পুলিশেরা দল বেঁধে মাথা ফাটালেন পথচারীর, পেটালেন স্কুলছাত্রকে, আছাড় দিলেন শিশুকে
ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রোববার রাজধানী ঢাকার মিরপুর ও সাভার এবং পাশের জেলা গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
এ সময় আন্দোলন মোকাবিলায় পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে।
রোববার মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের পাশে রূপালী ব্যাংকের পল্লবী শাখার সামনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে আট থেকে নয়জন পুলিশ সদস্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় এক শিশুকে দৌড়ে সরে যেতে দেখা যায়।
দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের একজন শিশুটির গালে থাপ্পড় দেন। এরপর আরেক পুলিশ সদস্য তার কোমর ধরে শূন্যে তুলে পিচঢালা রাস্তায় আছাড় মেরে ফেলে দেন।
এ সময় শিশুটিকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কিছু করিনি।’

মিরপুরের পল্লবীর সেকশন ১২-এর কালশী রোডে ধারণ করা আরেকটি ভিডিওতে স্কুলের পোশাক পরা এক শিক্ষার্থীকে কলার ধরে ধাক্কা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায় এক পুলিশ সদস্যকে। তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় সামনে ও পেছন থেকে সাতজন পুলিশ সদস্য একে একে এগিয়ে এসে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন।
এ সময় পুলিশ সদস্যদের বলতে শোনা যায়, ‘স্টুডেন্ট? স্টুডেন্ট? কীসের স্টুডেন্ট?’

পল্লবীতে এপেক্সের শোরুমের সামনে ধারণ করা আরেকটি ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বলে দেখা যায়। এ সময় একজন তাকে পেছন থেকে লাথি দেন। সামনে থাকা আরেক পুলিশ সদস্য তার পায়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। এরপর পাশ থেকে আরেকজন লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন।
আহত ব্যক্তি মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে পড়ে যান। পুলিশ সদস্যদের সেখান থেকে হেঁটে চলে যেতে দেখা যায়।
পরে সাংবাদিকদের ওই ব্যক্তি বলেন, ‘ভাই, আমি ছাত্র। আমি মিরপুর ক্যাডেট কোচিংয়ে চাকরি করি। আমি এখান দিয়ে যাচ্ছি, আর এর মধ্যে আমাকে এভাবে আক্রমণ। আমার দোষটা কী?’

এ সময় তার মাথা থেকে রক্ত ঝরতে দেখা যায়।
পুলিশ কখন বল প্রয়োগ করতে পারে?
বাংলাদেশের আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুলিশকে বল প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে সেই ক্ষমতার সীমাও নির্ধারণ করা আছে।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৪৬(২) ধারা অনুযায়ী, আইনসম্মত গ্রেপ্তারের সময় কেউ বলপূর্বক বাধা দিলে কিংবা গ্রেপ্তার এড়ানোর চেষ্টা করলে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য প্রয়োজনীয় উপায় ব্যবহার করা যায়।
এর অর্থ, গ্রেপ্তার কার্যকর করতে প্রয়োজন অনুযায়ী কাউকে শারীরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু এই ক্ষমতা কাউকে শাস্তি হিসেবে মারধর করার অনুমতি দেয় না।
অন্যদিকে কার্যবিধির ৫০ ধারা অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তির পালানো ঠেকাতে যতটুকু নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, তার বেশি আরোপ করা যাবে না।
আত্মরক্ষার জন্য বল প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। তবে সেই অধিকারও সীমাহীন নয়।
দণ্ডবিধির ৯৯ ধারা অনুযায়ী, প্রতিরক্ষার জন্য যতটুকু ক্ষতি করা প্রয়োজন, তার বেশি করা যাবে না।
একই আইনের ১০২ ধারা অনুযায়ী, শরীরের প্রতি বিপদের যুক্তিসংগত আশঙ্কা যতক্ষণ থাকে, আত্মরক্ষার অধিকারও ততক্ষণ থাকে।
‘সম্পূর্ণভাবে আইনের ব্যত্যয়’
এই তিনটি ভিডিও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনকে দেখিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “সাম্প্রতিক কালে যেটা দেখছি, অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় দেখলাম, শিশুদের, কিশোর-কিশোরীদের যেভাবে আছাড় দেওয়া, মারধর করা, এগুলো সম্পূর্ণভাবে আইনের ব্যত্যয়। এ ধরনের ঘটনা মানবাধিকারকে সংকুচিত করে ফেলবে। এগুলোকে কোনোভাবেই সমর্থন করার সুযোগ নেই। বরং এসব ঘটনার সঙ্গে যারা যুক্ত, সরকারের দায়িত্ব তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।”
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) কামারুম মুনিরা দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘আমাদের তো আত্মরক্ষার বিধান আছে। সে ক্ষেত্রে নিজেদের জানমাল, সম্পদের নিরাপত্তার জন্য আমরা ফোর্স প্রয়োগ করতে পারি। সেটা কোন এক্সটেন্টে হবে, সেটা তো আইনেই বলা আছে। আমরা সেটাই প্রয়োগ করে থাকি। এখন অনেক মানুষের ভিড়ে অনেক সময় হয়ে যায়, তবে আমরা চেষ্টা করি যতটুকু এটা মিনিমাইজ করা যায়। আমাদের যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই বল প্রয়োগ করি।’