Governor branded “business-friendly” in office, “economic wrecking force” out of power

Roby Hossain
By
Roby Hossain
1 March 2026

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে আকস্মিক পরিবর্তন দেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সদ্য সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেওয়া এবং নতুন গভর্নর নিয়োগের পর বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন দৈনিক কালের কণ্ঠে পরপর কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যেগুলোতে সদ্য সাবেক গভর্নরকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পাঁচ দিনের ব্যবধানে তাকে ঘিরে পাঁচটি পৃথক নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনগুলোর শিরোনামগুলো হল: “দুবাইয়ে আহসান মনসুর ও তার মেয়ের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট”, “ব্যাংক খাত ডুবিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে বিদায় আহসান মনসুরের”, “শিল্পের টাকা বন্ডে বিনিয়োগ, মুনাফার অর্থে বিদেশ ভ্রমণ”, “মিথ্যা আশ্বাসে অর্থনীতির সর্বনাশ করা এক গভর্নর” ও “বালিকা বিদ্যালয়ে মনসুরের স্পা-রিসোর্ট।”

দ্য ডিসেন্ট এই মিডিয়া ওয়াচ প্রতিবেদনে দেখার চেষ্টা করেছে পদত্যাগের পর মূহূর্ত থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরকে নিয়ে সিরিজ নেতিবাচক প্রতিবেদন করলেও, ক্ষমতায় থাকাকালে দৈনিক কালের কণ্ঠ একই ব্যক্তিকে নিয়ে কী ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করতো।

এই বিশ্লেষণের জন্য কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইটে ‘আহসান এইচ মনসুর’ কীওয়ার্ড ব্যবহার করে প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। এই বিশ্লেষণে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত সব প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মূলত দায়িত্বকালীন এবং দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত মনসুরকে নিয়ে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক ‘বিশেষ প্রতিবেদনগুলো’ রাখা হয়েছে। প্রিন্ট সংস্করণে প্রকাশিত কিন্তু অনলাইনে না থাকা বা সার্চে না আসার কারণে কালের কণ্ঠের প্রকাশিত এই ধরনের কিছু প্রতিবেদন এই বিশ্লেষণে উঠে নাও এসে থাকতে পারে।

এতে মোট ৯টি প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৪টি ইতিবাচক/প্রশংসামূলক এবং এই ৪টি প্রতিবেদনই প্রকাশিত হয়েছে মনসুর পদত্যাগের আগে। অন্যদিকে ৫টি নেতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়া গেছে যার সবক’টি প্রকাশিত হয়েছে পদত্যাগের পরে।

কীওয়ার্ড সার্চে পাওয়া ৪টি পজেটিভ প্রতিবেদনই “অনলাইন ডেস্ক” পরিচয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

পদত্যাগ-পরবর্তী ৫টি নেতিবাচক প্রতিবেদনের মধ্যে তিনটি “অনলাইন ডেস্ক”, একটি “নিজস্ব প্রতিবেদক” এবং একটি রুকনুজ্জামান অঞ্জনের নামে প্রকাশিত হয়েছে।

ক্ষমতায় থাকাবস্থায় “ব্যবসাবান্ধব গভর্নর”

২ জানুয়ারি ২০২৬ এ প্রকাশিত “গভর্নরের ব্যবসাবান্ধব প্রশংসনীয় উদ্যোগ” শিরোনামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “দীর্ঘ প্রায় ১৭ মাস পর দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। যথাযথ নিয়মনীতি প্রণয়ন করে ব্যবসায়ীদের নীতি সহায়তা প্রদানে প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।” 

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, “মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়েছেন” এবং “এসব খেলাপি ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ২১ বছর পর্যন্ত সময় পেতে পারেন” 

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিসহায়তা ও পুনর্গঠন উদ্যোগ একদিকে যেমন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ সমস্যার বাস্তব চিত্র সামনে এনে তা কমানোর পথও তৈরি করছে” 

এখানে ‘প্রশংসনীয় উদ্যোগ’, ‘প্রাণচাঞ্চল্য’, ‘পথ তৈরি করছে’ এ ধরনের শব্দচয়নের মাধ্যমে গর্ভনরের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে।

৫ নভেম্বর ২০২৫ এ প্রকাশিত “একীভূত ৫ ব্যাংকের গ্রাহকদের সুখবর দিলেন গভর্নর” প্রতিবেদনে কালের কণ্ঠ গভর্নরের বক্তব্যকে আস্থামূলকভাবে উপস্থাপন করেছে। শিরোনামেই “সুখবর” শব্দ ব্যবহার করে সংকট পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখিয়েছে পত্রিকাটি।

২৯ জানুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের সুখবর দিলেন গভর্নর” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই ধরনের আশ্বাসমূলক উপস্থাপনা করা হয়েছে। শিরোনামেই আবারও “সুখবর” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যান্য প্রতিবেদনগুলোতেও কালের কণ্ঠ গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে নীতিনির্ভর, সংস্কারমুখী হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তার সিদ্ধান্তকে “প্রশংসনীয়”, “ব্যবসাবান্ধব” বা “কার্যকর” উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে।

পদত্যাগের পর হয়ে গেলেন ‘দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে দায়ী’

সরকার পরিবর্তনের আগে ২ জানুয়ারি “গভর্নরের ব্যবসাবান্ধব প্রশংসনীয় উদ্যোগ” শিরোনামে তাকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হলেও, গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর মাত্র তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে কালের কণ্ঠের প্রকাশিত পাঁচটি প্রতিবেদনে ভাষায় স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা যায়। এই পাঁচটি প্রতিবেদনই ছিল সমালোচনামূলক বা নেতিবাচক।

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ প্রকাশিত “দুবাইয়ে আহসান মনসুর ও তার মেয়ের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, “৪৫ কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন এমন একটি অভিযোগ সামনে এসেছে।” 

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ প্রকাশিত “ব্যাংক খাত ডুবিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে বিদায় আহসান মনসুরের” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, “এই পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংক খাত ডুবিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে গতকাল বুধবার বিদায় নিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।” 

একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, “দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার পেছনে এই সাবেক গভর্নর নিজে দায়ী বলে অভিযোগ রয়েছে।” 

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ প্রকাশিত “শিল্পের টাকা বন্ডে বিনিয়োগ, মুনাফার অর্থে বিদেশ ভ্রমণ” শিরোনামের প্রতিবেদনে প্রকল্পভিত্তিক অর্থ ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলা হয়, “উপরন্তু সেই মুনাফার একটি অংশ ব্যয় করে বিদেশ সফরের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়ে গেছেন বিদায়ি গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।” 

১ মার্চ ২০২৬ এ বাংলাদেশ প্রতিদিনের বরাতে প্রকাশিত “মিথ্যা আশ্বাসে অর্থনীতির সর্বনাশ করা এক গভর্নর” শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, “তিনি শুধু মিথ্যা আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন” এবং “১৮ মাসে এক টাকাও ফেরত আনতে পারেননি বিদায়ি গভর্নর।” 

একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “দেশের অর্থনীতির বারোটা বেজেছে।”

২৮ ফেব্রুয়ারি খবরের কাগজের বরাতে “বালিকা বিদ্যালয়ে মনসুরের স্পা-রিসোর্ট” শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ। টাঙ্গাইলের বাসাইলে দাপনাজোর এলাকায় একই গেট ও রাস্তা ব্যবহার করে স্কুলছাত্রী ও অতিথিরা রিসোর্ট ও স্পা সেন্টারে যাতায়াত করছেন এমন অভিযোগ তুলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, স্পা সেন্টারটির মালিক বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ি গভর্নর আহসান হাবিব মনসুর।

লক্ষ্যণীয় যে আহসান হাবিব মনসুর গভর্নর থাকাকালীন সময়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সামাজিক বিতর্ক বা অবকাঠামোগত অনিয়মসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে দেখা যায়নি পত্রিকাটিতে।

জানুয়ারিতে যেখানে তাকে “প্রশংসনীয় উদ্যোগ” গ্রহণকারী ও স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করা নীতিনির্ধারক হিসেবে দেখানো হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহেই সেখানে একই পত্রিকায় তাকে “ব্যাংক খাত ডুবিয়ে”, “দুর্দশার পেছনে দায়ী” এবং “অর্থনীতির বারোটা বেজেছে” এর মতো তীব্র নেতিবাচক শব্দবন্ধে উপস্থাপন করা হয়েছে। 

উল্লেখ্য, এই মিডিয়া ওয়াচ প্রতিবেদনে কালের কণ্ঠের উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্য নাকি অসত্য তা যাচাই করা হয়নি। বরং সময় বদলের সাথে কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে একটি সংবাদমাধ্যমের ভাষা ও বয়ানগত পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।