Same Journalist Behind Objectionable Headlines in Three Bangladeshi News Outlets

Roby Hossain
By
Roby Hossain
18 August 2026

১৭ আগস্ট বগুড়ায় শাপলা বেগম (৪৫) নামে এক নারীকে ৫০টি টাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও ৩০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে শাপলা বেগমকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তার বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৬টি মামলা রয়েছে বলেও পুলিশ জানায়।

তবে শাপলা বেগমের আরেকটি পরিচয়ও এসব প্রতিবেদনে উঠে আসে—তিনি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে বগুড়ায় নিহত কিশোর সিয়াম শুভর পালক মা।

শাপলা বেগমের গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করতে গিয়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তাদের শিরোনামেই সিয়ামের ‘জুলাই শহীদ’ পরিচয়টি সামনে নিয়ে আসে। 

যুগান্তর প্রথমে “মাদকসহ বগুড়ার প্রথম জুলাই 'শহীদ' শুভর পালক মা শাপলা গ্রেফতার” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। 

ঢাকা ট্রিবিউন বাংলার প্রথম শিরোনাম ছিল “জুলাইয়ের প্রথম ‘শহীদ’ সিয়াম শুভর পালক মা মাদকসহ গ্রেপ্তার”। 

আর বাংলা ট্রিবিউন প্রথমে শিরোনাম করে “জুলাই শহীদ সিয়ামের পালক মাকে গ্রেফতার, পুলিশ বলছে ‘মাদক ব্যবসায়ী’”। পরে এসব প্রতিবেদনের শিরোনামে পরিবর্তন আনা হয়।

“হেরোইনসহ গ্রেপ্তার জুলাইয়ের প্রথম 'শহীদের মা” শিরোনামে এনপিবি নিউজও একই ঘটনার ওপর সংবাদ প্রকাশ করে।

পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব শিরোনাম নিয়ে সমালোচনা হলে যুগান্তর, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা ও বাংলা ট্রিবিউন তাদের শিরোনাম থেকে সিয়াম শুভর ‘জুলাই শহীদ’ পরিচয়টি সরিয়ে দেয়। এনপিবি তাদের প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেয়।

একই প্রতিবেদকের সংবাদ তিন সংবাদমাধ্যমে 

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, যুগান্তর, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা ও বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত শাপলা বেগমের গ্রেপ্তারের প্রতিবেদনগুলো করেছেন সাংবাদিক নাজমুল হুদা নাসিম। তিনি একই সঙ্গে তিনটি সংবাদমাধ্যমের কাজ করেন। 

নাজমুল হুদা নাসিমের স্ত্রী ডালিয়া নাসরিন রিক্তা বগুড়া সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং বগুড়া শহর মহিলা লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে বগুড়া বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক সুরাইয়া জেরিন রনির দায়ের করা হত্যা মামলা আছে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নাসিম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাকে আওয়ামী লীগের পক্ষে পোস্ট দিতে দেখা যায়।

আওয়ামী লীগের বগুড়া জেলা শাখার সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মমতাজ উদ্দিনের ছবি দিয়ে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, “মমতাজ ভাই নেই তাই বগুড়ার রাজনীতিসহ সবকিছু অগোছালো হয়ে গেছে” এবং বগুড়ার রাজনীতিতে তার মতো একজন নেতার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করেন।

অন্য একটি পোস্টে নাসিমকে বগুড়া শহরের টেম্পল রোডে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে মহিলা লীগ ও যুব মহিলা লীগের নেত্রীদের সঙ্গে ছবি দিতে দেখা যায়। আরেকটি পোস্টে বগুড়ার শ্রমিক লীগ, মহিলা লীগ ও যুব মহিলা লীগের নেতাদের সঙ্গেও তাকে দেখা যায়।

এ বিষয়ে যুগান্তরের অনলাইন হেড আতাউর রহমান বলেন, শাপলা বেগমের গ্রেপ্তার নিয়ে প্রকাশিত “মাদকসহ বগুড়ার প্রথম জুলাই শহীদ শুভর পালক মা শাপলা গ্রেফতার” শিরোনামের প্রতিবেদনটি বগুড়া প্রতিনিধি নাজমুল হুদা নাসিম পাঠিয়েছিলেন। 

নাজমুল হুদা নাসিমের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, শিরোনামটি তার দেওয়া কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত নন। পরে আবার বলেছেন, “আমি দিছিলাম হেডিংটা।” 

তিনি যুগান্তর, বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন বাংলার বগুড়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন বলেও জানান।

তিনি আরো বলেন, “এই শিরোনাম করার পেছনে আমার কোনো ইন্টেনশন ছিল না। মানে কাউকে ছোট করার বা কাউকে হেয় করার এসব করে নাই।” 

তিনি দাবি করেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। কাউকে খুশি বা হেয় করার উদ্দেশ্যে সংবাদ করেননি। 

“কেউ আমার সংবাদ নিয়ে কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখিত”, বলেন তিনি।

এ বিষয়ে অনলাইন পোর্টাল এনপিবি’র হেড অফ অনলাইন সায়েদ আল হাসান শিমুল বলেন, সংবাদটি পাঠান বগুড়া প্রতিনিধি নাজমুল ইসলাম। প্রতিনিধির পাঠানো সংবাদ সাধারণত যাচাই করা ও প্রকাশযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সাব এডিটর সেটি প্রকাশ করেছিলেন। তবে শিরোনামে জুলাই শহীদের পরিচয় যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ মনে হওয়ায় নিজ উদ্যোগেই সংবাদটি সরিয়ে দিই।

এনপিবি নিউজের বগুড়া প্রতিনিধি নাজমুল ইসলাম বলেন, শাপলা বেগমের গ্রেপ্তারের সংবাদটি তিনি সংগ্রহ করে পাঠিয়েছিলেন।

প্রতিবেদনের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, “ভাই এটা কি আপনার খুব বেশি দরকার?”

শিরোনামে জুলাই শহীদের পরিচয় যুক্ত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নিউজ হাইলাইট করার জন্য তো অনেক কিছুই করে।” 

শাপলা বেগমের গ্রেপ্তার ও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে কথা বলেন সিয়াম শুভর পালক বাবা আশিক। 

তিনি শাপলা বেগমের বিরুদ্ধে মাদকসহ ১৬টি মামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “সত্যি একটাও না। মানুষ চক্রান্ত করে এই কাজটা করেছে।

তিনি আরও বলেন, সিয়াম ছোটবেলা থেকেই তাদের সঙ্গে ছিল। সিয়ামের বাবা-মাকে তিনি চিনতেন। তারা নানা ধরনের সমস্যার কারণকে সিয়ামকে তাদের কাছে দিয়ে দেয়। সিয়ামের আসল বাবা মা বেঁচে নেই বলেও জানান তিনি।

দ্য ডিসেন্ট স্বাধীনভাবে শাপলা বেগমের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর সংখ্যা ও প্রকৃতি যাচাই করতে পারেনি।

গণমাধ্যমবিষয়ক গবেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ-আল মামুন মনে করেন, শাপলা বেগমের বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ থাকলে সেটি অবশ্যই সংবাদ হতে পারে। তবে তার সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে নিহত একজন ব্যক্তির পরিচয় যুক্ত করার সম্পাদকীয় প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, “শাপলা বেগমের মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ থাকলে সেটি সংবাদে আসতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, সেই তথ্যের সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে নিহত সিয়াম শুভর পরিচয় কেন যুক্ত করা হলো।”

তিনি আরও বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকেই একটি নির্দিষ্ট ধরনের মানুষ বা গোষ্ঠীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা গেছে এবং বর্তমান ঘটনাতেও একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল। সেই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদেরও একইভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের প্রবণতা থাকলে সেটিকে বৃহত্তর একটি মিডিয়া-ফ্রেমিংয়ের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।”

উল্লেখ্য, ১৯ জুলাই ২০২৫-এর “চব্বিশের ১৯ জুলাই: পুলিশের গুলিতে বগুড়ায় প্রথম এক কিশোরের মৃত্যু” শিরোনামে ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বগুড়ার সেউজগাড়ী আমতলীতে পুলিশের গুলিতে ১৬ বছর বয়সী সিয়াম শুভ নিহত হন।