তো আমাদের ভিডিও করতে বলে, আমাদের ডেকে নিয়ে যায়। আপনি কেন আইন শেখাচ্ছেন?”
ধর্ষণের ভিকটিমের ছবি, নিজের সম্মতিতে কারো সাথে একান্তে সময় কাটাতে যাওয়া মানুষের ছবি কিংবা পুলিশের রেইডে অভিযুক্তের বহু ছবি প্রকাশ করা হয়েছে এমন একটি পেজ হলো ‘বাংলাদেশ নিউজ টাইম’
পুলিশি অভিযানের তথ্য আপনারা কিভাবে জানতে পারেন প্রশ্ন করা হলে পেজের একজন এডমিন নিজেকে সাংবাদিক দাবি করে বলেন, “আপনাকে উত্তর দিতে আমি বাধ্য না।”
“আপনার কোনো প্রবলেম হলে আপনি আইনি প্রক্রিয়ায় যান। আপনি তো আমাকে ফোন করে নিজেই আইনের ভায়োলেশন করেছেন”, বলেন তিনি।
কীভাবে আইনের ভায়োলেশন হলো, জানতে চাইলে তিনি আর কথা বলতে চাননি।
‘নিউজ পোস্ট বাংলা’ ফেসবুক পেজে প্রচারিত সংবেদনশীল ও আপত্তিকর ভিডিওগুলোর উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে পেজটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফাহাদ কবির দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমাদের পেজে প্রচার করা ভিডিওগুলো বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করা হয়। কেউ নিজে থেকে আমাদের ভিডিও পাঠায়, আবার কখনো আমরা সংবাদ সংগ্রহ করি। অন্য জায়গা থেকে পাওয়া ভিডিও যাচাই করে ভয়েসওভার যুক্ত করেও আমরা প্রকাশ করি।”
“কোনো ভিডিও পাওয়ার পর আনকাট বা এডিটিং ছাড়া দ্রুত আপলোড দেওয়ার সময় আমরা তেমন কোনো পরিবর্তন করি না। পুলিশ যখন কোনো স্থানে অভিযান বা রেইড দেয়, তখন সাধারণত সাংবাদিকদের সাথেই নিয়ে যায়।”
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে গণমাধ্যমের উপস্থিতি পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করে না। মিডিয়া কোথায় যাবে, না যাবে এটা তো আর আমরা নিয়ন্ত্রণ করি না। আমরা একটা জায়গায় যাচ্ছি, হোটেলে যাচ্ছি, সেখানে মিডিয়া থাকতেই পারে, মিডিয়া যেতেই পারে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা রাস্তায় একটা অভিযান করতেছি বা একটা পার্লারে গেলাম কোনো এক সময়, এটা তো মিডিয়া যেতেই পারে।”
পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযানের খবর সংবাদমাধ্যমকে আগাম জানানো বা প্রচারণার জন্য সাংবাদিকদের ডাকার অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, “না, না। এই রকম কোনো কিছু নাই। কিসের প্রচারণা? আমাদের মিডিয়া উইং আছে, মিডিয়া উইং গিয়ে প্রচার করে।”
অভিযান চলাকালে সংবাদমাধ্যম কীভাবে এত দ্রুত খবর পেয়ে সরাসরি সম্প্রচার করে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, “কতটুকু মিডিয়া আছে, আর কে কীভাবে খবর পায় এটা তো আর আমরা করতে পারব না।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও একই রকমের ভিডিও
বাংলা টিভি নামে একটি অনলাইন ভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তিন মিনিটের একটি ভিডিওর শুরুতে এক তরুণীকে ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকতে দেখা যায়। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “ভিডিও করবেন না, প্লিজ।”
একজন পুরুষ তাকে বলেন, “কোনো সমস্যা নাই তোমার।” এরপর ভিডিওতে তরুণীর মুখ দেখানো হয়। একপর্যায়ে তার মুখের স্থিরচিত্রও ব্যবহার করা হয়।
ভিডিওটির শিরোনাম ছিল, ‘নিশুতি রাতে বৃদ্ধের সঙ্গে ধরা খেয়ে তরুণী বললেন ভিডিও কইরেন না আব্বু জেনে যাবে’।
তরুণী বারবার ভিডিও না করার অনুরোধ করেন। বিষয়টি প্রকাশ হলে তার মানসম্মান ক্ষুণ্ন হবে বলেও জানান। তারপরও প্রতিবেদনে তার পরিচয় আড়াল করা হয়নি।
ভিডিওটিতে দেড় হাজারেরও বেশি কমেন্ট পড়ে। যেখানে বেশিরভাগই বিষয়টি নিয়ে হাস্যরস করছেন। তবে একজন কমেন্ট করেন, ভিডিওতে শুধু মেয়েটিকেই দেখা যায়, পুরুষটিকে নয়।
দৈনিক ইনকিলাব এর ভেরিফাইড পেইজ ও ‘প'রকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে স্বামীর হাতে ধরা পড়লেন স্ত্রী, প্রেমিককে না মা'র'তে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অনুরোধ’ শিরোনামে এই ধরনের ভিডিও পাওয়া গেছে।এর ৫২৫ টি মন্তব্য দেখা যায় যার মধ্যে স্লাটশেমিং,মোরাল পুলিশিং,এবং কটুক্তি মুলক মন্তব্যই বেশি।
নাগরিক টিভির ফেসবুক পেজেও একই ধরনের ভিডিও প্রকাশের উদাহরণ পাওয়া গেছে। ৩লাখ ৮ হাজার এর বেশি ভিউ হয়েছ ‘‘ভালুকায় পরিত্যক্ত ঘরে চেয়ারম্যান ও প্রবাসীর স্ত্রী আটক’শিরোনামের এই ভিডিওটি।সেখানে অনেক ধরনের মন্তব্য দেখা যায়। সেখানে একজন লিখেছেন ‘উভয়পক্ষের আপোষেই সারাদেশে এসব ব্যাভিচার চলছে, বিশেষ করে শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলাপান সবগুলো আবাসিক হোটেলে গিয়ে আকাম কুকাম করে ওগুলো কিন্তু কোন দোষ না’ ।
নিউজ ২৪ এর ভেরিফাইড পেইজেও এমন ভিডিওর উদাহরন দেখা গেছে। পাবনায় আবাসিক হোটেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ঝটিকা অভিযান আটক ৬ শীর্ষক একটি নিউজে দেখা যায় একজন পুরুষ একটি মেয়েকে জোর করছে তার স্বামীর নাম বলার জন্য। মেয়েটি দুই হাতেমুখ লুকিয়ে আছে। কথা বলার সময়ে মেয়েটির চেহারা দেখা গেলেও সেটি নিউজে ব্লার করা হয়নি। এরপরও যখন পুলিশের সাথে মেয়েরা হোটেল থেকে বের হচ্ছিল, তখনও তাদের চেহারা স্পষ্ট করে দেখানো হয়।
ভিডিওতে ৩ লাখ ১৭ হাজার লাইক, ২০ হাজার শেয়ার ও ৯ হাজার ৩০০ এর মত কমেন্ট দেখা যায়। কমেন্টে এই মেয়েদের কঠিন শাস্তি, ইসলামী শরিয়া আইন অনুযায়ী শাস্তি, হোটেলের ম্যানেজার মালিকসহ সবাইকে গ্রেফতার করার দাবি জানায়। তবে কেউ কেউ হোটেলে অনৈতিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কথা বললেও মেয়েগুলোর মুখের ছবি দেখানো ও তাদের নিয়ে হাসি তামাশা করার বিরোধীতা করেন।
আপত্তিকর অবস্থারও ভিডিও প্রকাশ
বাংলাদেশ নিউজ টাইমসের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুল ড্রেস পরিহিত দুটি ছেলে মেয়ের চুম্বনের একটি ভিডিও আপলোড করা হয়।
ভিডিওর কমেন্টেসে অনেক ছেলেই নিজে থাকলে কী করতো সে বিষয়ে মন্তব্য করেছে। কয়েকজন মেয়েটিকে স্লাট শেমিংও করতে দেখা যায়। তবে বারেক সিদ্দিক নয়ন নামে একজন সাংবাদিকতার নামে এসব ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার নিন্দা জানিয়েছেন।
একই চ্যানেলে আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেটিও একজন ছেলে ও মেয়ের চুম্বনের। এই ভিডিওর মন্তব্যে অনেকেই সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
নিউজ পোস্ট বাংলা নামের একটি পেইজে একটি ভিডিও আপলোড করা হয়। যেখানে মেয়েটি জামা পড়ছে, এই অবস্থায়ও ভিডিও করে তা প্রকাশ করা হয়েছে। এই পেইজটিতে প্রায় দুই লাখের মতো ফলোয়ার রয়েছে।
পেইজটিতে অন্তত ৯০টি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, হোটেলে অভিযান, কট, অথবা এই ধরনের যেখানে অভিযুক্তদের ছবি ও ভিডিও দেখানো হয়েছে।
এমনকি অভিযুক্ত শিশু হওয়ার পরও তাদের ছবিও দেখানো হয়েছে। একটি ভিডিওর শিরোনামই দেওয়া হয়েছে যে শরীয়তপুরে ৯ বছরের শিশু ধর্ষণের অভিযুক্ত ১৭ বছরের কিশোর স্বীকারোক্তি। সেখানে অভিযুক্ত শিশু হওয়ার পরও তার ছবি ব্লার করা হয়নি।
ডিজিটাল ক্রিয়েটর, ভ্লগাররাও একই কাজে ঝুঁকছেন
কিছু ডিজিটাল ক্রিয়েটরকেও দেখা গেছে, যারা এ ধরনেরই ভিডিও প্রকাশ করেন। ফলো করুন নামের একটি পেইজে দেখা যায়, প্রায় দেড়শতাধিক এই ধরনের ভিডিও রয়েছে। এখানে একটি ভিডিওতে দেখা যাায়, দুইজন মহিলা পুলিশ একজন নারীকে সার্চ করছেন।
এক পর্যায়ে পুলিশ নারীর ব্লাউজের ভিতরে হাত দিয়ে কিছু একটা বের করেন, সেই ভিডিও পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। পুরো শরীর সার্চ করার সময় ভিডিওটিতে দেখানো হয়।
পরে একজন পুরুষ পুলিশ ভিডিওতে দেখান যে, ওই নারীর কাছ থেকে ইয়াবা পাওয়া গেছে, এবং তাকে এজন্য গ্রেপ্তার করা হল। এক পর্যায়ে ওই নারী মুখ ঢেকে রাখলে পাশে থাকা মহিলা পুলিশ ঝাড়ি দিয়ে মুখের কাপড় সরিয়ে দেন। আরেক মহিলা পুলিশও ওই নারীর কাপড় ভালোভাবে সরিয়ে দেয় যেন মুখ দেখা যায়।
ভালো কাজ নামের একটি পেইজে দেখা গেছে ৭০ টির ও বেশি এমন ভিডিও।
বিডি লাইভ ডটকম ২৪ নামের একটি পেইজে একটি ভিডিও আপলোড করা হয়। যেখানে দেখা যায়, আবাসিক হোটেলে পুলিশের অভিযানের সময় একটি তরুণ পুলিশের পায়ে ধরে মুখ লুকিয়ে আছে। পাশাপাশি অনুরোধ করছে যেন তার চেহারা না দেখানো হয়। এমনকি একপর্যায়ে বলতে শোনা যায়, প্রয়োজনে আমাকে মেরে ফেলেন, তবুও চেহারা দেখাইয়েন ন। এরপরও পাশ থেকে অন্য একজন পুলিশ তাকে জোর করে দাড় করাতে চেষ্টা করেন। কথা বলার এক পর্যায়ে শেষ পর্যন্ত ওই ভিডিওতে তার চেহারা দেখা যায়।
খবর জার্নাল নামে একটি সংবাদ মাধ্যম পর্যবেক্ষন করে প্রায় ২০০ টি পুলিশি অভিজানের, এবং তল্লাশির ভিডিও দেখা গেছে। ভিডিওগুলোতে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন করা হয়নি।
এর মধ্যে ‘৩০০ ফিটে পুলিশের ত/ল্লা/শিতে হাফ প্যান্ট পরা তরুণী, এরপর যা হলো’ শিরোনামের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হচ্ছে ৩০০ ফিট এলাকায় পুলিশের অভিজান চলছে যাত্রীদের নামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে।
এক পর্যায়ে একটি অটোতে ৩জন এর মধ্যে একজন তরুনিকে হাফ পান্ট পরা অবস্থায় তাকা মেয়েটিকে নিজের মুখ লুকাতে দেখা যায়।
ভিডিওর মন্তব্যগুলো বিশ্লেষন করে দেখা গেছে বেশির ভাগ ই তরুনীকে এবং তার পরিহিত পোশাক নিয়ে কটুক্তিমূলক এবং শ্লাট শেমিং বা মোরাল পুলিশিং করা হয়েছে।
শিশুদের পরিচয়ও আড়াল থাকছে না
বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলের পোশাক পরা এক ছাত্রী ও একটি ছেলেকে স্থানীয় কয়েকজন ঘিরে রেখেছেন। ভিডিওতে অভিযোগ করা হয়, তাদের একটি ঘরে একসঙ্গে পাওয়া গেছে।
‘এসকে কামাল ভাই’ নামের একজন কনটেন্ট নির্মাতার প্রকাশিত ভিডিওটিতে দুজনের মুখই দেখানো হয়। মেয়েটিকে চড় মারার দৃশ্যও রয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং তানজিম আল ইসলাম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান তানজিম আল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন, দেশের শিশু আইন এবং সাইবারসংক্রান্ত আইনে শিশুদের অনলাইনে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে।
“এমন কিছু করা যাবে না, যাতে শিশুদের পরিচয় প্রকাশ পায় কিংবা তাদের মানহানি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়,” বলেন তিনি।
শিশু আইন, ২০১৩-এর ৮১ ধারায় বিচারাধীন মামলা বা বিচার কার্যক্রম সম্পর্কে শিশুর স্বার্থের পরিপন্থী এমন প্রতিবেদন, ছবি বা তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তাকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা যায়। এই বিধান লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
পরিচয় সুরক্ষার বিষয়টি শুধু মুখ আড়াল করার মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসস্থান বা আশপাশের পরিচিত দৃশ্য থেকেও কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব।
‘আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যেই এমন কন্টেন্ট’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলম এ ধরনের ভিডিও প্রকাশকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন হিসেবে দেখেন।
তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “প্রচার পাওয়া, ভিডিও ভাইরাল করা কিংবা আর্থিক লাভের উদ্দেশ্য এ ধরনের কনটেন্ট তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।”
তার মতে, “প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিমূলক ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক আপত্তি থাকলেই সেটিকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা যায় না। ঘটনার আইনগত দিক যাচাই না করে ব্যক্তিগত জীবনের দৃশ্য প্রকাশ করলে গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হয়।”
এ ধরনের চর্চাকে তিনি ‘প্রিডেটরি জার্নালিজম’ বা ওত পেতে থাকা সাংবাদিকতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
খোরশেদ আলমের মতে, দর্শকের আগ্রহ এবং জনস্বার্থের মধ্যে পার্থক্য করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, অপরাধের অভিযোগ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জনস্বার্থ থাকতে পারে। কিন্তু সেই সংবাদ জানাতে একজন সাধারণ মানুষের মুখ বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ কতটা প্রয়োজন, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।”
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি ডিজিটাল ও গণমাধ্যম সাক্ষরতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। পাশাপাশি কার্যকর আইনি ব্যবস্থার কথা বলেন, যার অপব্যবহার ঠেকানোও প্রয়োজন।
‘মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন’
মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে তা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
তার ভাষায়, “একজন অভিযুক্ত রয়ে গেছেন, এখনো অপরাধী হন নাই।”
কিন্তু ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তদন্ত ও বিচার শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে সামাজিকভাবে একটি ধারণা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
লেনিন বলেন, তদন্তের প্রয়োজনে কর্মকর্তাদের ভিডিও ধারণ করতে হতে পারে। তবে সেই ভিডিও সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া বা বাহিনীর প্রচারণায় ব্যবহার করা আলাদা বিষয়।
কাউকে জোর করে মুখ দেখাতে বাধ্য করা এবং সেই দৃশ্য প্রচার করাকে তিনি তদন্তের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখেন না। তার মতে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব অভিযোগ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকও সম্মতি ছাড়া এ ধরনের ভিডিও ধারণ ও প্রচার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
দ্য ডিসেন্টকে তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে একদল মানুষ তাকে আটকে রাখলে সাংবাদিকের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ভিডিও করেন। যাকে ধারণ করা হচ্ছে, তার সম্মতি নেওয়া হয় না। পরে ভিডিওটি প্রকাশ হলে তিনি সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হন।
“এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এটা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য না,” বলেন তিনি।
কাজী রিয়াজুল হকের মতে, কাউকে অপমান করার ক্ষমতা কাউকে দেওয়া হয়নি। বিচার করার ক্ষমতা আদালতের। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও তার অর্থ অন্যকে ইচ্ছামতো অপমান করার অধিকার নয়।
আইনে কী সুরক্ষা রয়েছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আইন ছাড়া কারও জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি হয়, এমন ব্যবস্থা নেওয়া নিষিদ্ধ।
৪৩ অনুচ্ছেদে আইন দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে গৃহের নিরাপত্তা এবং চিঠিপত্র ও অন্যান্য যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার রয়েছে। একইভাবে ৩৫ অনুচ্ছেদের ৫ দফায় যন্ত্রণা দেওয়া এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড ও আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক কোনো ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা থেকে বিরত থাকতে ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।
ডিজিটাল মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধরনের ক্ষতিকর প্রকাশের বিষয়ে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২৫ ধারায়ও বিধান রয়েছে। ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত উপাদান বা সেক্সটর্শনের উদ্দেশ্যে তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, প্রচার কিংবা প্রচারের হুমকি এই ধারার আওতায় পড়ে। নারী বা শিশুর বিরুদ্ধে এই অপরাধ হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, ২০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
তবে সম্মতি ছাড়া ভিডিও প্রকাশের প্রতিটি ঘটনা এই ধারার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা নির্ভর করে ঘটনার পরিস্থিতি ও ধারায় উল্লেখিত উদ্দেশ্যের ওপর।