যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন ডিবিসি নিউজের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরী

৬ নভেম্বর, ২০২৬

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের মহাখালীর কার্যালয় থেকে ৪ নভেম্বর বিকেলে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও ক্রাইম বিভাগের প্রধান রাজীব ঘোষকে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে মধ্যরাতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার একটি হত্যা মামলায় ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় রাজীব ঘোষকে।

ডিবিসি নিউজ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য না দিলেও প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত একটি খবরে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে চ্যানেলটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করা হয়। যদিও পরে খবরটি সরিয়ে নেওয়া হয়।

ওই খবরে বলা হয়েছিল, “পোশাক খাত নিয়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যে তারা কিছুদিন ধরে আওয়ামী পন্থী সাংবাদিকদের নিয়ে মিডিয়া দখল করতে একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন, যার অংশ হিসেবে ডিবিসি টেলিভিশন দখলের চেষ্টা হয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।”

ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও রাজীব ঘোষকে ডিবিসির কার্যালয় থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে দ্য ডিসেন্ট সংবাদমাধ্যমটিতে কাজ করা সাতজন সাংবাদিক ও কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছে। তবে তারা কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

 

কী ঘটেছিলো ডিবিসি কার্যালয়ে?  

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবিসি নিউজের এক সংবাদকর্মী দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা  ইকবাল সোবহান চৌধুরী বুধবার অফিসে এসে চলমান শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে সরকারবিরোধী অবস্থান করতে নিউজ করতে চাপ দেন। এছাড়াও তিনি নিজেকে চেয়ারম্যান বলে দাবি করেন। এক পর্যায়ে এ নিয়ে অফিসে এক ধরণের চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ এসে হস্তক্ষেপ করে।”

তিনি আরো বলেন, “ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে নিয়ে যাওয়ার সময় অফিসের নিচে তার পক্ষ নিয়ে অন্য সংবাদকর্মীদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করেন রাজীব ঘোষ। পরে তাকেও পুলিশ নিয়ে যায়।”

তিনি আরো বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বিট কাভার করতেন রাজীব ঘোষ। ওই সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। গণঅভ্যুত্থানের পরও তিনি নিউজরুমে সংবাদ ও সাংবাদিক নিয়োগ আটকে দেওয়া এবং সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেছেন।”

আরেক সংবাদকর্মী দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “ইকবাল সোবহান চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন। অভ্যুত্থানের পরে এক পর্যায়ে তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে এরপরেও সম্ভবত তিনি শেয়ার হোল্ডার হিসেবে ছিলেন, অফিসে আসতেন মাঝে মধ্যে। বুধবার দুপুরের দিকে অফিসে এসে নিজেকে ডিবিসি নিউজের চেয়ারম্যান দাবি করেন তিনি। সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন। ফলে অফিসে এক ধরণের পরিস্থিতি তৈরি হয়।   একপর্যায়ে বেলা তিনটার দিকে তিনি কার্যালয় থেকে বের হলে ডিবি পুলিশের সদস্যরা তাকে আটক করে নিয়ে যান।”

তবে বিকেলে ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও রাজীব ঘোষকে ডেকে গাড়িতে ওঠানোর সময় উপস্থিত ছিলেন, এমন একজন সংবাদকর্মী জানান, কার্যালয়ের ভেতরে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তার চোখে পড়েনি।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “অফিসে সরাসরি কোনো তর্ক হয়নি। ইকবাল সোবহান চৌধুরী বসেন লিফটের ৫-এর অফিসে। আমাদের নিউজরুম লিফটের ৭-এ। মূলত ইন্টারকমের মাধ্যমেই কথা কাটাকাটি হয়েছে। এটার কোনো ফুটেজ আছে কি না, আমার জানা নেই।”

ঘটনার কারণ নিয়ে ভিন্ন ভাষ্য দিয়েছেন চ্যানেলটির একজন পদস্থ কর্মকর্তা। তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “মালিকপক্ষের সাথে সংঘাতের জন্য নয়। মূলত আমি যতটুকু শুনেছি চলমান শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে উনি একটি অবস্থান নিতে চাপ দেন এরপর অফিসে কিছু নব্য বিএনপির উৎসাহে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারাই বিভিন্ন দোষারোপ করেছে। নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। এখানে মালিকপক্ষের ইন্ধন নেই।”

অন্যদিকে লিখিত বার্তায় ডিবিসি নিউজের একজন সংবাদকর্মী দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “সম্প্রতি চেয়ারম্যান পদ হারালেও চ্যানেলটির লাইসেন্স ইকবাল সোবহান চৌধুরীর নামে। বেশির ভাগ শেয়ারের মালিক হিসেবে বিনিয়োগকারী শহিদুল আহসান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।”

ওই সংবাদকর্মী লিখেছেন, “ইকবাল সোবহান সাহেব বুধবার দুপুরে হঠাৎ ডিবিসি নিউজে যান এবং নিউজরুমে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এর সূত্র ধরেই তিনি প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মী ও বহিরাগত কিছু রাজনৈতিক কর্মীর (তিতুমীর কলেজ ছাত্রদল ও স্থানীয় কিছু বিএনপি কর্মী) দ্বারা অবরুদ্ধ হন। একথা বলাই যায়, মালিকপক্ষের ইশারা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। একপর্যায়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশকে খবর দেওয়া হয় এবং পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যায়।”

রাজীব ঘোষের বিষয়ে ওই সংবাদকর্মী লিখেছেন, “আরেকজন সাংবাদিক আটক হয়েছেন, যার নাম রাজীব ঘোষ। তিনিও সাংবাদিকতার কারণে আটক হননি। তিনি ডিবিসির সাবেক পলাতক সিইও মঞ্জুরুল ইসলামের হয়ে কাজ করেন। মি. মঞ্জুরুল যেহেতু ডিবিসির একজন পরিচালক, বুধবারের ঘটনায় তার হয়ে রাজীব ঘোষ মি. সোবহানের সাথে মিটিং করেছেন বলে জানা গেছে। তাদের মিটিংয়ের পরপরই মি. সোবহান নিউজরুমে হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালান।”

ডিবিসি নিউজের এডমিন সেকশনের একজন কর্মকর্তা দ্য ডিসেন্টকে জানান, “৫ মাস আগে ইকবাল সোবহানকে বাদ দিয়ে মোঃ শহিদুল আহসান ডিবিসি নিউজের চেয়ারম্যান ও এমডি হন। কিন্তু বুধবার ইকবাল সোবহান চৌধুরী অফিসে এসে নিজেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দাবি করে নিউজরুমে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে থাকে। পরবর্তিতে তার কথা না শোনায় তিনি অফিসে রিএক্ট করেন। এক পর্যায়ে অফিস থেকেই বিএনপির মিডিয়া উইং এর কাছে তথ্য যায়। এরপর ডিবি আসে এবং ইকবাল সোবহান চৌধুরী এবং তার দীর্ঘদিনের সহচর্য রাজীব ঘোষকে নিয়ে যায়” 

ডিবিসি নিউজের আরেকজন সাংবাদিক দ্য ডিসেন্টকে জানান, “বুধবার আমার ডে–অফ ছিলো। আমি যতটুকু শুনেছি সেটা হলো বুধবার ইকবাল সোবহান অফিসে এসে নিজেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দাবি করেন। ফলে ম্যানেজমেন্ট টের পায়। পাঁচ মাস আগে তাকে চেয়ারম্যান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে কিন্তু এরপরেও তিনি কিছুদিন না এসে আবার আসা শুরু করলেন। কেউ কিছু বলতোনা, কিন্তু বুধবার নিজেকে চেয়ারম্যান দাবি করায় ঝামেলা তৈরি হয়।” 

ইকবাল সোবহান বুধবার অফিসে সরকারবিরোধী নিউজ করতে চাপ দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, “আমি এমনটা শুনেছি তবে আমি দেখিনি।” 

তাদের নিয়ে যাওয়ার সময়কার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। সেখানে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ঢাকা মহানগর পুলিশের স্টিকারযুক্ত একটি গাড়িতে তুলতে দেখা যায়।

পুলিশ ও ডিবিসি কর্তৃপক্ষ কী বলছে

দুজনকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার পর ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র আখতার হোসেন দ্য ডিসেন্টকে  বলেন, “একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেটা এড়াতে তাদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।”

কী নিয়ে এবং কোথায় ওই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কিংবা চ্যানেলটির কার্যালয়ের ভেতরেই কিছু ঘটেছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি যতটুকু জেনেছি ততটুকুই আপনাদের বলেছি। এর বাইরে আর কিছু জানা নেই।”

এ বিষয়ে ডিবিসি নিউজের সম্পাদক মাশুক এলাহী চৌধুরীর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তিনি এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত কোনো উত্তর দেননি।   ডিবিসি নিউজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শহিদুল আহসান ও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। 

ঘটনার পর বিকেলে ডিবিসির কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর মুক্তাদীর অনিক। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, “ইকবাল সোবহান চৌধুরী সাহেবকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা সেটা আসলে আমরা অনেক পরে এসে জানতে পারি। আমরা যতটুকু জেনেছি, উনি অফিস থেকে যখন বের হচ্ছিলেন, তখন ডিবি এসেছে। ডিবি এসে ওনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, “কেন নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেটা এখনো পর্যন্ত আমরা ক্লিয়ার না। বাট আমরা কিছু জিনিস বেইজ করে হয়তো বলতে পারি, হয়তো জুলাই রেভুলেশনের সময়ের যে মামলা ছিল, সেই বিষয়ে কি না। আমরাও ডিবিসির পক্ষ থেকে আসলে জানার চেষ্টা করছি যে কেন ওনাকে আটক করা হলো।”

পরে বুধবার দিবাগত রাত পৌনে একটার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, জুলাইয়ের একটি হত্যা মামলায় ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানায় করা একটি হত্যা মামলায় ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আর জিজ্ঞাসাবাদে কিছু না পাওয়ায় রাজীব ঘোষকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বর্তমানে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক। এর আগে তিনি অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ অবজারভারের সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার পর তিনি দ্য ডেইলি অবজারভার প্রকাশ করেন।

দীর্ঘদিন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাংবাদিক ফোরামের নেতা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে তাকে নানা কর্মকাণ্ডে দেখা গেছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাকে খুব একটা প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে ফেনীর একটি আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন ইকবাল সোবহান চৌধুরী। পরে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে তাকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা করা হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার নেতৃত্বে ডিবিসি টেলিভিশন চালু হয়। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। সরকার পতনের পর চ্যানেলটির ওপর থেকে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারান বলে জানা গেছে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলাটি তদন্তে গঠিত টাস্কফোর্স।

 

খবর প্রকাশ করেও সরিয়ে নিল ডিবিসি

বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিবিসি নিউজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় প্রচারিত খবরে দাবি করা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতে চলমান অস্থিরতার মধ্যে গণমাধ্যমেও অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ।

ডিবিসির ওই খবরে বলা হয়, “বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে পতিত শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। দুপুরে মহাখালীতে ডিবিসি নিউজের কার্যালয়ের সামনে থেকে তাকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয় তাকে। ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মো. আখতার হোসেন বলেন, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ডিবিতে নেওয়া হয়েছে।”

ঘটনার বিস্তারিত কারণ সম্পর্কে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি উল্লেখ করে ওই খবরে আরও বলা হয়, “ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মূলত ডিবিসি নিউজের চেয়ারম্যান পদ দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে। পুলিশ বলছে, এই পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য ছিল।”

“গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে গোয়েন্দা পুলিশ পদক্ষেপ নেয় বলে দাবি করা হয়। ইকবাল সোবহান চৌধুরী দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সেসময়ের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি,” বলা হয় খবরে।

একই খবরে দাবি করা হয়, “তবে সম্প্রতি তার কার্যক্রমে গোয়েন্দাদের কাছে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টার তথ্য আছে। পোশাক খাত নিয়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যে তারা কিছুদিন ধরে আওয়ামী পন্থী সাংবাদিকদের নিয়ে মিডিয়া দখল করতে একাধিক গোপন বৈঠক করেছেন, যার অংশ হিসেবে ডিবিসি টেলিভিশন দখলের চেষ্টা হয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।”

তবে এই প্রতিবেদন লেখার সময় দেখা যায়, ডিবিসি নিউজের ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে খবরটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

খবরটি কেন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবিসি নিউজের একজন কর্মকর্তা দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “নিউজ ডিলেট করা হয়েছে মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তে। এ বিষয়ে আমি আর কিছু জানি না।”

রাজীব ঘোষের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

রাজীব ঘোষকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন ডিবিসি নিউজের সাবেক সংবাদকর্মী তাহিয়া রুবাইয়াত অপলা।

তিনি লিখেছেন, “যেই সাংবাদিককে নিয়ে আজ আপনাদের এত আবেগ, এত প্রতিবাদ, সেই রাজীব ঘোষ মোটেও পেশাদার সাংবাদিক না।”

অপলার ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বিটে কাজ করার সুবাদে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে রাজীব ঘোষের ভালো যোগাযোগ ছিল। অপরাধবিষয়ক সংবাদ করার সূত্রে ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। অভিযোগ ওই যোগাযোগ নিয়ে নয়, বরং তার অপব্যবহার নিয়ে বলে উল্লেখ করেন অপলা।

তিনি লিখেছেন, “এমনকি আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্ট নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের একজন আমাকে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে আমার সাংবাদিকতা বন্ধ করে দেওয়া হবে।”

একই পোস্টে করোনাকালে যাত্রাবাড়ীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের কাছ থেকে পুলিশের চাঁদা নেওয়া নিয়ে একটি সংবাদ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন অপলা।

তিনি লিখেছেন, “একবার যাত্রাবাড়ীতে সিএনজি চালকদের কাছ থেকে পুলিশের চাঁদাবাজির একটি ভিডিও অনেক কষ্টে নিউজ করেছিলাম। তখন ঘোর করোনা। কত ঝুঁকি নিয়ে কাজটা করি। নিউজ যাওয়ার পরপরই সম্ভবত সেই পেশাদার সাংবাদিকের ভাই ব্রাদাররা ফোন করেন। তিনি অ্যাসাইনমেন্ট ইনচার্জ হওয়ার সুযোগে নিউজ বন্ধ করেন, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরান এবং আমাকে বেশ ভালোভাবে বুঝায় দেন এই ধরনের নিউজ আর করা যাবে না।”

শুধু তার নয়, অন্য সহকর্মীদের সংবাদও রাজীব ঘোষ আটকে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন অপলা।

তিনি লিখেছেন, “আমিসহ অনেক সহকর্মীর অসংখ্য সরকারবিরোধী নিউজ তিনি বন্ধ করেছেন। নিউজ তো অনেক বড় বিষয়। সামান্য ফেসবুক পোস্ট নিয়েও তিনি আমাকে হেনস্তা করতেন। এই পরিস্থিতি শুধু আমার না, যারা নিরপেক্ষ কাজ করেছে তাদের কমবেশি সবার।”

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজীব ঘোষের ঘনিষ্ঠতার পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন ছিল কি না, তা তার জানা নেই বলে উল্লেখ করেন অপলা।

তবে অ্যাসাইনমেন্ট ইনচার্জ হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে তিনি লিখেছেন, “তার অ্যাসাইনমেন্ট ইনচার্জ হওয়ার সুযোগে কম অপব্যবহার করেননি ক্ষমতার।”