How a Local BNP Leader Taught People Fearful of Hasina to Protest
২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদের শাসন স্বৈরশাসনে রূপ নেয় মূলত ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকেই। সেই একতরফা নির্বাচনে ১৫১ জন এমপি বিনা ভোটে নির্বাচিত হোন এবং বাকিরা ভোট চুরি আর কারচুপির মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নেন। জনপ্রশাসন, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনীর একাংশের ওপর শেখ হাসিনার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব তখন স্পষ্ট হয় দেশের মানুষের কাছে। ওই নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর নেমে আসে চরম নিপীড়ন।
মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের কণ্ঠরোধের চেষ্টাও বেড়ে যায় এরপর থেকে। ভয় জেঁকে বসতে থাকে মানুষের মধ্যে। সরকারের সমালোচনা বা সরকারপন্থী লোকজনের সমালোচনা করা কঠিন হয়ে ওঠতে থাকে। সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি বা মন্তব্যের জন্য মামলা বা হামলার মুখোমুখি হতে হয় অনেককে।
প্রতিবাদের ভাষা যখন সঙ্কুচিত হয়ে আসছিল, এমন সময় ফেসবুকে ভাইরাল হয় এক বৃদ্ধের মিনিট খানেকের একটি ভিডিও বক্তব্য। ক্ষুব্ধ ওই বৃদ্ধ এক মফস্বল শহরে স্থানীয় নির্বাচনের কারচুপি ঠেকাতে মাঠে নেমেছিলেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে। আওয়ামী লীগ আমলের যেকোন নির্বাচনের ঐতিহ্য মোতাবেক কেন্দ্র দখল করে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে জিতিয়ে দেন। হেরে যান ওই বিরোধী নেতা। এরপর রাগ, দুঃখ ও ক্ষোভ নিয়ে রাস্তায় নামেন অনুগত কয়েকজন কর্মীকে নিয়ে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বর্ণনা দিতে থাকেন ভোট কারচুপির।
ওইদিন তিনি যা বলেছিলেন সেই কথাগুলোর অনেকাংশ সাধারণ সুশীল আলাপে বলা যায় না। বেশ কয়েকবার তিনি এমন শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন যেগুলোকে সাধারণভাবে ‘শ্লীল’ শব্দ নয়। কিন্তু আব্দুল হাই যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, যেভাবে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীনদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিক শব্দ চয়নে কথা বলা হয়তো তার জন্য স্বাভাবিক ছিল না।
প্রতারিত, ক্ষুদ্ধ ওই বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিটির নাম আব্দুল হাই। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক উপমন্ত্রী, প্যানেল স্পিকার ও চারবারের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই (৭৭) ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন। মুন্সিগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন পার করা এই নেতার জন্ম ১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায়।
সেদিনের সেই ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা হয় আবদুল হাইয়ের বড় ছেলে ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইফতেখারুল আলম রিপনের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ঘটনাটি ছিল ২০১৪ সালের একতরফা জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী একটি উপজেলা নির্বাচনের সময়ের। সেদিন সকাল ১১টার মধ্যেই ভোটকেন্দ্রগুলো দখল করে সিল মারা শুরু হলে আবদুল হাই পুলিশের কাছে গিয়ে এর প্রতিবাদ জানান এবং কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের অনুরোধ করেন। কিন্তু পুলিশ তাতে কোনো কর্ণপাত করেনি।
ইফতেখারুল আলম রিপন বলেন, “ভোট কারচুপি চলতে থাকায় এবং পুলিশ কোনো অ্যাকশন না নেওয়ায় আব্বা ওই ভোট স্থগিত করার দাবিতে প্রতিবাদে নামেন। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা দেখে আক্ষেপ থেকেই তিনি সেদিন বলেছিলেন, এখন কার কাছে বিচার দেব, আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। পরবর্তীতে তাঁর সেই কথাগুলোকে একেকজন একেকভাবে ব্যাখ্যা বা সমালোচনা করলেও এর মূল বক্তব্য ছিল একটি প্রতিবাদ। আব্বা সবসময়ই রাজপথের এক প্রতিবাদী রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।”
আব্দুল হাইয়ের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তিনি যা বলেছিলেন তা হুবহু এখানে তুলে দেয়া হল:
“আমি নাম বলব না। একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই আইনশৃঙ্খলায় যারা নিয়োজিত নাম বললে চাকরি থাকবে না। ওই শালার পুতেরা চুপ থাক। উনি বললেন, আল্লাহর কাছে। ওই শালার পুতে রা। শালার পুতা রে। আল্লাহর কাছে বিচার রইল। ও ভাই স্লোগান দিয়েন না। স্লোগান দিবি মাইরালামু। এবং এইরকম বিচার আল্লাহ সহ্য করবে না। "ওই, তুমি ঠিক দাও ক্যান হেনো? শালার পুত, ভোট দিতে যাও না আবার ঠিক দাও!" সবাই হাত তোলেন। ওই শালার পুতেরা মোনাজাত কর। মোনাজাত ধর। ওই, ওরে শালার পুতেরা মোনাজাত ধর! মাইকন আনতে বলছিলাম। আল্লাহ। তোমার কাছে বিচার দিলাম। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সাথে। ওই, ওই, এইডা কয় না কোনোদিন, মনে মনে কইবি শালা! কলেমা তৈয়্যব লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। আপনারা সবাই বাড়ি যান। শনিবার হরতাল, হরতাল, হরতাল।”
তার এই বক্তব্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে গিয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের প্রতি আব্দুল হাইয়ের ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা যেন হয়ে ওঠেছিল সাধারণ মানুষের ভাষা।
খুব দ্রুতই ওই ভিডিওর কিছু বাক্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সামাজিক মাধ্যমে। এবং এক পর্যায়ে সেই বাক্যগুলো সামাজিক মাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে ওঠে আসে নানান শ্রেণী পেশার মানুষের মুখে মুখে। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত কলাম থেকে গান-নাটক-টকশোর রাজনৈতিক আলাপ-বইপত্র এমনকি রাজপথের কর্মসূচিতেও আব্দুল হাইয়ের উচ্চারিত সেসব বাক্য ‘ডায়লগ’ আকারে ব্যবহৃত হয়েছে এবং লাখো মানুষকে কোথাও উৎসাহিত করেছে প্রতিবাদ করতে, কোথাও স্রেফ আনন্দ দিয়েছে একটি কৌতুক হিসেবে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনা অব্যাহতভাবে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেছিলেন। তার ও তার সরকারের সমালোচকদের ওপর তিনি নানানভাবে নিপীড়ন চালিয়েছেন। প্রতিবাদী রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক কিম্বা মানবাধিকারকর্মী এমনকি অতি সাধারণ মানুষদেরকেও গুম, খুন ও জেলে ঢুকিয়ে রাখা হয়ে ওঠেছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্ট নামক নিপীড়ক আইন ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের নাম নিয়ে সমালোচনা করা যখন অসম্ভব করে তোলা হয়েছিল, তখন নিপীড়ত ও ভীত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেছিল হাইয়ের এসব ডায়লগ।
ভাইরাল ভিডিওর বক্তব্য থেকে হাইয়ের অন্তত ৩টি বাক্য বা ডায়ালগ জনপ্রিয় হয়েছিল। সেগুলো হলো:
“নাম বললে চাকরি থাকবে না”
“আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম”
“ওই শালার পুতেরা মোনাজাত ধর”
এর মধ্যে “নাম বললে চাকরি থাকবে না” ডায়লগটি ছিল বিশেষভাবে জনপ্রিয়। ক্ষমতাধর কারো নাম মুখে না নিয়ে কারো সমালোচনা করতে হলে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে এই ডায়লগটি ব্যবহার করতেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে কৌতুক করার জন্যও এটি ব্যবহৃত হয়। বাকি দুটি ডায়ালগও ব্যঙ্গাত্মকভাবে ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ব্যবহৃত হয়ে আসছে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আব্দুল হাইয়ের ডায়ালগ
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ও শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, পুলিশ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র তাণ্ডব, সেন্সরশিপ এবং গুম-খুনের ভীতির মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার ও দলটির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল আবদুল হাইয়ের এই সংলাপগুলো।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রায়হান আলী সরকার অনলাইন পরিচিত ব্যক্তিদের আন্দোলনে অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এক পোস্টে লেখেন, “উনাদের সবার ক্ষেত্রে বিষয়টা হলো, ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’।”

১৭ জুলাই ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে পোস্ট করার পর ফেসবুক আইডি রেস্ট্রিকশনের সতর্কবার্তা পাওয়ার কথা জানিয়ে এম মেরাজ লেখেন, “বলছিলাম না এটা এরকম একটা দেশ, যেখানে: নাম বললে চাকরি থাকবে না।”
একই দিনে আবদুল রহমান ছাত্রলীগের নেত্রীদের কান ধরে ওঠবস করানোর ছবি পোস্ট করে পোস্টে লেখেন, “নাম বল্লে চাকরি থাকবে না।”
১৮ জুলাই শাহরিয়ার হোসাইন লেখেন, “ন্যায় কে ন্যায় আর অন্যায় কে অন্যায় বললে কি চেতনা বিরোধী হয়ে যাবো? নাম বললে চাকরি থাকবে না! না চাটলে পোস্ট থাকবে না। না চাটলে পোস্টিং হবে না।”
১৯ জুলাই লাক্স ওমর ফারুক নামে একটি পেজ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পতাকার সঙ্গে ‘Pray for Hasina’ এবং ‘ঐ শালার পুতেরা, মোনাজাত ধর’ বাক্য দুটি পাশাপাশি রেখে পোস্ট করেন।
একই দিনে শহিদুল ইসলাম শহিদুল লেখেন, “হাসিনার জন্য মোনাজাত ধর শালার পুতেরা! আপা যেনো বোরকা পরে সেইফলি পালাইতে পারে।”
২৮ জুলাই শেখ হাসিনার বক্তব্যের একটি ভিডিও শেয়ার করে এস আই সাগর এক পোস্টে লেখেন, “ওই শালার পুতেরা মোনাজাত ধর!” ভিডিওতে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, “দেশবাসীর কাছে আমি বিচার চাই, অপরাধটা কী করেছি? আন্দোলনের নামে এতগুলো পরিবারের ক্ষতি হলো, এর দায়িত্ব কার? মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করে যাচ্ছি।”

পরদিন, ২৯ জুলাই, জাহিদ একই ধরনের বক্তব্যের ভিডিও শেয়ার করে এক পোস্টে লেখেন, “আরে শালার পুতেরা মোনাজাত ধর।” ওই ভিডিওতে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, “আল্লাহ খুনী জালেমদের হাত থেকে দেশকে যেন রেহাই দেয়”
৩০ জুলাই তৌফিক মাহবুব এক পোস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি, হলের আসন বণ্টন, নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘ সমালোচনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম প্রকাশ না করে তিনি লেখেন, “একটা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। নাম বলবো না। বললে সবাই চিনে ফেলবে!”
ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এলাকার আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ৫ আগস্ট ২খে উম্মে জান্নাত লেখেন, “নাম বললে চাকরি থাকবে না আমি নাম বলতেও চাইনা। আমাদের এলাকার পরিচিত কিছু পাতি আওয়ামী পা চাটা লোকজন কালকের থেকে যা শুরু করছে আর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যা যা মন্তব্য করছে মনে হচ্ছে আমার হাতে বা কাছে অস্ত্র থাকলে আমি আগে ওদের শেষ করতাম।”
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তানিয়া ইসলাম নামে একজন লেখেন, “‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’ এই লাইনটা দেখে আজ কতোকিছু মনে পড়ে গেলো, ওরা আমাদের মুখের ভাষা কাইড়া নিসিলো। যার ফলে এই কৌতুক লাইনগুলো আমরা ভাইরাল করতাম। এইটা এখন ভ্যালুলেস, এক্সপায়ার্ড হওয়া লাইন।”

একই দিনে ‘ওই শালার পুতেরা মোনাজাত ধর’ বাক্যটি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দেখা যায়। ‘সরি’ নামের একটি পেজের পোস্টে লেখা হয়, “ওই শালার পুতেরা মোনাজাত ধর! ১০ বছর পরে চাচার দোয়া কবুল হইছে।”
একই দিনে মোহাইমেন হায়দারের শেয়ার করা একটি ভিডিওতেও বলা হয়, “১০ বছর পর তার দোয়া কবুল হলো।”
স্বৈরশাসনের সময়কার ভয় ও দমন-পীড়নের প্রসঙ্গ টেনে ৭ আগস্টতারিখে এম জে ফেরদৌস এক পোস্টে লেখেন, “নাম বললে চাকরি থাকবে না, প্রতিবাদ করলে সন্তানকে তুলে নিয়ে ছিন্নভিন্ন করে ত্বকীর মতো শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়া হবে, নাম বললে গুম-খুন-ক্রসফায়ার-আয়নাঘর!”
জুলাই আন্দোলনে ক্যাম্পাসে পুলিশের অভিযানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ১১ আগস্ট ইমরান শাহরিয়ার এক পোস্টে বন্ধুর পরিচয় গোপন রাখার প্রসঙ্গে রসিকতা করে লেখেন, “বিকেলে পুলিশ যখন চার্জ করতে করতে লাইব্রেরির সামনে থেকে রেজিস্ট্রারের দিকে আসতে থাকে, আমি তখন বটে হাবীব ভাইয়ের দোকানে দুপুরের খাবার খেতে বসেছি। আমার সাথে ছিলো আমার এক বন্ধু (নাম বললে চাকরি থাকবে না)।”
১৪ আগস্ট পলাশ মজুমদার এক পোস্টে লেখেন, , আগের একটি স্ট্যাটাসের পর তাঁর কাছে হুমকিমূলক ফোন এসেছিল। তিনি লেখেন, “নাম বলবো না নাম বল্লে চাকরি থাকবে না”
সংবাদমাধ্যম ও লেখালেখিতে আব্দুল হাইয়ের ডায়ালগ
ভয় ও সেলফ-সেন্সরশিপের প্রতীক হিসেবে “নাম বললে কেন চাকরি থাকে না?” কথাটি জায়গা পায় মূলধারার পত্রিকা, ব্লগ ও টেলিভিশনের আলোচনায়। এমনকি সংবাদমাধ্যমের নীরবতাকেও এই বাক্য দিয়েই কটাক্ষ করা হয়েছে।
ভয় ও সেলফ-সেন্সরশিপের প্রতীক হিসেবে “নাম বললে কেন চাকরি থাকে না?” কথাটি ব্যবহার হয় মূলধারার পত্রিকা, ব্লগ ও টেলিভিশনের আলোচনায়। এমনকি সংবাদমাধ্যমের নীরবতাকেও এই বাক্য দিয়েই কটাক্ষ করা হয়েছে।
২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘নাম বললে কেন চাকরি থাকে না?’ শীর্ষক এক রম্যরচনায় লেখক অর্ণব সান্যাল তৎকালীন রাষ্ট্রীয় ভীতি ও সেলফ-সেন্সরশিপের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে লেখেন, “মনুষ্যজীবনের আর একটি অধ্যায়ই বাকি থাকল। তা হলো দেশ, জাতি, সরকার, রাষ্ট্র ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানেও ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’ পরিস্থিতি প্রবলভাবে বিরাজমান। প্রাবল্য এতটাই বেশি যে চাপ নেওয়া যায় না আসলে। টাল খেয়ে যেতে হয়। তবে এই অনুচ্ছেদে আমি বেশি কথা বলতে চাই না। কারণ, চাকরি ও জীবন—দুই–ই আমার খুব পছন্দের।”

ক্ষমতাবানদের নাম উচ্চারণ করা কেন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল, তা বোঝাতে সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার সংলাপের আদলে ওই লেখায় আরও বলা হয়, “এ দেশে নাম ধরে কিছু বললেই নামের মালিকের অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, আর সে জন্যই “নাম নেওয়া ব্যক্তির ‘চাকরি’ নিয়ে টান দেওয়া হয়। ... ‘চাকরি ধরে মারো টান, প্রজা হবে খান খান’।”
২০২২ সালের ২৭ জুন ‘দৃক নিউজ’ এ প্রকাশিত ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’ শিরোনামের নিবন্ধে লেখক ও গবেষক ফিরোজ আহমেদ লিখেন, “‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’—হালের একটা জনপ্রিয় প্রবচন। ঠিকঠাক মত নাম জপ করতে পারলে অবশ্য সাত খুনও মাফ হবে। কিন্তু এই চাকরির ভয় বা লোভ তো কেবল যারা ‘চাকর’, তাদেরই পাবার কথা। চাকরি করে যারা খান না, তারাও যখন আতঙ্কে ভোগেন, তখন বোঝা যায়, মাসে মাসে বেতন পাওয়া বাদেও আরও বহু রকমের চাকরি সংসারে আছে, এমনকি বেঁচে বর্তে থাকাটাও এই চাকরির মাঝেই পড়ে। ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’—এই প্রবাদে তাই শুধু বেতন পাওয়া চাকরিটার কথা বোঝানো হয় না। রীতিমত ধুকপুক করা জানটারও কথা বোঝায়।”
২০১৮ সালের ২২ মে ‘সামহোয়্যার ইন ব্লগ’-এ রাজীব নুরের লেখা ‘দুইটা ছোট গল্প’ শিরোনামে একটি গল্পে এক অজ্ঞাত দেশের রূপকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় লুটপাটের চিত্র তুলে ধরা হয় এবং শেষে উল্লেখ করা হয় “নাম বললে চাকরি থাকবে না” লাইনটি।
টেলিভিশন টকশোতেও বাক্যটির ব্যবহার দেখা গেছে। ‘Rtv Politics ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি টকশোর ভিডিও ক্লিপে কালের কণ্ঠের যুগ্ম সম্পাদক সাঈদ খানকে বলতে শোনা যায় “নাম বলবো না, নাম বললে চাকরি থাকবে না কারণ মব আতঙ্ক এখনো বিরাজমান”।

বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রভাবশালী বা শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে যে সেলফ-সেন্সরশিপ বা ভীতির সংস্কৃতি রয়েছে, তা তুলে ধরতে গিয়েও ব্যবহার করা হয়েছে আবদুল হাইয়ের সংলাপ।
২০২১ সালের এ ২৬ এপ্রিল রাতে রাজধানীর গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়া নামের এক কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করে নিহতের পরিবার।
কিন্তু আসামি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হওয়ায় সেই সময় দেশের অনেক মূলধারার টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যম সরাসরি তাঁর নাম বা পরিচয় প্রচার করতে সাহস পায়নি।
সংবাদের শিরোনাম বা স্ক্রলে নাম উহ্য রেখে ব্যবহার করা হয় ‘দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ কিংবা ‘শীর্ষ শিল্পপতি’র মত শব্দ।
সংবাদমাধ্যমের এই সতর্কতা ও প্রভাবশালী মহলের ভয়ে সংবাদ প্রকাশে বিরত থাকার প্রবণতাকে ব্যঙ্গ করে তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না | মোনাজাত ধর হালার পুতেরা’ শিরোনামে বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ ও মিম ভাইরাল হয়।

২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল শেখ রপু (Sheikh Rupu) নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী একাত্তর টিভি, যমুনা টিভি, সময় টিভি, ডিবিসি নিউজ এবং ইনডিপেনডেন্ট টিভির সংবাদ শিরোনামের স্ক্রিনশট একত্রিত করে একটি পোস্ট দেন।
যেখানে দেখা যায়, প্রতিটি চ্যানেলই মৃত্যুর ঘটনাটি প্রচার করলেও মূল অভিযুক্তের নাম বা পরিচয় সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে: ১. ‘গুলশানে ছাত্রীর আত্মহত্যা’ (৭১ টিভি) ২. ‘গুলশানে ফ্ল্যাটে তরুণীর লাশ’ (যমুনা টিভি) ৩. ‘রাজধানীর গুলশান থেকে তরুণীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার’ (সময় টিভি) ৪. ‘তরুণীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার’ (ডিবিসি নিউজ) ৫. ‘গুলশানে তরুণীর লাশ উদ্ধার’ (ইনডিপেনডেন্ট টিভি)
এই পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছিল, "বাহ ছুদির পো বাহ!!!! নাম বললে চাকরি থাকবে না"।
রাজনীতি, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সমালোচনায় আব্দুল হাইয়ের ডায়ালগ
ক্ষমতাবানদের দিকে আঙুল তুলতে রাজনীতিক, আমলা ও অ্যাক্টিভিস্টরা বিভিন্ন সময়ে এই বাক্যটি ব্যবহার করেছেন।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও আলোচিত সরকারি কর্মকর্তা মাহবুব কবির মিলন তৎকালীন আমলাতন্ত্রের ভেতরকার ভীতি ও সেলফ-সেন্সরশিপের সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে ২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি Public Services Help গ্রুপে একটি পোস্টে লিখেন, “নাম বললে চাকুরি থাকবে না। আপনাদের বলার দরকার নেই। গোপনে আমাকে দিন। ইনবক্সে বা মোবাইলে। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য আমদানি বা ভেজালের উপরে। চাকুরি গেলে আমারটাই যাক। আপনারা ভাল থাকুন। আমাদের সন্তানদের জন্য চাকুরিটা হারাতে চাই আমি।”

অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্যের একটি ইউটিউব শর্টস ভিডিওতে দেশের একটি রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ্য করে তাঁকে বলতে শোনা যায়: “বাংগুল্যান্ডে সংবিধানপ্রেমী একটা দল আছে না? জানেন তো। সংবিধান না মেনে কিছুই করে না, হাগামতোও করে না। আপনারা জানেন কোন সে দল। আমি নাম করতে চাই না। নাম বললে চাকরি থাকবে না।”
জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক মুহাম্মাদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকেও দেশের গণমাধ্যমের ভূমিকা সমালোচনা করতে গিয়ে ব্যবহার করেন ওই বাক্যটি।
এক বক্তব্যে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “যেটা গণমাধ্যম হওয়ার কথা ছিল, সেটা আগে ছিল হাসিনা মাধ্যম। এখন আবার কী নাম দিব, সেটা বললে তো আর চাকরি থাকবে না।”

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরের বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ নেতাকর্মীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে তৎকালীন হাসপাতালগুলোর অসহযোগিতা ও চিকিৎসকদের অনীহার চিত্র উঠে এসেছে। আহতদের চিকিৎসায় তৎকালীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা চিকিৎসা দেয়নি। নাম বললে অনেকের এখন চাকরি থাকবে না। আমাদের নেতাকর্মীদেরকে আমরা চিকিৎসা করাতে পারিনি। এমনও ডাক্তার আমাকে ফোনে বলেছে আন্দোলনে যাওয়ার কি দরকার ছিল? হসপিটালে ভর্তি করার জন্য আমাদের দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান... উনি পাঁচবার ফোন করেছেন পাঁচ জায়গায়। তাও ভর্তি করানো কষ্টকর হয়েছে।”

রাষ্ট্রীয় রাজনীতি ও দমনপীড়নমূলক পরিবেশে কোনো বিশেষ ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা কিংবা সেই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ভীতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও আবদুল হাইয়ের এই বক্তব্যটি ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর এনামুল হক নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জন্মদিনে তাঁর একটি ছবি শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখেন, “আজ আপনার শুভ জন্মদিন, আমরা একজন বীর বাঙালি হারিয়েছি যার অবদান কৃতিত্ব ও ভালোবাসার মূল্য কোন দিনও বাঙালি জাতি দিতে পারবে না। সেই মহান ব্যক্তির নাম আমাদের ইতিহাসের পাতা থেকে দিন দিন মুছে যাচ্ছে বা মুছে দিচ্ছে কিছু মানুষ। নাম বললে চাকরি থাকবে না 😓”
বৈদেশিক বাণিজ্যের বৈষম্য এবং প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে অসম দ্বিপক্ষীয় চুক্তির সমালোচনা করতে ‘Tiro Andaz’ পেজ থেকে একটি পোস্টে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভারতে ইলিশ মাছ রফতানির সিদ্ধান্ত এবং এর পেছনের রহস্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সেখানে রফতানিকারকদের সিন্ডিকেট এবং বাজারদরের চেয়ে কম দামে ভারতে ইলিশ পাঠানোর অসংগতি তুলে ধরে বলা হয়, “তেনাদের ওপার প্রেম (নাম বললে চাকরি থাকবে না)”
সামাজিক অন্যায় ও ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রকাশে আব্দুল হাইয়ের ডায়ালগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রেও শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে আবদুল হাইয়ের এই বক্তব্যটি।
২০১৯ সালের ৮ অক্টোবর Shabbir Ahmad Tamim নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক পোস্টে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনিয়ম ও উপাচার্যের স্বজনপ্রীতির স্মৃতিচারণমূলক একটি লেখার শিরোনাম দেওয়া ছিল: “নাম বললে চাকরি থাকবে না -৮”।
সমাজের অসংগতি ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের অন্যায়-অবিচার ফুটিয়ে তুলতে গিয়েও আবদুল হাইয়ের এই বক্তব্যটি রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
২০২০ সালের ২১ জুলাই ‘অস্ট্রিক ঋষি’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে মাগুড়ার মহম্মদপুরের একটি নির্মম ঘটনার প্রেক্ষিতে শেয়ার করা পোস্টে লেখা হয়, “ধর্ষণের শিকার হওয়া এক স্কুলপড়ুয়া মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ায় গ্রাম্য শালিসে উল্টো তার পরিবারকেই দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করা হয়, এবং সেই অবিচারকারী প্রভাবশালী স্থানীয়দের ব্যঙ্গ করে বলা হয় “নাম বললে চাকরি থাকবে না” দলের নেতারা এই কাণ্ড ঘটিয়েছে।

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের যন্ত্রণাও প্রকাশ পেয়েছে আবদুল হাইয়ের এই উক্তিটির মাধ্যমে।
২০১৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ‘M.M.C Troll’ পেজ থেকে প্রকাশিত একটি পোস্টে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার ও হোটেলের দাম বৃদ্ধির একটি নোটিশের সাথে আবদুল হাইয়ের প্রতিবাদের ছবিটি কোলাজ করা হয়। রুটি, পুরি, সিঙাড়া, চা কিংবা ভাতের দাম বাড়ার নোটিশের নিচে ক্যাপশনে লেখা হয়েছিল:
“আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম!!”
২০১৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর (Rokibur Rahman Biplob নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী পানি সংকট, লোডশেডিং এবং তীব্র গরমে মানুষের নাজেহাল অবস্থা নিয়ে একটি পোস্ট দেন। বাসায় পানি না থাকা, ডিনারের সময় লোডশেডিং এবং গরমের তীব্রতাকে ব্যঙ্গ করে সেই দীর্ঘ পোস্টের একেবারে শেষাংশে তিনি লেখেন:
“আল্লাহ্ তোমার কাছে বিচার দিলাম। 😡😡😡”
গান, বই ও নাটকে হাইয়ের ডায়ালগের ব্যবহার
অনলাইনের বাইরে বাক্যটি গান, বই, ওয়েব ফিল্ম ও সাক্ষাৎকারেও জায়গা করে নিয়েছে।
২০১৯ সালে ইউটিউব চ্যানেল ‘দ্য আজাইরা লিমিটেড’ থেকে মুক্তি পায় ‘বসেন বসেন গান’ (Boshen Boshen Song) শিরোনামের একটি অফিসিয়াল মিউজিক ভিডিও।

ডিপজল ও শেফাত উল্লাহর সংলাপের পাশাপাশি এই গানটির লিরিক্সে ব্যবহার করা হয় আবদুল হাইয়ের “আমি নাম বলব না। একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই আইনশৃঙ্খলায় যারা নিয়োজিত। নাম বললে চাকরি থাকবে ন।” বক্তব্যটটি
ভিডিওটি ইউটিউবে ৪ কোটি ১৭ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে।
আবদুল হাইয়ের এই সংলাপের রিমিক্স ভার্সন ছড়িয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষের উৎসব-আতিথেয়তায়ও। ২০২১ সালে ই্উটিউবে ‘Dance Bangla Mix Song 2021 | নাম বললে চাকরি থাকবে না’ শিরোনামের ভিডিওতে সাধারণ বিয়েতেও এই গান ব্যবহার করতে দেখা যায়।
আবদুল হাইয়ের এই বক্তব্য জায়গা করে নেয় বইয়ের মলাটেও। ২০২০ সালে দাঁড়িকমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় রম্যলেখক রোহিত হাসান কিছলুর ব্যঙ্গ ও রম্যরচনার বই ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’।

আবদুল হাইয়ের এই কথাটি জায়গা করে নেয় দেশের নাটক ও ওয়েব ফিল্মের সংলাপেও। ২০২২ সালে দীপ্ত টিভিতে মুক্তি পায় নির্মাতা সঞ্জয় সমাদ্দারের পরিচালনায় এবং জিয়াউল ফারুক অপূর্ব ও নুসরাত ফারিয়া অভিনীত ওয়েব ফিল্ম ‘আইকন ম্যান’।
ফিল্মটির একটি দৃশ্যের সংলাপে ব্যবহার করা হয় ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’ বাক্যটি।

আবদুল হাইয়ের এই বক্তব্যটি জায়গা করে নিয়েছে শোবিজ অঙ্গনেও।
একটি ইউটিউব শর্টস ভিডিওতে কোনো একজন গায়ককে প্রশ্ন করা হয় সঙ্গীতজগতে তাঁর সাথে জুটি হিসেবে ভক্তরা সবচেয়ে বেশি কাকে দেখতে চায় এবং সুনির্দিষ্টভাবে একজন গায়িকার নাম বলতে বলা হয়।
একাধিক জনপ্রিয় গায়িকার নাম চলে আসায় কারোর নাম এককভাবে বেছে না নিতে পারার শিল্পী ব্যবহার করেন আবদুল হাইয়ের বক্তব্যটি, “So আমি আসলে separately কারো নাম বলাটা খুবই tough. নাম বললে চাকরি থাকবে না, না?”
ক্যাম্পাস, খেলা ও দৈনন্দিন রসিকতায় হাইয়ের ডায়ালগের ব্যবহার
তরুণদের ক্যাম্পাস-সংস্কৃতি, ফুটবল-সমর্থকদের ট্রল এবং এমনকি পণ্যের বিজ্ঞাপনেও বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে।
গত ২৪ জানুয়ারি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রিক পেজ ‘দ্য এনএসইউ ইনসাইডার’ (The NSU Insider) এর একটি পোস্টে ক্যাম্পাসের ছবির ওপর লেখা হয়, ‘এইইই!!! ছেলেরা বাম সাইডে বসো, মেয়েরা ডান সাইডে বসো’। কাকে ইঙ্গিত করে এই রসিকতা, তা সরাসরি উচ্চারণ না করে ক্যাপশনে জুড়ে দেওয়া হয় আবদুল হাইয়ের বক্তব্য ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’।
২০২৫ সালের আগস্টে ‘SARCASM OF AIUB’ পেজের একটি ভিডিও শেয়ার করে শাহরিয়ার আহমেদ ক্যাপশনে লেখেন, “নাম বললে চাকরি থাকবে না..!”

ভিডিওটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পড়ানোর পদ্ধতি ও স্লাইড রিডিং নিয়ে রসিকতা করা হয়।
২০১৮ সালের ২৪ জুলাই Muhammad Hossain Tanzil নামে কুয়েটে টিএসসি নির্মাণের দাবিতে একটি মিম পোস্ট করেন। সেখানে আবদুল হাইয়ের প্রতিবাদের ছবি এডিট করে যুক্ত করার ক্যাপশনে লেখা হয়: “- মোনাজাত ধর শালার পোতেরা। আল্লাহ তোমার কাছে বিচার দিলাম।😭😭
সাধারণ মানুষের ব্যক্তিজীবনের নিছক আক্ষেপ, ছুটির দিনের একঘেয়েমি কিংবা ফেসবুক ফিডে বন্ধুদের ভ্রমণের ছবি দেখে নিজের ঘরবন্দি জীবনকে ব্যঙ্গ করতেও ব্যবহার করা হয়েছে আবদুল হাইয়ের এই উক্তিটি।
২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর Asiful Haque Sany নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী নিজের ওয়ালে একটি স্ট্যাটাস দেন, “কেউ শ্যামলী, কেউ কক্সবাজার, কেউ সেন্ট মার্টিন, কেউ সাজেকে, কেউ সুন্দরবন, কেউ গোলাপগ্রামে ঘুরতেছে আর আমি বইসা আল্লাহর কাছে বিচার দেই। হে আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম। ঐ শালারপুতেরা, মোনাজাত ধর।”
ফুটবল অঙ্গন এবং আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল চিরকালীন সমর্থকদের চিরচেনা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও ট্রলের সংস্কৃতিতেও ব্যবহার হয়েছে আবদুল হাইয়ের এই বক্তব্যটি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রাজিল সমর্থকদের উদ্দেশ্যে আর্জেন্টিনা এক সমর্থকের গাওয়া ভাইরাল একটি গানেও এই বাক্যটি ব্যবহার করা হয়। গানটির একটি অংশে গাওয়া হয়, “সাত গোল খেয়ে তারা চাপাবাজি করেছে। আরে তারা কারা? নাম বললে চাকরি থাকবে না।”
বার্সেলোনার হয়ে জয়ের পর মাঠে লিওনেল মেসিকে নিয়ে সতীর্থ ও ভক্তদের উল্লাস এবং কাঁধে তুলে নেওয়ার ভিডিও ক্লিপে আবদুল হাইয়ের, “ঐ শালার পুতেরা... মোনাজাত ধর...” ও “আল্লাহ! তোমার কাছে বিচার দিলাম!” বক্তব্যটি ব্যবহার করা হয়েছে।
ফিফার মঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজেই নিজের গলায় মেডেল পরার একটি ভিডিও ক্লিপ নিয়ে সাবাদিক রাজীব হাসান ফেসবুকে পোস্ট করে ক্যাপশন দেন: “সারা পৃথিবীতে এই রকম নার্সিসিস্ট দু্জনই আছে। নাম বললে চাকরি থাকবে না 🤐”।
আবদুল হাইয়ের “ চাকরি থাকবে না” কথাটি পণ্যের বিজ্ঞাপনের ভাষা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
‘Protein Lovers Bd’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে মাছ বিক্রির বিজ্ঞাপনে একটি ছবি শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখা হয় ‘এই মাছের নাম বললে নাকি চাকরি থাকবে না’।

প্রয়াত রাজনীতিবিদ আবদুল হাইয়ের “আল্লাহ, তোমার কাছে বিচার দিলাম!” বক্তব্যটি ব্যবহার করা হয়েছে রান্নার শো নিয়ে করা একটি ট্রল ভিডিওতে।
দেশ টিভিতে প্রচারিত ক্লিপটিতে কেকা ফেরদৌসীকে আস্ত মুরগির পেটে কাঁচি দিয়ে কেটে নুডুলস ঢোকাতে দেখা যায়।
রান্নার এই অদ্ভুত পদ্ধতিকে ব্যঙ্গ করে ভিডিওর শেষাংশে মোরগের ডাকের সঙ্গে আবদুল হাইয়ের “আল্লাহ তোমার কাছে বিচার দিলাম” বাক্যটি ব্যবহার করা হয়েছে।
মিম, জিআইএফ ও ভিডিওতে হাইয়ের ডায়ালগের ব্যবহার
আবদুল হাইয়ের বক্তব্য জায়গা করে নিয়েছে ইমোজি বা জিআইএফ (GIF) সংস্কৃতিতেও।
সাদা শার্টের ওপর নীল সোয়েটার পরে দুই হাত উঁচিয়ে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সেই মুহূর্তটি স্থান পেয়েছে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় জিআইএফ সার্চ ইঞ্জিন টেনর (Tenor)-এ ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না GIF’
তাঁর একই বক্তব্যের অন্য অংশগুলো নিয়ে তৈরি ‘আমি নাম বলবো না’ কিংবা ‘একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ভাই’ টাইটেলে আলাদা জিআইএফ-ও (GIF) জায়গা করে নিয়েছে এই প্ল্যাটফর্মে ।

সমাবেশে দুই হাত আকাশের দিকে তুলে আবদুল হাইয়ের বলা ‘আল্লাহ! তুমার কাছে বিচার দিলাম’ কথাটি হয়ে উঠেছিল নিপীড়িত ও বিচারহীনতায় ভোগা মানুষের আক্ষেপ প্রকাশের সার্বজনীন মিম।
বাংলা মিম ওয়েবসাইট ‘মিমলেট’ এ ২০২২ সালের ২১ আগস্ট ‘বাংলাদেশ পলিটিক্স’ এবং ‘পপুলার বাংলাদেশি মিম ক্যারেক্টারস’ ক্যাটাগরিতে যুক্ত করা হয় তাঁর ‘আল্লাহ! তুমার কাছে বিচার দিলাম’ মিম টেমপ্লেটটি।
ফেসবুক কমেন্ট, মেসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটবক্সে কোনো সংবেদনশীল বা ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে ইঙ্গিত করার সময় বাড়তি কোনো শব্দ না লিখেও নেটিজেনরা সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করেছেন আবদুল হাইয়ের এই অ্যানিমেটেড ক্লিপটি।
প্রয়াত রাজনীতিবিদ আবদুল হাইয়ের এই অডিও ক্লিপটি জায়গা করে নিয়েছে অডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম সাউন্ডক্লাউডেও
‘Nur’ নামের একজন ব্যবহারকারীর আপলোড করা এই ট্র্যাকটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে “ঐ শালার পুতেরা মোনাজাত ধর- ভাই বলছে কানতে!”

ট্র্যাকটির ব্যবহারকারীর বিবরণীতেলেখা হয়েছে— “যখনই আমি বিষন্ন হয়ে উঠি... বিরক্তি আমায় চেপে ধরে... তখনই আমি এটা শুনি আমি হাসি...” এবং ট্যাগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে #Fun, #Hortal, #Election, #Jaamati, #Rajakar কিওয়ার্ড।
রিয়াজ হান্নান নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারীর একটি রাজনৈতিক স্যাটায়ার পোস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার পাওয়া নিয়ে সমালোচনা করে পোস্ট করেন। সেই পোস্টের শেষে তিনি লিখেন, “আল্লাহ তোমার কাছে বিচার দিলাম।”
মাছরাঙ্গা টিভির একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সাধারণ জ্ঞান ও মৌলিক বিষয়ে দুর্বলতার চিত্র ফুটে ওঠে, যা পরবর্তীতে ইন্টারনেটে ট্রল ও স্যাটায়ারের বড় খোরাক হয়ে ওঠে। Bro, বুচ্ছোনা? নামের একটি পেজের ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের এমন ভুল উত্তরের পরপরই ব্যাকগ্রাউন্ডে জুড়ে দেওয়া হতো আবদুল হাইয়ের সেই সংলাপ, “আল্লাহ!! তোমার কাছে বিচার দিলাম,,, হরতাল! হরতাল!! হরতাল!!!”