Who Is Behind the Campaign for Amini’s Release?

21 October 2026

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামক এক যুবককে হত্যার ঘটনায় সরাসরি নেতৃত্বদানকারী ও প্রধান আসামী কারী ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই ফেসবুকে তার মুক্তির দাবিতে শুরু হয়েছে ক্যাম্পেইন। পেশায় ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক এবং সুযোগে ‘প্রক্সিতে ইমামতি’ করা আমিনী শামীম মারা যাওয়ার পরও অনুতপ্ত না হয়ে বরং ‘গর্ব’ প্রকাশ করেছিলেন।

এই ঘটনায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনলেও ফেসবুকে কিছু আইডি থেকে তাকে ‘উম্মাহর বীর’, ‘মুসলিম বঙ্গের ইলমুদ্দীন’, ‘বাংলার সিংহ পুরুষ’ ও ‘দ্বীনের মুজাহিদ’ আখ্যা দিয়ে তার দ্রুত মুক্তির দাবিতে ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে।

দ্য ডিসেন্ট কী-ওয়ার্ড সার্চ করে গত দুই দিনে অন্তত ১০০ এর বেশি পোস্ট পেয়েছে, যেখানে আমিনীর  গ্রেফতারের ছবি এবং ভিডিও পোস্ট করে নানা ইতিবাচক উপাধিতে ভূষিত করে মুক্তি দাবি করা হচ্ছে।

এই ক্যাম্পেইনে যুক্ত হতে দেখা যায় ‘এন্টি শাতিম মুভমেন্ট’ শুরু করা, বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কিত এবং আল-কায়েদার মতাদর্শ অনলাইনে প্রচারকারী আতাউর রহমান বিক্রমপুরীকে। তেহরিকই তালেবান পাকিস্থান বা টিটিপি-পন্থী লেখালেখি করা আবু উসামা নামক ফেসবুক আইডিও সক্রিয় রয়েছে এই ইস্যুতে।

এছাড়া ইসলামী বক্তা ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীও নিহত শামীমকে শাতিম আখ্যা দিয়ে তাকে হত্যা করায় ‘আলহমাদুলিল্লাহ’ বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

‘৫০ বার জীবিত করে ৫০ বার পিটিয়ে মারা উচিত’ 

ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ইস্যুতে বেশ সক্রিয় রয়েছেন আতাউর রহমান বিক্রমপুরী। তিনি এ ইস্যুতে এ পর্যন্ত অন্তত ১০টি পোস্ট নিজের প্রোফাইলে লিখেছেন বা শেয়ার করেছেন। 

গত ১৯ অক্টোবর তিনি একটি ফটোকার্ড পোস্ট করেন, যেখানে লেখা ছিল, “রাসূলের অবমাননাকারী কে হত্যা করা সরকারে দায়িত্ব ছিলো ফজলুল হক আমিনী তা পালন করেছে এই জন্য তিনাকে গ্রেফতার না করে পুরস্কার দেওয়া দরকার ছিল! আমিনী সাহেবের দ্রুত মুক্তির দাবি জানাই।” 

কারিম শাওন নামক একজন ইসলামী লেখক এক পোস্টে লিখেন, “...ওরে ৫০ বার জীবিত করে ৫০ বার পি*য়ে মা*রা উচিত। এই শুকরটার পক্ষে ওকালতি করছে একশ্রেণির ইতর। যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদেরকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। আমরা মুসলিমরা শান্তি চাই। কিন্তু গায়ে পড়ে ঝামেলা বাধাতে আসলে কড়া জবাব দেওয়া হবে। মুসলিম সংখ্যাগরীষ্ঠ দেশের সরকার যদি এসব ন্যাক্কারজনক কাজের প্রশ্রয় দেয়, তবে আলেমগণ এই রাষ্ট্রকে ব্রিটিশ আমলের মতো দারুল হারব ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।”

টিটিপি সংশ্লিষ্ট আইডি আবু উসামা আব্দুল্লাহ হাসান নামক একজনের লেখা কপি করে পোস্ট করেছেন। যেখানে লেখা, “শাতিমের বিষয়টি হচ্ছে পাগলা কুকুরের মতো। পাগলা কুকুর মানুষকে সমানে কামড়াচ্ছে, এমতাবস্থায় মানুষ কি পাগলা কুকুরের বিরুদ্ধে আদালত-বিচার বসাবে? নাকি তাৎক্ষনিক দমন করবে? খুব সহজ হিসাব। মানুষ পাগলা কুকুরকে সাথে সাথেই দমন করবে, এক্ষেত্রে কারো অপেক্ষা করবে না। এখন পাগলা কুকুরকে যদি তাদের প্রভুরা সামলিয়ে রাখতে না পারে, তাহলে গণপিটুনি খেয়ে দুনিয়ার জীবনে ইতি ঘটবে। মানুষকে বেপরোয়া কামড়ানো পাগলা কুকুরকে দমনকারী ব্যক্তি যেভাবে সমাজে বরণীয় হয়, ঠিক তেমনিভাবে শাতিম নামক পাগলা কুকুরকে দমনকারী ব্যক্তিও সমাজে বরণীয় হওয়া উচিৎ।”

‘দল যার যার, নাস্তিক পেটানোর দায়িত্ব সবার’

আজ (২০ অক্টোবর) সকালে মোঃ আবুল কাসেম নামক একটি আইডি থেকে আমিনীর মুক্তির দাবিতে একটি পোস্ট করা হয়। সেই পোস্টে সাতক্ষীরার আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রেমী জনতার উদ্দেশ্যে লিখেন, “দল যার যার, নাস্তিক পেটানোর দায়িত্ব সবার। আসসালামুয়ালাইকুম, প্রিয় সাতক্ষীরা ও দেবহাটার আলেম ওলামা ভাইয়েরা, এবং বাংলাদেশের ইসলাম প্রেমী রাসূল প্রেমী তাওহিদী জনতা। আমাদের আশেকে রাসুল, ফজলুল হক আমিনি ভাইয়ের এই কঠিন মুহুর্তে আপনাদের ভুমিকা তার জন্য খুবই দরকার। নাস্তিকরা ঠিকই ঝড় তুলে তাকে গ্রেফতার করিয়েছে হয়তো তারা চাইবে ভাইকে ফাসি দিতে আমরা কি পারিনা তার মুক্তির জন্য ভুমিকা রাখতে? সে যেটা করেছে এটাতে আমাদের ও ভুমিকা থাকার দরকার ছিলো,  কিয়ামতের দিন যখন আপনার আমার রব প্রশ্ন করবেন আল্লাহ এবং রাসুলকে নিয়ে যখন বাজে মন্তব্য করেছিলো তোমার ভুমিকা কি ছিলো? কি উত্তর দিবেন সেদিন? এখনি সময় আমাদের ভাইয়ের পাশে দাড়ানোর। তাই আমরা চাই ফজলুল হক আমিনী ভাইয়ের নিঃশর্ত মুক্তি চাই।”

A H Rafi নামক আরেকটি আইডির এক পোস্টে লেখা হয়, “আপনার পক্ষে একটু যদি না-ও লিখি ; নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে কিভাবে মুখ দেখাবো? হাউজে কাউসারের পানি পান করতে আপনি যাবেন, আবার সে লাইনে আমার মতো মুনাফিকরাও থাকবে? আল্লাহ আপনাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত করুন।  নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রুহানি তাওয়াজ্জুহ আপনার অন্তরকে প্রশান্ত করুন। আপনিই নবীর ইজ্জতের পাহারাদার। আমরা কোথায় উম্মতের গোনাহগার! আশেকে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ফজলুল হক আমিনী সাহেবের নিঃশর্ত মুক্তি চাই।।”

Mohammad Mujtahidul Islam Aqeel নামক আরেকটি আইডি থেকে লেখা হয়, “আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর অবমাননাকারী শামিম নামক এক চরম বেয়াদবকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন সাতক্ষীরার একজন দ্বীনের মুজাহিদ ফজলুল হক আমিনী। এই আল্লাহর বান্দাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাষ্ট্রের কাছে আমি তার নিঃশর্ত মুক্তি চাই।”

ওয়াজ মাহফিলে এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

বাংলাদেশের একজন পরিচিত ইসলামী বক্তা ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী এক মাহফিলে সাতক্ষীরার ঘটনার প্রেক্ষিতে বক্তব্য দেন। তিনি তার বক্তব্যে নিহত শামীমকে ‘শাতেম’ আখ্যা দিয়ে তাকে হত্যার ঘটনায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “সাতক্ষীরার দেবহাটায় এক বেয়াদব বেঈমান আল্লাহর হাবীব নবীজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু সাল্লামের আরশচুম্বি শানমানের খেলাফ এবং ইসলাম ধর্মের বিপক্ষে বক্তব্য দিয়েছে স্থানীয় জনগণ তাকে গণপিটুনি দিয়ে জাহান্নামে পাঠায় দিছে, বলেন আলহামদুলিল্লাহ।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যারা মুরতা্‌ হয় নাস্তিক হয়, শাতেম; আল্লাহ তার হাবিবের শানে বেয়াদবি করে, তাদেরকে প্রতিরোধ করার মত প্রচলিত কোন আইন নাই। এজন্য তারা এরেস্ট হয় আবার জামিনে মুক্তিপায়। তৌহিদি জনতার, ঈমানদারদের দ্বিতীয় কোন পথ নাই তো নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া ছাড়া। রাষ্ট্রের উচিত হচ্ছে এরকম আইন করা, কেউ যদি আল্লাহ ও তার হাবিবের শানে বেয়াদবি করে ইসলামের বিরোধিতা করে তার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রে আইন থাকলে জনগণ আইন হাতে তুলে নেবার দরকার হয় না।”

“রাষ্ট্র যদি আইন না করে, তো জনগণ আইন হাতে তুলেই নিবে। আমরা বরং বলব সেই মর্দে মুজাহিদ যে ব্যক্তি  (ফজলুল হক আমিনী) এই সিদ্ধান্ত (শামীমকে হত্যা) নিয়েছে, নেতৃত্ব দিয়েছে তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হোক,” বলেন আব্বাসী।

আমিনীর ঋণ শোধে চাওয়া হচ্ছে আর্থিক সাহায্য

আমিনীকে গ্রেফতারের পর একটি নগদ-বিকাশ নম্বর দিয়ে তার ঋণ শোধ করতে সাহায্যও চাওয়া হচ্ছে।

আল - ইনতিশার الانتشار নামক একটি পেইজে গতকাল এক পোস্টে লেখা হয়, “এই মহৎ কাজে সবাই এগিয়ে আসুন কেউ এড়িয়ে যাবেন না। আশিকে রাসুলের মুক্তির জন্য পাশে দাঁড়ান

জামানার ইলমুদ্দীন মাওলানা ফজলুল হক আমিনি (ফাঃ কাঃ) বন্দী হওয়ার আগে একটি পোস্টে হাদিস উল্লেখ করে বলেছিলেন, ঋণ ছাড়া শহীদের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। তিনি আরও জানিয়েছিলেন,তাঁর প্রায় দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি ঋণ রয়েছে,যা তিনি পরিশোধ করতে পারেননি। তাই আসুন,আমরা সবাই মিলে সামর্থ্য অনুযায়ী উম্মাহর এই বীরের ঋণ পরিশোধে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। নিজের সামর্থ্য না থাকলে অন্তত পোস্টটি শেয়ার করে সামর্থ্যবান মানুষের কাছে পৌঁছে দিন। হয়তো আপনার একটি শেয়ারের মাধ্যমেই কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। যোগাযোগ ও সহযোগিতার নম্বর: ০১৮*******০২ বিকাশ-নগদ (পার্সোনাল)। উল্লেখযোগ্য যে,এটা আমিনি ভাইয়ের ছেলের নাম্বার।”

একই ক্যাপশনে বেশকিছু পোস্ট পাওয়া যায় ফেসবুকে। 

দ্য ডিসেন্টকে আমিনী বলেছিলেন, ‘অনুতপ্ত নই, গর্বিত’

শামীমকে হত্যার পর ১৫ অক্টোবর সকালে কারী ফজলুল হক আমিনীর সাথে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। তিনি বলেছেন তিনি এ ঘটনায় অনুতপ্ত নন, কোনো ভয়ও পাচ্ছেন না। 

ফজলুল হক আমিনী বলেন, “আল্লাহ আমায় সৃষ্টি করেছে, সেই আল্লাহকে নিয়ে যে কুরুচিপূর্ণ কথা বলবে, যেই নবী আমার সুপারিশকারী, রসূলের মিল্লাতে আমায় কবর রাখবে বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসুলিল্লাহ, তা আমি রসূলের নিয়ে যদি রসূলকে বেইজন্মা বলবে আর আমি সেই রসূলের উম্মত হয়ে আমি কিছু করতে পারব না, এটা আমার জন্য ব্যর্থতা না? আমি মুমিন হিসেবে পরিচয় দিব কিভাবে? কোরআনের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ছিঁড়ে সে কুলুক করার কথা বলছে আর তাকে কিছু করা যাবে না? আমি অনুতপ্ত হব? না না না, কোন অনুতপ্ত না আমি।”

আমিনী জানিয়েছিলেন, তিনি এই ঘটনায় গর্বিত। তিনি বলেন, “আমাকে এরেস্ট করবে বিভিন্নভাবে ইয়ে চলতেছে সমস্যা কি, আমি আছি স্বাভাবিক আছি, কোন সমস্যা নেই। নিয়ে গেলে আমি সাথে সাথে লাব্বাইক বলে সাড়া দেব।”

“শামীম আসলেই এমন মন্তব্য করেছেন কিনা– তা কী যাচাই করেছিলেন?” প্রশ্ন করলে আমিনী বলেন, “না ওইভাবে যাচাই করার সুযোগ হয়নি, তবে যারা আমার কাছে এগুলো ইনফরমেশনগুলো দিছে তারা ওর একেবারে নিকটতম মানুষ।”

“পরিবারের দাবি শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ, তা জানতেন?” প্রশ্ন করা হলে আমিনী বলেন, “যদি কোনোভাবে প্রমাণিত হয় সে আসলে অসুস্থ ছিল তাহলে তো ভিন্ন কথা। আমি অপরাধী। তার জন্য যে শাস্তি আছে অবশ্যই মাথা পেতে নেবো আমি। কিন্তু আমার কথা ওর আদ্যোপান্ত সমস্ত কথাগুলো শুনে একটাও তাকে পাগল হিসেবে বা মস্তিষ্ক বিকৃত ব্যক্তি হিসেবে মনে হয়নি। আপনারও মনে হবে না আপনি একটু শোনেন না তার বক্তব্যগুলো।” 

যেভাবে গ্রেফতার হন আমিনী

গত মঙ্গলবার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতে নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। 

মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে কারী ফজলুল হক আমিনীকে। এজাহারে ১০ জনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গা ঢাকা দেওয়া প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে ধরতে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগরের একটি স্বজনের বাড়ি থেকে পুলিশ ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে এ মামলায় এজাহারভুক্ত ৫ ও ৬ নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে (৪৬) গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।