ভুয়া খবর ছড়ানোয় শীর্ষে কোন সিনিয়র সাংবাদিক ও আলোচকরা?

Azaharul Islam
লেখক
আজহারুল ইসলাম
২৩ জুলাই, ২০২৬

সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া খবর ছড়িয়ে আলোচনায় এসেছেন টিভি টকশোর আলোচনায় অংশ নেয়া সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ও কলামিস্টরা। প্রতি রাতে বিভিন্ন টেলিভিশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত টকশোগুলোতে অংশ নিয়ে কেউ কেউ নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে থাকেন। কেউ আবার নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলে লেখালেখির সময় দেন ভুয়া তথ্য। দেশের বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান এসব ভুয়া তথ্য খণ্ডন করেছে।

দ্য ডিসেন্ট এই প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন টকশোতে অংশ নেয়া বা পত্রিকায় কলাম লেখক হিসেবে পরিচিত সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি তালিকা করেছে যারা ভুয়া খবর ছড়িয়ে আলোচনায় এসেছেন। টকশোর এসব আলোচক বা পত্রিকার কলামিস্টরা অনেক সময় মূলধারার টিভিতে হাজির হয়েছে ভুয়া খবর দিয়েছেন। আবার কখনো কখনো নিজেদের সামাজিক মাধ্যম প্রোফাইলে নিজেদের লেখা বা ভিডিও আলোচনায় এসব ভুয়া খবর প্রচার করেছেন।

বিগত প্রায় দুই বছর সময়ের মধ্যে টকশোর যেসব আলোচকদের বক্তব্যে ভুয়া খবর চিহ্নিত করেছে বিভিন্ন ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা সেগুলোকে দ্য ডিসেন্ট সংকলন করে এই তালিকা করেছে। সংশ্লিষ্ট আলোচকরা এই তালিকার বাইরেও আরও ভুয়া খবর প্রচার করে থাকতে পারেন যা ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলো খণ্ডন করেনি। আবার এই তালিকার আলোচকদের বাইরেও অনেকে থাকতে পারেন যারা টকশোতে আলোচনা করেন বা পত্রিকায় কলাম লেখেন যাদের ছড়ানো ভুয়া খবর এই তালিকায় আসেনি।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর এরকম প্রমাণ পাওয়া গেলে সেগুলো এখানে আপডেট করা হবে।

গত দুই বছরে ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থাগুলোর ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমের তাদের অফিসিয়াল পেইজগুলো সার্চ করে অন্তত ৩১টি ঘটনা পাওয়া গেছে যেখানে টকশোর আলোচকরা বা কলামিস্টরা ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছেন।

তালিকায় দেখা যাচ্ছে, মোট ১২ জন সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিলে এই ৩১টি ভুয়া খবর প্রচার করেছেন।

এর মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি ও সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব আজিজ যৌথভাবে সর্বোচ্চ পাঁচটি করে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর খবর ছড়িয়েছে শীর্ষ স্থান দখল করেছেন।

সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামালের নামে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে ৪টি ভুয়া খবর প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এছাড়া সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর, জামায়াতপন্থী আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির, বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফা ও সাবেক সাংবাদিক ও দৈনিক প্রথম আলোর নিয়মিত কলামিস্ট নাদিম মাহমুদের নামে তিনটি করে ভুয়া খবর প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এক্ষেত্রে আনিস আলম আলমগীর ও ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির আলাদা আলাদা টকশোতে বা লেখা ৩টি ভুয়া খবর দিয়েছেন। আর নাদিম মাহমুদ এবং সাবির মুস্তাফা উভয়ে একই লেখা বা বক্তব্যে ৩টি করে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছিলেন। 

এ ছাড়া সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব কামাল, টেলিভিশন উপস্থাপক ডা. আব্দুন নূর তুষার, সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি, বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট রেজাউল করিম রনি এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর বক্তব্যেও অন্তত একবার করে অসত্য তথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে। 

গোলাম মাওলা রনি

গত ২৯ মার্চ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত গোলাম মাওলা রনির প্রচার করা চারটি অসত্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করেছে দ্য ডিসেন্ট। এ ছাড়া ২০২০ সালে বিবিসির নামে তিনি আরেকটি অসত্য তথ্য প্রচার করেছিলেন।

১. জ্বালানি সংকটের দাবিতে এআই-সম্পাদিত ছবি

গত ২৯ মার্চ দেশে জ্বালানি সংকট দেখাতে একটি এআই-সম্পাদিত ছবি প্রচার করেন গোলাম মাওলা রনি।

ছবিটিতে দেখা যায়, পেট্রলপাম্পে জ্বালানি নিতে আসা মোটরসাইকেলচালকেরা সঙ্গে বিছানা ও বালিশ নিয়ে এসেছেন এবং সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছেন।

২. ইউনুসের এক বছরে ৪১ শতাংশ বেশি টাকা পাচারের দাবি

গত ২০ জুন একটি টকশোতে গোলাম মাওলা রনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার ১৭ বছরের মেয়াদের তুলনায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র এক বছরে সুইস ব্যাংকে ৪১ শতাংশ বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। এই অর্থের পরিমাণ অন্তত ২৫ লাখ কোটি টাকা বলেও দাবি করেন তিনি।

তার বক্তব্যে ব্যবহার করা তথ্যটি মূলত ২০ জুন ২০২৬ বসুন্ধরা গ্রুপের চারটি সংবাদমাধ্যম কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর এবং ডেইলি সানে প্রকাশিত একটি কলাম থেকে নেওয়া। কলামটির বিতর্কিত লেখক ছিলেন অদিতি করিম।

তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, বসুন্ধরা গ্রুপের চারটি পত্রিকায় প্রকাশিত কলাম, এবং সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির মন্তব্য বিভ্রান্তিকর। 

৩. এনসিপির সমাবেশে হামলায় এনসিপি কর্মী আটকের ভুয়া দাবি 

২০২৬ সালের ৭ জুলাই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি প্রচারণামূলক ফেসবুক পেজে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়।

সাভার থানার ওসি হিসেবে ‘আকবর আলী খান’ নামের একজনকে উদ্ধৃত করে ফটোকার্ডটিতে লেখা ছিল, “সাভারে এনসিপির সমাবেশে বোমা হামলার দুইজন আটক, জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে দুইজনই এনসিপির কর্মী।”

গোলাম মাওলা রনিও ফটোকার্ডটি শেয়ার করে লিখেছিলেন, “তারেক রহমান জবাব দাও! সাভারে হামলা কেন?”

অথচ যাচাইয়ে দেখা গেছে, ফটোকার্ডে থাকা তথ্য ভুয়া। 

৪. জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করার দাবি

গত ৭ জুলাই কালের কণ্ঠের এক টকশোতে আরেকটি ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছেন সাবেক এই সাংসদ। কানাডিয়ান সরকারের ইন্টার্নাল রিপোর্টের ‍সূত্র দিয়ে গোলাম মাওলা রনি দাবি করেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে ট্রাক ভরে ভরে কক্সবাজার থেকে এই রোহিঙ্গাদেরকে আনা হয়েছে।

৫। বিবিসির বরাতে ভুয়া প্রতিবেদন প্রচার

২০২০ সালে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে গোলাম মাওলা রনি লিখেছিলেন, “বিবিসির চাঞ্চল্যকর খবর: মক্কা-মদিনা হারাবে সৌদি আরব! মুসলিম দুনিয়ায় তোলপাড়!”

তবে বিবিসি এমন কোনো খবর প্রকাশ করেনি।

মাহবুব আজিজ

৭ মে থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত ৫টি ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব আজিজ। 

১. শাপলা চত্বরে রাতে কেউ নিহত হননি বলে দাবি

২০২৬ সালের ৭ মে একটি টকশোতে শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফার বক্তব্য উল্লেখ করেন মাহবুব আজিজ।

তিনি দাবি করেন, ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে একজনও নিহত হওয়ার প্রমাণ কারও কাছে নেই। এরপরও সেখানে গণহত্যা হয়েছে বলে মিথ্যাচার করা হচ্ছে।

তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওই রাতে মানুষ নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

যেমন, সাঁড়াশি অভিযানে ফাঁকা মতিঝিল শিরোনামে বিডিনিউজ২৪ ডটকমের এক প্রতিবেদন যা ৬ মে সকাল ১১টায় আপডেট হয় সেখানে বলা হয়েছে, “মধ্যরাতে মতিঝিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর সাধারণ জনতা পাঁচজনকে এবং পুলিশ দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা ওই সাতজনকে মৃত ঘোষণা করেন। সর্বশেষ, সোমবার ভোরে রাজারবাগ এলাকায় একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন।’’

২. শেখ মুজিবের হত্যার পরই ইসলামিক দেশগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে দাবি

২০২৬ সালের ২৫ জুন কালের কণ্ঠের একটি টকশোতে মাহবুব আজিজ দাবি করেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

টকশোর ১৯ মিনিট ২ সেকেন্ডে তাকে বলতে শোনা যায়:“১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পরপর আপনার পেয়ারের পাকিস্তান আমাদেরকে স্বীকৃতি দিল। ওই সন্ধ্যাতেই সৌদি আরবসহ ইসলামিক দেশগুলো স্বীকৃতি দিল।”

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে মাহবুব আজীজের দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। যাচাইয়ে ২৩ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ সালের দৈনিক ইত্তেফাক এর “বাংলাদেশ-পাকিস্তান পারস্পারিক স্বীকৃতি” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। 

৩. অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সব সংগীত নিষিদ্ধের দাবি 

২০২৬ সালের ২৫ জুন এটিএন নিউজের ‘নতুনদের রাজনীতি, কতটা নতুন?’ শিরোনামে প্রচারিত টকশোতে সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব আজিজ দাবি করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনে সকল সংগীত নিষিদ্ধ ছিল।

দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, এই দাবি সত্য নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সংগীত নিষিদ্ধের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক আয়োজনে হামলা হলেও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ সারা দেশে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, অন্যান্য দিবসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বাউলদের নিয়ে সাধুসঙ্গ, গান, নাটক ও লালনসংগীত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

৪. ‘একটি গুলি করি, একজন মরে’ পুলিশের করা হত্যাকান্ডকে পুলিশ হত্যা বলে প্রচার

গত ২ জুলাই চ্যানেল আইয়ের একটি টকশোতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি ভিডিও নিয়ে মন্তব্য করেন মাহবুব আজিজ।

তিনি বলেন:“একটি ভিডিও দেখলাম, জুলাইতে খুব প্রশংসিত হয়েছিল। একটি গুলি করি, একজন মরে আর কেউ যায় না। আমি দেখলাম যে পরবর্তী ভিডিওগুলো এখন এসেছে। সেটা পুলিশ যে মারা গিয়েছিল, সেই পুলিশকে দেখিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলা হচ্ছিল। সেটা এখন মানুষের ওপরে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আপনি কতখানি বিশ্বাস করবেন, কাকে বিশ্বাস করবেন…”

রিউমর স্ক্যানারের যাচাইয়ে দেখা গেছে, উল্লেখিত ভিডিওতে মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন আন্দোলনকারীরা পুলিশকে গুলি করার বিষয়ে নয়; বরং আন্দোলনকারীদের পুলিশ গুলি করেও দমাতে পারছে না, এ বিষয়ে জানাচ্ছিলেন।

৫. হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সরকারি চাকরি না পাওয়ার দাবি

২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর সময় টিভির একটি টকশোতে মাহবুব আজিজ দাবি করেন:“গত দেড় বছরে কোনো হিন্দু একটি সরকারি চাকরিও পায়নি।”

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, হিন্দুদের চাকরি পাওয়া নিয়ে করা মাহবুব আজীজের মন্তব্যটি সত্য নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একাধিক নিয়োগ তালিকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নাম পাওয়া গেছে।

মাসুদ কামাল

গত ১৪ মার্চ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত চারটি অসত্য তথ্য ছড়িয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল।

১. অন্তঃসত্ত্বা পুলিশ কনস্টেবল হত্যার দাবি

গত ২০২৬ সালের ৪ মার্চ কালের কণ্ঠের একটি টকশোতে মাসুদ কামাল সিরাজগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা পুলিশ কনস্টেবল হত্যার ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছন। 

তিনি বলেন, “একটা অন্তঃসত্ত্বা পুলিশকে মারছেন আপনি। ঐ অন্তঃসত্ত্বা পুলিশকে না মারলে হাসিনার পতন হতো না? আমি এটার বিচার করতে চাই। যদি বিচারে প্রমাণ হয়—হ্যাঁ, এই অন্তঃসত্ত্বাকে তার ভ্রূণসহ মারতে হবে, কারণ ভ্রূণটাও খারাপ ছিল; তাকে না মারলে হাসিনার পতন হতো না, আন্দোলন সফল হতো না—যদি এটা প্রমাণ হয়, ওকে ফাইন। আমরা আর এই বিচার চাইবো না। ওর অন্যান্য আত্মীয়স্বজনকে বলবো, তোমার এই লোকটার মৃত্যু প্রয়োজন ছিল দেশের জন্য। ওকে ফাইন। কিন্তু আপনি বিচারই করতে দেবেন না—এ তো হয় না।”

দেখুন এখানে, এবং এখানে

কিন্তু দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, নিহতদের মধ্যে কোনো অন্তঃসত্ত্বা বা নারী পুলিশ সদস্য ছিলোনা। এছাড়াও, ১৯ জন পুলিশ হত্যার কোনো খবরও পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায় ১৩/১৫ জন পুলিশের নিহত হওয়ার খবর। একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবর, পুলিশের দায়ের করা মামলাতেও কোনো নারী পুলিশ সদস্যের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। 

২. এনসিপির সমাবেশে হামলায় এনসিপি কর্মী আটকের ভুয়া দাবি 

গত ৮ জুলাই কালের কণ্ঠের ইউটিউবে প্রচারিত ‘কালের সংলাপ’ শীর্ষক এক টকশোতে মাসুদ কামাল দাবি করেন, ৬ জুলাই সাভারে এনসিপির সমাবেশে হামলার প্রেক্ষিতে আটক দুই ব্যক্তি এনসিপির লোক। 

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, এনসিপির সমাবেশে হামলার প্রেক্ষিতে আটক দুই ব্যক্তি এনসিপির নয়; দুই জনই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগের সাথে যুক্ত। 

৩. জামায়াত নেতার জনসচেতনতামূলক লিফলেটকে সিগারেটের প্যাকেট বলে দাবি

কালের কন্ঠের একই টকশোতে উপস্থাপিকা জেনিসিয়া বর্ণা মাসুদ কামালকে প্রশ্ন করেন, “ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচনের প্রার্থী সেলিম উদ্দিন জনগণের মধ্যে সিগারেট বিতরণ করছেন। সিগারেট একটি মাদকব্য আমরা যতদূর জানি। তাহলে একজন জামায়াত নেতা আসলে কিভাবে সেটি বিলি করেন এমন প্রশ্ন জনগণের মনে উঠেছে। আপনার কাছে এর উত্তর জানতে চাই।”

জবাবে মাসুদ কামাল বলেন, “আমি তো মনে করি সিগারেট যেটা বিলি করছেন, সিগারেট ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। এটা তো একটা নেশা। এটা তো আপনি বিলি করতে পারেন না। কিন্তু এটা করছেন। এই ধরনের স্ববিরোধিতা।

কিন্তু দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, উপস্থাপিকা এবং মাসুদ কামালের দাবি সত্য নয়। ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন সিগারেট বিতরণ করেননি। মূলত এগুলো ছিলো সিগারেটের প্যাকেটের আদলে তৈরি মাদকবিরোধী সচেতনামূলক আহ্বান সম্বলিত লিফলেটের প্যাকেট।

৪.সাবেক প্রেস সচিবের নামে ভুয়া বক্তব্য 

গত বছরের ১৩ নভেম্বর কালের কণ্ঠের একটি টকশোতে উপস্থাপক সাদমান সাকিব ফেসবুকে ছড়ানো একটি ভুয়া স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে টকশোর অতিথি মাসুদ কামালকে প্রশ্ন করেন, “প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা যে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন সেটা শোনার জন্যই নাকি মানুষ ঘর থেকে বের হননি — বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন?”

উত্তরে সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, “উনাকে পাবনা পাঠিয়ে দেন। উনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।”

এরপর প্রেস সচিব শফিকুল আলম নিজে তার ফেসবুকে পোস্ট করে জানান এমন বক্তব্য তিনি দেননি এবং ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনেও উঠে আসে এই স্ক্রিনশটটি ভুয়া।

আনিস আলমগীর

১৪ এপ্রিল থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীরের তিনটি অসত্য তথ্য শনাক্ত করেছে দ্য ডিসেন্ট।


১. ট্রাম্পের নামে ভুয়া পোস্ট শেয়ার
১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যালের পোস্ট নামে একটি ভুয়া স্ক্রিনশট সম্বলিত একটি প্রতিবেদন শেয়ার করেছিলেন তিনি। 

ট্রাম্পের নামে ছড়ানো স্ক্রিনশটে দেখা যায়, ট্রাম্প বলছেন, ‘‘ভ্যান্স পাকিস্তান থেকে ফেরার পর থেকেই অবিরাম নেহারি আর পায়া নিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। তাই নেহারি আর পায়া খেতে খেতে কূটনীতি ও আলোচনাকে আরও একটি সুযোগ দেওয়া মোটেও খারাপ আইডিয়া হবে না। হ্যাঁ, এবার আমিও যোগ দেব!’’

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, এই স্ক্রিনশটি ভুয়া। ট্রাম্প এমন কোনো পোস্ট করেননি। 

২. প্রবাসী অ্যাক্টিভিস্টকে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন হিসেবে প্রচার 

যুক্তরাজ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক বাংলাদেশী প্রবাসী অ্যাক্টিভিস্টকে ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যায় অভিযুক্ত চৌধুরী মুঈনুদ্দীন হিসেবে প্রচার করেছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর। ১৬ জুন ২০২৬ তিনি ফেসবুকে এই সংক্রান্ত একটি পোস্ট করেন।

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ওই অনুষ্ঠানে থাকা ব্যক্তির নাম ব্যারিস্টার আতাউর রহমান। তিনি একজন প্রবাসী কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট। এছাড়াও তিনি রিফর্ম বাংলাদেশ নামক একটি প্ল্যাটফর্মের সভাপতি এবং গ্রেটার সিলেট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, ইউকের সাবেক চেয়ারম্যান। 

৩. চট্টগ্রামের বন্যার ছবি হিসেবে এআই ছবি 

১৪ জুলাই ২০২৬ ‘চট্টগ্রামের বন্যার ছবি’ বলে এআই-সৃষ্ট ছবি পোস্ট করেন সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর। 

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির 

২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবিরের তিনটি অসত্য তথ্য শনাক্ত করছে দ্য ডিসেন্ট।

১. বিএনপি নেতার সম্পাদিত ভিডিও  প্রচার

১২ ফেব্রুয়ারি ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির “বিএনপির আসল চেহারা” ক্যাপশনে একটি ভিডিও তার ফেসবুক পেইজে শেয়ার করেন। ভিডিওতে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের বিএনপি নেতা মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসকে বলতে শোনা যায়, “রোজা, নামাজ, হজ কিছু লাগবে না। ধানের শীষে ভোট দিলেই জান্নাত পেয়ে যাবেন।”

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এডিট করে প্রচার করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিস এই কথাটি বলেছিলেন জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ্য করে। মূল ভিডিওতে দেখা যায়, বিএনপি নেতা প্রথমে ভুল করে বলেছেন, "রোজা, নামাজ, হজ কিছু লাগবে না। ধানের শীষে ভোট দিলেই জান্নাত পেয়ে যাবেন।"

ঠিক পর মূহূর্তে নিজের বক্তব্য সংশোধন করে আবার বলেছেন, "দাড়িপাল্লায় ভোট দিলে বেহেশতে চলে যেতে পারবেন। নাউজুবিল্লাহ বলেন সবাই"।

অর্থাৎ, তিনি কথাটি জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন।

২. তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের চুক্তির ভুয়া দাবি 

৬ জানুয়ারি ২০২৬ শাহরিয়ার কবির ‘Pakistan TV’ নামক একটি সংবাদমাধ্যমের টকশোতে দাবি করেছেন, ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন না মর্মে ভারতের সাথে তারেক রহমান একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। 

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার টকশোতে ইংরেজিতে বলেন, “ভারতের একটি প্রভাবশালী সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকা একটি প্রতিবেদনে দাবি করেছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। ওই চুক্তি অনুযায়ী, তিনি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন না। এ ধরনের মোট তিনটি চুক্তি রয়েছে। ঠিক এই জিনিসটাই করা হয়েছিল ১৯৭১ সালে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালে একটি চুক্তি করেছিল যেটাকে আমরা গোলামীর চুক্তি বলি।”

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার ওয়েবসাইটে বক্তব্য দেওয়ার দিন থেকে আগের ৬ মাসে ভারতের সাথে বিএনপি ও তারেক রহমানের সম্পর্ককে আলোকপাত করে প্রকাশিত মোট ৪টি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। এসব প্রতিবেদনের কোনটিতেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার ব্যাপারে ভারতের সাথে তারেক রহমানের চুুক্তি স্বাক্ষর বিষয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

৩. নিজের আসল বক্তব্যকে ভুয়া বলে প্রচার

১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ একটি অনুষ্ঠানে ব্যরিস্টার শাহরিয়ার কবির বলছেন, “জামায়াত ইসলাম করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কী দায়িত্ব? নৈতিক দায়িত্ব। কী জন্য? যদি আপনি জান্নাতে যেতে চান। জান্নাতে যেতে না চাইলে কোনো সমস্যা নাই। ৭২ কাতারের মধ্যে প্রথম কাতারে থাকতে চাইলে জামায়াত ইসলাম করতে হবে। এর মধ্যে আর দ্বিতীয় কোনো অপশন নাই বাবা।"

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নিজের বক্তব্যকে নিজেই ফেইক দাবি করেছেন ব্যরিস্টার শাহরিয়ার। 

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবিরের এই দাবি অসত্য। বরং তিনি আসলেই “জান্নাতে যেতে চাইলে” “জামায়াতে ইসলামী করা নৈতিক দায়িত্ব” এই কথাগুলো বলেছেন।

সাবির মুস্তাফা

গত ৫ মে ২০২৬ অনলাইন ভিত্তিক সংবাদমাধ্যমে একটি অনুষ্ঠানে বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফা তিনটি অসত্য দাবি করেন। 

সাবির মুস্তফার দাবি-

১. শাপলা চত্বরে রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কেউ মারা যায়নি। (দিনে মারা যাওয়া চারজনের লাশ ছাড়া)।

২. রাতের অভিযানে পুলিশের গুলিতে কেউ আহত হননি। তার ভাষায়, “৫০ হাজার লোক যদি হুরহুর করে দৌড়াতে শুরু করে অনেকেই পড়ে যাবে, হোচট খাবে হাঁটু কনুই মাথা অনেক অনেকভাবেই আহত হতে পারেন। তার মানে না যে তার গুলিতে আহত হয়েছে।”

৩. ‘অধিকার’ ৬১ জন এবং ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ ৫৮ জন নিহতের যে তালিকা করেছে, সেই মৃত্যুর তালিকায় শাপলা চত্বরে সেই রাতের পুলিশ অভিযানে নিহত কারো কথা উল্লেখ করা হয়নি। তার ভাষায়, ‘এই যে আপনাদের তালিকা, মৃত্যুর তালিকা, এদের মধ্যে কয়জন শাপলা চত্বরে সেই রাতের পুলিশ অভিযানে মারা গেছে?… তারা কিন্তু বলছেন যে এই তালিকায় কেউ নাই”।

এর আগেও ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর বেসরকারি টিভি চ্যানেল আই এর এক অনুষ্ঠানে ৫ মে রাতে কোন হত্যা বা রক্তপাতের ঘটনা না ঘটার দাবিটি করেছিলেন তিনি। 

বিসিসি বাংলার সংবাদদদাতা কাদির কল্ললের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের সংবাদদাতা জানিয়েছেন যে, সেখানে কোনো 'লাইভ ফায়ারিং' হয়নি এবং তিনি কোনো মৃত্যুর ঘটনা দেখেননি। এমনকি দেয়ালে গুলির চিহ্ন বা রাস্তায় রক্তের দাগও ছিল না। বিবিসি যা সরেজমিনে দেখেছে এবং যাচাই করেছে, সেটাই প্রচার করেছে। আমরা কোনো রাজনৈতিক চাপে বা গুজবের ভিত্তিতে খবর প্রচার করিনি।’’

তবে দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দাবিসমূহ অসত্য বলে প্রমাণ পেয়েছে। দ্য ডিসেন্টের পুরো প্রতিবেদন দেখুন এখানে

নাদিম মাহমুদ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর এর সাবেক সাংবাদিক এবং বর্তমানে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার নিয়মিত কলামিস্ট নাদিম মাহমুদ ২৮ ফেব্রুয়ারি এক পোস্টে তিনটি অসত্য দাবি করেছেন।

তিনি দাবি করেন, “৪ আগস্ট ২০২৪ সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৯ জন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার খবর পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছিল।”

নাদিম মাহমুদ তার পোস্টে আরও দাবি করেছেন, “৪ আগস্ট সারাদেশের পত্রিকাগুলো যখন ১৯ পুলিশ সদস্যকে হত্যার খবর প্রকাশ করল, তখন ইউনূস সরকার সেটিকে নামিয়ে ১৫ তে করল।’’

দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, মূলধারার একাধিক সংবাদমাধ্যমে ৪ আগস্ট পুলিশের বরাত ১৩ জন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। 

এই ১৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য শেখ হাসিনার অধীনে থাকা পুলিশই জানিয়েছে। এবং কোন সংবাদমাধ্যমেই ১৯ জন নিহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।

হাসিনার অধীনের পুলিশের বরাতে যখন দেশের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল ১৩ জন নিহতের কথা, তার ৪ দিন পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে তদন্ত করে এই ঘটনায় ১৫ জন পুলিশের নিহতের তালিকা প্রকাশ করে।

নাদিম মাহমুদ তার একই পোস্টে দাবি করেছেন, “সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে এনায়েতপুর থানায় নিহতদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ছিলেন।”

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে,  উভয় দাবিই নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। এই দাবিটিও কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি। বরং ওই ঘটনাস্থলে কোনো অন্তঃস্বত্বা নারী পুলিশ ছিলেন না– এ সংক্রান্ত  একাধিক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

মাহবুব কামাল

গত ৬ মার্চ ২০২৬ মাসুদ কামালের নিজস্ব প্লাটফর্ম কথা-তে “ভাই আমার পেটে বাচ্চা আছে, আমাকে মাইরেন না! কেন পুলিশ হত্যার বিচার হবে না?” শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। মাসুদ কামালের সঙ্গে আলাপচারিতায় সেখানে দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক মাহবুব কামাল বলেন, “কেন পুলিশ হত্যার বিচার হবে না? কোনো পুলিশ হত্যার বিচার করা দরকার নেই, একটা হত্যার বিচার করেন ভাই। একেবারে অনুরোধ করি, সেটি হচ্ছে সেই অন্তঃসত্ত্বা পুলিশ কনস্টেবল। এই হত্যাটার বিচার করেন। যে কিনা চিৎকার করে বলছিল, আমাকে মাইরেন না, আমার পেটে বাচ্চা।”

 কিন্তু দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, নিহতদের মধ্যে কোনো অন্তঃসত্ত্বা বা নারী পুলিশ সদস্য নেই। এছাড়াও, ১৯ জন পুলিশ হত্যার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায় ১৩/১৫ জন পুলিশের নিহত হওয়ার খবর। একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবর, পুলিশের দায়ের করা মামলাতেও কোনো নারী পুলিশ সদস্যের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

আব্দুন নুর তুষার

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি গণভোট নিয়ে অনলাইন এক্টিভিস্ট আব্দুন নূর তুষার ফেসবুকে ভুয়া তথ্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, গণভোটে 'হ্যাঁ' এবং 'না' মিলে মোট ৩ কোটি ২৫ লাখ ভোট পড়েছে।

তবে, প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, 'হ্যাঁ' এবং 'না' মিলে মোট ভোট কাস্ট হয়েছে ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩টি। এর মধ্যে অসঠিক পদ্ধতিতে ভোট দেয়ার কারণে বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি।

নিলুফার মনি

গত ১ জুলাই ২০২৬ চ্যানেল আইয়ের ‘টু দ্য পয়েন্ট’-এ একটি টকশোতে বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি দাবি করেন, ‘‘বাংলাদেশ পুলিশের কাছে স্নাইপার ছিল না, বাংলাদেশে স্নাইপার নাই।’’ 

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, তার এই দাবি সত্য নয়। বাংলাদেশ পুলিশ ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগের বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশ থেকে স্নাইপার রাইফেল সংগ্রহ করেছে বলে শীর্ষ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়েছে।  

রেজাউল করিম রনি 

গত ২৪ মে ২০২৬ এটিএন নিউজের একটি টকশোতে রেজাউল করিম রনি একটি অসত্য দাবি করেন। 

২২ মে ২০২৬ ঝিনাইদহে এনসিপর মূখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন পাটওয়ারীল উপর হামলার সময় সংগঠনটির এক কর্মীর হাতে অস্ত্রসদৃশ বস্তু দেখা যায়। সেটিকে রেজাউল করিম রনি বন্দুক বলে দাবি করেন। একই দাবি তিনি অন্য টকশোতেও করেন।

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, রেজাউল করিম রনির দাবি সঠিক নয়। হামলার সময় ধারণ করা একাধিক ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত হয়েছে, এনসিপির ওই নেতার হাতে বন্দুক ছিল না। বরং তার হাতে ছিল সেল্ফ ডিফেন্স স্টিক বা আত্মরক্ষামূলক লাঠি। 

শামীম হায়দার পাটোয়ারী 

গত ১৬ মে ২০২৬ IBTVUSA কর্তৃক ‘‘সংসদ- রাজপথ - আন্দলোন | রাজনীতির এপিঠ-ওপিঠ” শিরোনামে আয়োজিত একটি টকশোতে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী দাবি করেছেন, ‘‘৯ লক্ষ হ্যাঁ/না ভোট কম দেখিয়ে প্রথম একটা গেজেট হলো। পরে ৯ লক্ষ হ্যাঁ ভোট যোগ করে আবার একট গেজেট হলো। সেখানে তো বোঝাই যাচ্ছে। একটা ইঞ্জিনিয়ারিং এর আভাস ছিল।’’

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, শামীম হায়টার পাটোয়ারীর দাবিটি সত্য নয়। সংশোধিত গেজেটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বেড়ে যায়নি; বরং প্রথম গেজেটের তুলনায় ৯ লাখ ৭৪ হাজার ৬৮০টি ‘হ্যাঁ’ ভোট কমেছে। অন্যদিকে ‘না’ ভোটের সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ১১ হাজার ৪৯৫টি।