বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়ার ছড়ানো ভুয়া খবর টকশোতে ফেরি করলেন গোলাম মাওলা রনি
২০ জুন চ্যানেল আইয়ের “কাঁচা রাস্তার রাজনীতি” শীর্ষক টকশোতে সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি দাবি করেছেন, শেখ হাসিনার ১৭ বছরের মেয়াদের চেয়ে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র এক বছরে সুইস ব্যাংকে ৪১ শতাংশ বেশি টাকা পাচার হয়েছে এবং এই অঙ্ক অন্তত ২৫ লাখ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, “সুইস ব্যাংকে ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার যে রেকর্ড তৈরি করেছিল, ড. ইউনূসের জামানায় মাত্র এক বছরে তার চেয়েও ৪১% বেশি হয়ে গেছে... ১৭ বছরে শেখ হাসিনা যদি ১৬ লাখ কোটি টাকা পাচার করে থাকেন, তার থেকে ৪১% বেশি তাহলে অন্তত ২৫ লাখ কোটি টাকা হবে।”
দেখুন এখানে। পুরো টকশোটি দেখুন এখানে।
তবে গোলাম মাওলা রনি তাঁর বক্তব্যে সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার ৪১ শতাংশ বৃদ্ধির যে দাবি করেছেন, তা মূলত গত ২০ জুন ২০২৬ তারিখে বসুন্ধরা গ্রুপের চার মিডিয়ায়—কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ও ডেইলি সানে—অদিতি করিম নামের এক লেখকের প্রকাশিত একটি কলাম থেকে নেওয়া।
বসুন্ধরা গ্রুপের চারটি পত্রিকায় একযোগে প্রকাশিত মতামতটিতে উল্লেখ করা হয়, “অর্থ পাচারেও ইউনূস সরকারের রেকর্ড দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারেও ইউনূস ও তাঁর সহযোগীরা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। সম্প্রতি একটি খবর ইউনূস সরকারের দেড় বছরে অর্থ পাচার আর লুটপাটের এক অবিশ্বাস্য চিত্র উন্মোচন করেছে। এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুসারে, ওই দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের মুদ্রা)। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর গত বছরই (২০২৫ সাল) বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে সুইস ব্যাংকগুলোতে। গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমা ছিল ২০২৫ সালে।“
তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, বসুন্ধরা গ্রুপের চারটি পত্রিকায় প্রকাশিত কলাম, এবং সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির মন্তব্য বিভ্রান্তিকর। এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি করলেও দেখা যায় এই অর্থের ৯৮.৬ শতাংশই বাংলাদেশি বিভিন্ন ব্যাংকের। ব্যক্তিপর্যায়ের গ্রাহকদের আমানত বরং ১০ শতাংশ কমেছে।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক' (এসএনবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশিদের মোট আমানতের ৯৮.৬ শতাংশই ছিল দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের তহবিল। এই হার ২০২৪ সালে ছিল ৯৭.৮ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে ছিল ২০ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৩৫ শতাংশ।
এর বিপরীতে, ব্যক্তিশ্রেণির গ্রাহকদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমার পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালে যা ছিল ১ কোটি ২৬ লাখ সুইস ফ্রাঁ, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ সুইস ফ্রাংকে।
দেখুন এখানে।
তবে, এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট করা তথ্য। এই পরিসংখ্যানে বাংলাদেশিদের অবৈধ পথে পাচার হওয়া অর্থের কোনো হিসাব মেলানো সম্ভব নয়।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর এই তহবিলের পরিমাণ মূলত সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রমেরই অংশ, কোনো অবৈধ সম্পদ বা পাচার হওয়া অর্থ নয়।
তিনি বলেন, "ব্যাংকগুলো নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দেশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তহবিল জমা রাখে—এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে তারা কোথায় সবচেয়ে ভালো রিটার্ন বা মুনাফা পাচ্ছে তার ওপর। ব্যাংকগুলো ভালো বিনিয়োগের সুযোগ এবং রিটার্নের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের মধ্যে তহবিল স্থানান্তর করে থাকে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট বছরে সুইজারল্যান্ডে বেশি পরিমাণ অর্থ জমা থাকার মানে এই নয় যে সেখানে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে।"
এছাড়াও, গোলাম মাওলা রনি দাবি করেছেন, “সুইস ব্যাংকে ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার যে রেকর্ড তৈরি করেছিল, ড. ইউনূসের জামানায় মাত্র এক বছরে তার চেয়েও ৪১% বেশি হয়ে গেছে... ১৭ বছরে শেখ হাসিনা যদি ১৬ লাখ কোটি টাকা পাচার করে থাকেন, তার থেকে ৪১% বেশি তাহলে অন্তত ২৫ লাখ কোটি টাকা হবে।"
এই দাবিটিও অসত্য। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিক ও ব্যাংকগুলোর জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাঁ অর্থায় প্রায় ১২,৭৬৩ কোটি টাকা। অথচ গোলাম মাওলা রনি দাবি করেছেন এই অর্থ অন্তত ২৫ লাখ কোটি টাকা হবে। এছাড়াও, তিনি সুইস ব্যাংকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর টাকা জমা রাখাকেও অর্থ পাচার হিসেবে দেখিয়েছেন।
উল্লেখ্য, জাতীয় শ্বেতপত্র কমিটির প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, বিগত ২০০৯-২০২৩ সময়কালে (১৫ বছরে) দেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা বার্ষিক গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।
এ বিষয়ে গোলাম মাওলা রনি দ্য ডিসেন্টকে জানান, “সুইস ব্যাঙ্কে যে টাকা রাখা বৈধ না, সুতরাং আমি এ টাকাকে পাচার হিসেবে উল্লেখ করেছি। আমি টকশোতে ব্যাখ্যা দিয়েছি, সেখানে যা বলা আছে, সেটিই আমার বক্তব্য।“
(প্রতিবেনটি তৈরি করেছেন দ্য ডিসেন্ট এর শিক্ষানবিশ ফ্যাক্ট চেকার রাব্বি মিয়া।)