শিশু অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড নিয়ে আওয়ামী এক্টিভিস্টদের উল্লাস, উপহাস
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) হত্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন আইডি, পেজ ও গ্রুপ থেকে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন অপ্রতিম।
শনিবার দুপুরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে এই হত্যাকান্ডের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সমর্থক ও অ্যাক্টিভিস্টরা শিশুটির মৃত্যু নিয়ে ফেসবুকে উল্লাস প্রকাশ করে পোস্ট করছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নাহিদা বেগমের রাজনৈতিক অবস্থান ও সমর্থনের কারণেই তারা নাহিদ বেগমের সন্তানের মৃত্যু নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছেন।
উল্লাসকারীদের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তারা কুরুচিপূর্ণ ভাষায় নিহত শিশুটির মাকে আক্রমণ করছেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অ্যাক্টিভিস্টদের পোস্টে নাহিদা বেগমকে ‘লালবদর’, ‘জুলাই সন্ত্রাসী’, ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে তার সন্তানের মৃত্যুকে ‘কর্মফল’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’ ও ‘উপহার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সন্তানের মৃত্যুকে ‘কর্মফল’ ও ‘উপহার’ বলছেন আওয়ামীপন্থীরা
আওয়ামীপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট সুশান্ত দাস গুপ্ত নাহিদা নাহিদের ২০২৪ সালের ১৮ জুলাইয়ের একটি পুরোনো পোস্টের সঙ্গে নিহত শিশুটির ছবি যুক্ত করে লেখেন, “আহ বাংলাদেশ...আহ প্লান...আহ নতুন বাংলাদেশ।”
এই পোস্টের নিচে মুহাম্মদ শাহজালাল জনি লিখেছেন, “নাহিদা নাহিদ আপনারা এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন।”
মো. আরিফ হাসান লিখেছেন, “লাল স্বাধীন উপভোগ করুন।”
‘১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি।’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়েছে, “স্বজন হারানোর বেদনা চু'দিনা স্লোগান দেয়া লাল্মাগী নাহিদা নাহিদ আপার সন্তান হারানোর বেদনায় গভির শোক জানাচ্ছি।”
অন্যদিকে আমিন শাফি লিখেছেন, “দেশ বিরোধী হিসেবে ঘৃনা করি।”
এম হারুন আল রশিদ নাহিদা নাহিদাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, “লালবদর নাহিদা নাহিদ মেয়েটা বাংলাদেশে গজব এনেছে। সে নাকি আবার লেখক। আমি বুঝি না কী করে একটা লালবদর লেখক হয়। বাংলাদেশের আমাদের বেশিরভাগ মানুষের অনুভবে লেখালেখির মৌলিক ধারণা অনুপস্থিত বিধায় এক জন লালবদরও লেখক হয়ে যায়। হাজার মায়ের কোল খালি করা নাহিদা নাহিদের আজকে নিজের কোল খালি হল। একটা জাহান্নাম তৈরিতে সে ভূমিকা রেখেছে। আমি দুটো পরিস্থিতির বেদনাই অনুভব করছি। কিন্তু এই লাল জঙ্গিনীর নিজের অপরাধ অনুভব করার ক্ষমতা নাই।”
কাজী মামুন লিখেছেন, “আহারে কী নিস্পাপ বাচ্চাটা! ওর মা গিয়েছিল ছব্বিশের ষড়যন্ত্রে শেখ হাসিনাকে দেশছাড়া করতে। আজ আর কারো সন্তানই নিরাপদ নাই!”
Sultana Papia একই ছবি পোস্ট করে লেখেন, “লাল বদর বাল বদর দেশদ্রোহী ডলারখোরদের জন্য কোন প্রকার সিমপ্যাথি কাজ করেনা তোদের সৃষ্টি করা দেশ চোখের সামনে এত এত অপরাধ নৈরাজ্য হচ্ছে একটা প্রতিবাদ করিস না এখন কেমন লাগছে নিজের সন্তানের ভয়াবহ পরিনতি দেখে???দেশদ্রোহীদের আল্লাহ ক্ষমা করবেন না বাচ্চাটার জন্য সত্যিই খারাপ লাগছেআওয়ামীলীগের নিরিহ হাজার হাজার সমর্থক কর্মিরা বিনা অপরাধে জীবন দিছে তোদের মত লাল বদরদের কারনে।”
তিনি আরেকটি পোস্টে লেখেন: “এটা তোমাদের স্বাধীন করা নতুন লাল স্বাধীন বাংলাদেশ যেখানে মন খুলে কথা বলবা বাক স্বাধীনতার দেশ যদি প্রশ্ন করো নতুন লাল স্বাধীনতা আমাকে কি দিয়েছে? উত্তরে বলবো তোমার ছেলের লাশ উপহার দিয়েছে তোমাদের জন্য কোন সিমপ্যাথি নাই করুনা আর ঘৃনা আছে”
ভৈরব উপজেলা আওয়ামীলীগ পেজ থেকে অপ্রতীমের ছবি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “অপ্রিতম এর মা একজন জুলাই যোদ্ধা। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা৷ এই অনিরাপদ দেশ গড়ার পিছনে উনার ব্যাপক অবদান আছে।”
আশরাফুর রহমান নামে একজন বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ ফেসবুক গ্রুপে অপ্রতীমের মৃত্যুকে ‘কর্মফল’ হিসেবে উল্লেখ করে লিখেছেন, “এগুলো তোমাদের স্বীয় কর্মফল। আর কর্মফল ভোগ করতে হয়, করতেই হবে।নিশ্চয়ই এটা তোমার প্রায়শ্চিত্ত।”
ভদ্রঘাট ইউনিয়ন যুবলীগ নামে একটি পেজ থেকে অপ্রতীমের লাশ উদ্ধারের ভিডিও শেয়ার করে লেখা হয়েছে, “লালবদর" মা" নাহিদা নাহিদ লাল স্বাধীনতা অজর্ন করে তার ১৩ বছর বয়সের ক্লাস সেভেনে পড়া ফুটফুটে কিশোর ছেলেকে হারালো! এই ভাবে প্রতিদিন খালি হচ্ছে মায়ের বুক। প্রাণ হারাচ্ছে শিশু কিশোর যুবক বৃদ্ধ সব শ্রেণীর মানুষ। নিশ্চুপ অথর্ব সরকার প্রশাসন,দেশে চলছে নৈরাজ্য, অরাজকতা, মানুষ হত্যার মহা উৎসব।
অপ্রতীমের মৃত্যুকে নাহিদা নাহিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফল হিসেবে উল্লেখ করে রেহান উল হক রাফি লিখেছেন, “অপ্রতীমের মা লালবদর ছিলেন, শেখ হাসিনার পতনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তারপর দানব ইউনুসের আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন। হামে আক্রান্ত হয়ে ২-৩ হাজার শিশু মারা যাওয়ার পরেও মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছিলেন। অথচ আজকে অপ্রতীমের লাশ দেখে আমরা চোখে পানি আটকে রাখতে পারছিনা। শিশুদের জন্যে অনিরাপদ এই বাংলাদেশ তৈরি করায় অপ্রতীমের মার ভূমিকা ছিলো সরাসরি।”
জোমাদ্দার মনির লিখেছেন, “এক লালবদর মা নিজের দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ে সাধারণ জনগণের দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছে। তার প্রতিদান হিসাবে প্রকৃতি কেড়ে নিল একটি নিষ্পাপ প্রান।”
শিশুটির মাকে ২৪ এর জঙ্গিদের সহযোগী উল্লেখ করে তামান্না মুনিরা লিখেছেন, “এই শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে ওর সাথে আমাদের তো কারো কোনো রাজনৈতিক, আদর্শিক বিরোধ নেই থাকার কথাও তো না। ওর মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড.নাহিদা। তিনি লালবদর,গুজববাজ। তিনি কুমির এনেছেন, সেই কুমির এখন তার সন্তানকে খেয়েছে। এখন তার সন্তান হারিয়ে তিনি তাদের ২৪ এর তথাকথিত জঙ্গিদের স্বাধীনতার উপহার পেয়েছেন।
নিশিত সরকার মিঠু লিখেছেন, “অপ্রতীম এর মা শিক্ষিকা নাহিদা নাহিদ এর প্রোফাইল ঘুরে এলাম। ২০২৪ এর আগস্ট এ বিপ্লবী ছিলেন। কেউ কেউ বললো উনি নাকি স্বজন হারানোর বেদনা টুটটুট ,শ্লোগানও দিসেন তখন।”
অন্যদিকে সাইফুর রহমান নামে একজন নাহিদা নাহিদকে ‘লালবদর’ শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্য দাবি করে তার ২০২৪ সালের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন।
নাবিলা হক নামে একজন লিখেছেন, “এমন লালবদর রাজাকারের ঘরে এত সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা জন্ম নেওয়াটাই ছিল অপরাধ। এত সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চাটা মৃত্যুর কারণ তার মায়ের মত লাল বদর রাজাকারদের সৃষ্টি করা এমন দুর্বিষহ ভয়ংকর পরিস্থিতি।”