গ্রামীণ সড়কেও শিশুদের ‘মৃত্যুদূত’ হয়ে উঠছে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের সেনেরহুদা গ্রামের চার বছরের শিশু রোজা বাড়ির পাশের দোকানে গিয়েছিল আচার কিনতে। দোকানে আচার না পেয়ে সেই টাকা মুঠোয় ধরে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা পার হচ্ছিল সে। এ সময় বিড়িবোঝাই একটি দ্রুতগতির ইজিবাইকের ধাক্কায় রাস্তায় ছিটকে পড়ে রোজা। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।
নেত্রকোনার পূর্বধলায় মাদ্রাসা ছুটির পর বাড়ি ফিরছিল ছয় বছরের শিশু মারিয়া আক্তার প্রীতি। নয়াপাড়া থানা রোড এলাকায় রাস্তার অপর পাশে বাবা আবুল কালাম আজাদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খুশিতে দৌড়ে রাস্তা পার হতে যায় সে। কিন্তু বাবার কোলে পৌঁছানোর আগেই একটি চলন্ত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তাকে ধাক্কা দেয় এবং একটি চাকা তার শরীরের ওপর দিয়ে চলে যায়। বাবার চোখের সামনেই প্রাণ হারায় প্রীতি।
কেবল রোজা বা প্রীতি নয়, রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা ছাড়াও গ্রামীণ নীরব সড়কেও অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশায় প্রাণ যাচ্ছে অনেকের। দ্য ডিসেন্ট নির্দিষ্ট কিছু কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত সাড়ে ৯ মাসে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের আঘাতে অন্তত ৩৭ জন শিশুর মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে।
তবে এটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। এখানে শুধুমাত্র অটোরিকশার ধাক্কায় বা চাপায় শিশু নিহতের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। অটোরিকশার সাথে অন্য যানবাহনের সংঘর্ষে শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো হিসেব করা হয়নি। এ ছাড়াও শহরাঞ্চলের বাহিরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক মৃত্যুর তথ্যই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না।
শহরাঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে গত ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। এতে মহাসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়েতে এসব যান নিষিদ্ধ করাসহ সিটি করপোরেশন এলাকায় নিবন্ধনের শর্ত ও গতিসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু দ্য ডিসেন্টের সংগ্রহ করা গত ৯ মাসের তথ্য বলছে, ব্যাটারিচালিত যানের দ্বারা নিহত শিশুদের ৯৭ শতাংশেরই মৃত্যু হচ্ছে গ্রামীণ, আঞ্চলিক ও মফস্বল সড়কে।
পুলিশ বলছে, নতুন এই বিধিমালা কার্যকর হলে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং পর্যায়ক্রমে তা সারা দেশে চালু হতে পারে। তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এটিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ আইডিয়া’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, অটোরিকশার সংখ্যা ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিষয়টি না থাকায় এতে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি উল্টো আরও বাড়বে।
২৪ জেলায় ৩৭ মৃত্যু
‘দ্য ডিসেন্ট’-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে ৯ মাসে দেশের ২৪টি জেলায় ব্যাটারিচালিত যানের ধাক্কায় বা চাপায় ৩৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার তথ্য মিলেছে নেত্রকোনা ও কক্সবাজারে মোট ৪টি করে।
এর মধ্যে নেত্রকোনার পূর্বধলায় ২টি এবং কলমাকান্দা ও মোহনগঞ্জে ১টি করে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও রামু উপজেলায় ১টি করে মোট ৪টি দুর্ঘটনায় ৪ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এ ছাড়া চাঁদপুরে ৩টি (মতলব উত্তর, শাহরাস্তি ও হাইমচর), চট্টগ্রামে ৩টি (বাঁশখালী, রাঙ্গুনিয়া ও সন্দ্বীপ) এবং ঢাকা, পাবনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২টি করে দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ১৭টি জেলায় ১টি করে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গিয়েছে।
দ্য ডিসেন্টের পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহত ৩৭ শিশুর মধ্যে ২৩ জন অটোরিকশা, ৯ জন ইজিবাইক, ৪ জন টমটম এবং ১ জন ব্যাটারিচালিত মিশুকের দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
দুর্ঘটনার স্থানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত এসব হালকা যানবাহন মূলত গ্রামীণ ও অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোকে শিশুদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছে। নিহত ৩৭ শিশুর মধ্যে মাত্র ১ জন মারা গেছে জাতীয় বা আন্তঃজেলা মহাসড়কে। বিপরীতে বাকি ৯৭.৩ শতাংশ শিশুর মৃত্যুই ঘটেছে গ্রামীণ, আঞ্চলিক ও শহরের অভ্যন্তরীণ সড়কে।
সুনির্দিষ্টভাবে দেখলে, সর্বোচ্চ ১৪ জন শিশু মারা গেছে গ্রামের ভেতরের ও ইউনিয়নের পাকা বা কাঁচা সড়কে এবং আরও ৪ জন মারা গেছে গ্রামীণ বাজারের ভেতরের সড়কে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক ৪৮.৬ শতাংশ বা ১৮ জন শিশুর মৃত্যুই পাওয়া গেছে সরাসরি গ্রামীণ সড়কে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ জন মারা গেছে আঞ্চলিক ও উপজেলা সংযোগ সড়কে এবং ৬ জন মারা গেছে শহুরে বা পৌর এলাকার সড়ক ও গলিতে।
পথচারী শিশুরা কীভাবে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে?
ঘটনাগুলোর বিবরণে দেখা যায়, অনেক শিশু রাস্তা পার হওয়ার সময় কিংবা বাড়ির সামনে ও রাস্তার পাশে থাকা অবস্থায় ব্যাটারিচালিত যানের ধাক্কা বা চাপায় মারা গেছে।
নিহত ৩৭ শিশুর মধ্যে ২৮ জন, অর্থাৎ ৭৫.৭ শতাংশ ছিল পথচারী। আরও সাতজন অটোরিকশা বা ইজিবাইকের যাত্রী ছিল। একজন বসে ছিল রাস্তার পাশের দোকানে।
আঘাতের ধরন অনুযায়ী, ২২ শিশু বা ৫৯.৫ শতাংশ দ্রুতগতির অটোরিকশা কিংবা ইজিবাইকের সরাসরি ধাক্কায় ছিটকে পড়ে মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত পেয়ে মারা গেছে।
আট শিশু সরাসরি চাকার নিচে চাপা পড়ে বা পিষ্ট হয়ে মারা গেছে। অটোরিকশা বা ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে তার নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে চারজন। আর একজন ইজিবাইক থেকে ছিটকে পড়ে বিপরীতমুখী ট্রাকের নিচে পিষ্ট হয়েছে।
বাড়ির সামনে ও খেলার সময়
বাড়ির সামনের সড়কে কিংবা খেলার সময় রাস্তা পার হতে গিয়ে ১৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের সিলেটি বাজারের সাত নম্বর গলিতে খেলার সময় অটোরিকশার ধাক্কায় মারা যায় শিশু জান্নাতি।
মেহেরপুরের মুজিবনগরে খেলার একপর্যায়ে দৌড়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে মারা যায় সাত বছরের জান্নাতুল খাতুন। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় বাড়ির ভেতর থেকে দৌড়ে সড়কে ওঠার পর অটোরিকশার চাকায় পিষ্ট হয় চার বছরের ওমর ফারুক।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে সাড়ে তিন বছরের রুহান মৃধা বিকেলে বিস্কুট খাওয়ার বায়না ধরেছিল। সন্ধ্যায় দাদি আনোয়ারা বেগমের হাত ধরে মুদিদোকানে যাচ্ছিল সে। স্থানীয় মসজিদের সামনে দাদির হাত ছেড়ে দৌড় দিতেই দ্রুতগতির একটি ইজিবাইক তাকে চাপা দেয়।
বাগেরহাটের মোংলায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী সানজিদা আক্তার শিমু (১১) স্কুলে যাওয়ার আগে মায়ের কথায় পাশের দোকানে ডিম কিনতে যাচ্ছিল। রাস্তা পার হওয়ার সময় ইজিবাইকের চাপায় তার মৃত্যু হয়।
স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে
নানাবাড়ি কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে মারা গেছে ছয় শিশু।
বরগুনার আমতলীতে পূজার ছুটিতে ঢাকা থেকে নানার বাড়ি বেড়াতে এসেছিল আট বছরের এলমা আক্তার। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চকলেট খাওয়ার সময় পেছন থেকে অটোরিকশার ধাক্কায় সে মারা যায়।
পাবনার সুজানগরে নানার বাড়ির উঠান থেকে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় চলে যাওয়া দুই বছরের তাইফা আক্তারও নিহত শিশুদের একজন।
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে মায়ের সঙ্গে নানার বাড়ি যাওয়ার পথে মারা যায় হাফেজ মো. রিফাতের শিশুসন্তান। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে বেড়াতে এসে মারা যায় সাত বছরের রাফি।
কক্সবাজারের মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির জেটিঘাটে বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল চার বছরের আফরিন সুলতানা। সেখানেই দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় বাবার বন্ধুর বাসায় বেড়ানো শেষে ফেরার পথে মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে মারা যায় তিন বছরের মুহাম্মদ রাহাত।
স্কুল-মাদ্রাসায় যাতায়াতের পথে
স্কুল কিংবা মাদ্রাসায় যাওয়া-আসার পথে পাঁচ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে স্কুল থেকে যমজ বোন মনির সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে নিহত হয় প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুক্তা খাতুন (৬)।
কক্সবাজারের চকরিয়ায় সকালে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে মারা যায় ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নওশাদ শরীফ নূর (১২)।
নেত্রকোনার পূর্বধলায় মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে মারা যায় শিশু শ্রেণির মারিয়া আক্তার প্রীতি (৬)। গাইবান্ধা সদরে মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে মারা যায় প্লে-শ্রেণির সোয়াদ মিয়া (৬)।
চাঁদপুরের হাইমচরে প্লে-গ্রুপের ছাত্রী হুমায়রা আক্তারকে (৬) মা স্কুলে দিয়ে আসার পর ফেরার পথে শিশুটির মৃত্যু হয়। এই পাঁচ শিশু অটোরিকশা ও ইজিবাইকের ধাক্কায় নিহত হয়েছে।
দোকানে বসেও দুর্ঘটনার শিকার
১৯ জুলাই চাঁদপুরের শাহরাস্তির চিতোষী বাজারে বাবার দোকানে চেয়ারে বসে ছিল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী হাফসা আক্তার (১০)।
এক অটোরিকশাচালক গাড়ির সুইচ চালু রেখেই নিচে নামেন। তখন গাড়িতে থাকা এক যাত্রীর শিশুসন্তান খেলার ছলে অ্যাক্সিলারেটরে হাত দেয়। অটোরিকশাটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দোকানের ভেতর ঢুকে হাফসাকে চাপা দেয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
২৯ অক্টোবর নেত্রকোনার কলমাকান্দায় দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রতিযোগিতামূলক চলাচল ও মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় মারা যায় সাত বছরের সাউদা মনি।
সংঘর্ষের পর একটি অটোরিকশা উল্টে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া শিশুটির ওপর পড়ে।
চিকিৎসা পেতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে
অন্তত আটটি ঘটনায় দেখা গেছে, মাথায় গুরুতর আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের শিকার শিশুদের স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে জরুরি নিউরো-ট্রমা বা আইসিইউ সুবিধা ছিল না।
চিকিৎসকেরা তাদের রংপুর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অ্যাম্বুলেন্সে তাদের মৃত্যু হয়।
নিহত ৩৭ শিশুর মধ্যে অন্তত ছয়জনের বাবা প্রবাসী বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
ভুরুঙ্গামারীর মুক্তার বাবা মালয়েশিয়া প্রবাসী। মতলব উত্তরের আয়াতের বাবা ইউরোপপ্রবাসী, রাজাপুরের আদিবের বাবা বাহরাইনপ্রবাসী এবং রামুর মাহির বাবা মালয়েশিয়াপ্রবাসী।
চকরিয়ার নওশাদের বাবা এবং রাঙ্গুনিয়ায় নিহত শিশু রাহাতের বাবাও দেশের বাইরে থাকেন।
সংগৃহীত বিবরণ অনুযায়ী, প্রবাসী এই বাবাদের অনেকেই সন্তানের মৃত্যুর পর শেষবারের মতো তার মুখ দেখতে পারেননি।
৩৭টি শিশুমৃত্যুর ঘটনায় মাত্র তিনটি ঘটনায় তাৎক্ষণিক আটকের খবর পাওয়া গেছে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে চালক গাড়ি ফেলে বা গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
অন্তত ১৫টি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) বক্তব্য প্রায় একই “পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকায় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে; অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নতুন বিধিমালায় কী আছে?
২৯ অক্টোবর জারি করা ১২ পৃষ্ঠার বিধিমালায় ই-রিকশার চলাচল, গতি, চালকের বয়স ও নিবন্ধনের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও প্রধান বাস চলাচলের সড়কে ই-রিকশা চলতে পারবে না।
সাধারণ সড়কে সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় কিংবা জনবহুল স্থানে সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার।
চালকের বয়স হতে হবে অন্তত ১৮ বছর। জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধন নিতে হবে। প্রতিটি রিকশায় কিউআর কোডযুক্ত নম্বরপ্লেট ও স্পিডোমিটার থাকতে হবে। মানতে হবে বুয়েট নির্ধারিত নিরাপত্তা মানদণ্ড।
কিন্তু বিধিমালাটি করা হয়েছে শুধু সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য।
নতুন বিধিমালাটি কেবল সিটি করপোরেশন এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকা এবং গ্রামীণ সড়কে শিশুদের এই লাগামহীন মৃত্যু কীভাবে রোধ করা হবে জানতে চাইলে ট্রাফিক অ্যাডমিনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জাকির হোসেন সুমন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “সরকার গত বৃহস্পতিবার ইতিমধ্যে একটি বিধিমালা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ও বিধিমালা অনুযায়ী পুলিশ সেটি বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে। আশা করি বিধিমালাটি কার্যকর হলে অটোরিকশার এই বেপরোয়া অবস্থা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
তবে দেশের সিংহভাগ দুর্ঘটনা যে গ্রামীণ ও স্থানীয় সড়কে ঘটছে, তা এই বিধিমালার মাধ্যমে কীভাবে রোধ করা সম্ভব এবং এটি বাস্তবায়নে পুলিশ কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনার কথা জানাতে পারেননি এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “বিধিমালা তো মাত্র হলো। এটি কার্যকর হলে তবেই বলা যাবে যে এর মধ্যে কোনো গ্যাপ (ঘাটতি) আছে কি না। আর সিটি করপোরেশনের মতো পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদও তো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এমনও হতে পারে যে আস্তে আস্তে সারা দেশে এটি চালু হয়ে যাবে।”
অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক এবং গাড়ির কাঠামোগত ত্রুটির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি দাবি করেন, “এবারের বিধিমালায় চালকের ন্যূনতম বয়স থেকে শুরু করে এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে যুক্ত করা হয়েছে।”
তবে পুলিশের এই আশাবাদের সাথে একমত নন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
দ্য ডিসেন্ট এর বিশ্লেষণে উঠে আসা সাড়ে ৯ মাসে ৩৭ শিশুর মৃত্যুর তথ্যকে দেশের সড়কের ‘নিয়মিত ঘটনা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের নতুন বিধিমালাটি একটি ‘ত্রুটিপূর্ণ আইডিয়া’ এবং এর মাধ্যমে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বাড়বে।
বিধিমালার অসংগতিগুলো তুলে ধরে মোজাম্মেল হক চৌধুরী দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমরা বিধিমালাটি নিয়ে কাজ করছি এবং এখানে বেশ কিছু বড় অসংগতি লক্ষ্য করেছি। তার মধ্যে অন্যতম হলো দেশে কী পরিমাণ অটোরিকশা থাকবে, তার কোনো সীমা-পরিসীমা এখানে নির্ধারণ করা হয়নি। আবার বলা হচ্ছে চালকদের বয়স হতে হবে ১৮ বছর। কিন্তু চালক যদি ড্রাইভিং লাইসেন্সই না নেয়, তাহলে তাদের বয়সটা মাপবেন কীভাবে?”
গ্রামীণ ও স্থানীয় সড়কে যেখানে প্রায় ৯৭ শতাংশ শিশুমৃত্যুর ঘটনা পাওয়া যাচ্ছে এবং কোনো মামলাও হচ্ছে না, সেসব জায়গায় সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে না এ বিষয়ে তিনি বলেন, “বৈধতা যদি সত্যিকারের বৈধতার মতো নিয়ম মেনে হয়, তবে দিতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এখন যে ধরনের বিধিমালা হয়েছে, তাতে বৈধ আর অবৈধ অটোরিকশার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য থাকবে বলে আমাদের মনে হয় না। এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে এবং মানুষের জীবন চরমভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এতদিন কেবল অবৈধ অটোরিকশা নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল, এখন বৈধ ও অবৈধ উভয় অটোরিকশা নিয়েই সমস্যা বাড়বে।