পিংক বাস নিয়ে দুই দিনে ছড়ালো ৬টি ভুয়া খবর

The Dissent Desk
লেখক
দ্য ডিসেন্ট ডেস্ক
২০ আগস্ট, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় নারীদের জন্য বিশেষ বাস সেবা চালু হয়েছে ১৮ই আগস্ট। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ১৪টি বাস প্রাথমিকভাবে এই সেবার আওতায় এনে গোলাপি রঙে সাজানো হয়েছে।

এই বিশেষ বাস সেবা চালুর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ৬টি বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। 

এর মধ্যে রয়েছে পিংক বাস দুর্ঘটনার এআই দিয়ে তৈরি ছবি, পুরোনো দুর্ঘটনার ছবি পরিবর্তন করে প্রচার, সংবাদমাধ্যমের নামে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ড এবং পিংক বাসের নারী চালকদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক—এমন দাবি।

কিছু পোস্টে নারীদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ও জেন্ডার-সংবেদনশীল নয়, এমন ভাষাও ব্যবহার করা হয়েছে।

দ্য ডিসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন কয়েকটি দাবি যাচাই করেছে।

ভুয়া দুর্ঘটনার সঙ্গে নারীকে ইঙ্গিত করে ব্যঙ্গ 

সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছিলেন, “দেখেনতো - এইসব দৃশ্য সৈহ্য করা যায়।”

ছবিটিতে ‘মহিলা বাস’ লেখা গোলাপি রঙের একটি বাসকে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এর পাশে সড়কের ওপর ‘হানিফ’ লেখা আরেকটি বাসও দেখা যায়।

একই ছবি ব্যবহার করে আরও কিছু ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টে লেখা হয়, “প্রথম দিনেই বখাটে হানিফের ধাক্কা, খাদে পড়ে গেল গোলাপী!”

আরেকটি পোস্টে বলা হয়, “প্রথম দিনেই ঘটল অপ্রত্যাশিত এক কাণ্ড। হানিফের ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেল গোলাপী! ঘটনার পর কী হলো? গোলাপী কি শেষ পর্যন্ত উঠে আসতে পারল?”

এসব পোস্টে ‘গোলাপী’ শব্দটি বাসের রঙ বোঝানোর পাশাপাশি একজন নারীকে বোঝানোর মতো করে ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে ‘বখাটে হানিফের ধাক্কা’ এবং ‘গোলাপী কি শেষ পর্যন্ত উঠে আসতে পারল’—এ ধরনের বাক্য দিয়ে বাসটিকে নারীরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ ধরনের পোস্ট দেখা যাবে এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

তবে যাচাইয়ে পিংক বাসকে হানিফ পরিবহনের কোনো বাস ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দেওয়ার এমন কোনো ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার এ বিষয়ে একটি ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদন প্রকাশের পর গোলাম মাওলা রনি তার পোস্টটি সম্পাদনা করেন। পরে সেখানে তিনি লেখেন, “দেখেনতো - এইসব দৃশ্য সহ্য করা যায়? এ আই দিয়ে গোলাপি বাসটির কি দশা করেছে?”

দেখুন এখানে

প্রচারিত ছবিটির উৎস শনাক্ত করতে রিভার্স ইমেজ সার্চ এবং দুর্ঘটনাসংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড দিয়ে সার্চ  করে দ্য ডিসেন্ট।

এতে ১৬ই মার্চ বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে ঘটে যাওয়া একটি বাস দুর্ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

দেখুন এখানে, এবং এখানে। 

প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, বাকেরগঞ্জে একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের পর ‘ইসলাম পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়।

ওই সময় প্রকাশিত ছবিতে সড়কের ওপর একটি ট্রাক এবং পাশের খাদে একটি বাস পড়ে থাকতে দেখা যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিংক বাস দুর্ঘটনার দাবি করে ছড়ানো ছবিটির সঙ্গে ওই ছবির দৃশ্যের মিল রয়েছে। তবে মূল ছবিতে খাদে পড়ে থাকা ‘ইসলাম পরিবহন’-এর বাসের জায়গায় ‘মহিলা বাস’ লেখা গোলাপি রঙের একটি বাস বসানো হয়েছে। আর সড়কে থাকা ট্রাকের জায়গায় যুক্ত করা হয়েছে ‘হানিফ’ লেখা একটি বাস।

অর্থাৎ, পুরোনো একটি দুর্ঘটনার ছবির দৃশ্য পরিবর্তন করে সেটিকে পিংক বাসের দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী একাধিক টুলে ছবিটি পরীক্ষা করেও এটি কৃত্রিমভাবে পরিবর্তিত হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।

আরটিভির নামে ভুয়া ফটোকার্ড 

আরটিভির ফটোকার্ডের আদলে ‘চালুর প্রথম দিনেই নারীদের পিংক বাসে বলাকা বাসের ধাক্কা’ শিরোনামের একটি ফটোকার্ডও ছড়ানো হয়। পোস্টটির ক্যাপশনে লেখা হয়, “কারেন্টের খাম্বার সঙ্গে পিঙ্ক কালারের বাসের ধাক্কা।”

দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

যাচাইয়ে দেখা যায়, বিদ্যুতের পিলারের সাথে পিংক বাসের ধাক্কা খাওয়ার দাবি সঠিক নয়। 

আরটিভির ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, "যাত্রার প্রথম দিনেই রাজধানীতে নারীদের জন্য চালু করা পিংক বাসকে ধাক্কা দিয়েছে গাজিপুর-গুলিস্থান রোডের বলাকা বাস। এ ঘটনায় বলাকা বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে জরিমানা করেছে পুলিশ।” 

‘আমার দেশ’-এর নামে ভুয়া ফটোকার্ড

পিংক বাস নিয়ে দৈনিক আমার দেশের নাম ও লোগো ব্যবহার করে একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে। এতে জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ারকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়, “পিংক কালার মহিলা বাসে পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হোক।”

দেখুন এখানে। 

ফটোকার্ডটির কিউআর কোড যাচাই করে দেখা যায়, সেটি আমার দেশের ‘পিংক কালার মহিলা বাস সার্ভিস চালু’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে নিয়ে যায়। তবে ওই প্রতিবেদনে গোলাম পরওয়ারের এমন কোনো মন্তব্য নেই।

আমার দেশের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একই প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশিত মূল ফটোকার্ড পাওয়া যায়। সেখানে একজন নারী চালকের ছবি রয়েছে, যা পরিবর্তন করে গোলাম পরওয়ারের ছবি বসানো হয়েছে।

অর্থাৎ, মূল ফটোকার্ড সম্পাদনা করেই ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে। 

জাবি অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খানের নামেও ভুয়া মন্তব্য

পিংক বাস নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খানের নামেও একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।

তাঁর ছবি ব্যবহার করে তৈরি একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, নারীদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করাকে তিনি ‘লিঙ্গ বৈষম্য’ এবং ‘নারীদের ছোট করা’ বলে মন্তব্য করেছেন।

ফটোকার্ডটিতে তাকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে, “আলাদা বাসের ব্যবস্থা করে নারীদেরকে ছোট করা হয়েছে। কারন নারীরা পুরুষদের সাথে সমানভাবেই চলতে পারে। এখন যেটা করা হলো সেটা লিঙ্গ বৈষম্য।”

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি, যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে নাহরিন ইসলাম খান এ ধরনের মন্তব্য করেছেন। অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম খানও দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি।

পিংক বাসের নারী চালকদের হিজাব ‘বাধ্যতামূলক’ বলে প্রচার

পিংক বাসের নারী চালকদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে—এমন দাবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।

বাস চালুর আগে ঢাকার বিভিন্ন রুটের চালকদের একটি ফটোসেশনের ছবি এ ধরনের দাবির পক্ষে ব্যবহার করা হয়েছে। ছবিটিতে একজন ছাড়া অন্য নারী চালকদের হিজাব পরা অবস্থায় দেখা যায়।

ছবিটি শেয়ার করে অনেকেই দাবি করেন, নারী চালকদের হিজাব পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

লেখক সাদ রহমান ফেসবুকে লিখেছেন, “পিংক বাসের নারী ড্রাইভারদেরকে যে হিজাব পরতে হইলো, এইটা ইসলামাইজেশন। সরকারের ভঙ্গি হইলো, সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।”

তিনি আরও লেখেন, “আমার ইসলামোফোবিয়া নাই। কিন্তু নারীর সাধারণ চলাফেরার প্রশ্নকে ইসলামিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি দিয়া সমাধান করতে গেলে বিপদ বাড়ে। কমে না। অর্থাৎ বলা হইতেছে, নারীর স্বাধীনতার রাস্তায় একটা রক্ষণশীল ইসলামপন্থী চেকপোস্ট আপনাকে পার হইতেই হবে।”

পোস্টটির আরেক অংশে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এই বাধ্যবাধকতা ক্যানো?”

তার ওই পোস্টের শেষ অংশ ব্যবহার করে ঢাকা পেপার্স নামে একটি সংবাদমাধ্যম ফটোকার্ডও প্রকাশ করেছে।

আরেকটি ফেসবুক পোস্টে সাদ রহমান লেখেন, “গত দুই বছর অন্তর্বর্তী সরকারের জামাতি শাসন না চললে এই দেশের সরকার বাসচালকদেরকে হিজাব পরাইতো? উত্তর, না।”

হিজাব পরে বাস চালানোর ছবি নিয়ে আরও সমালোচনামূলক পোস্ট দেখা যাবে এখানে, এখানে এবং এখানে

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে পিংক বাসের নারী চালকদের হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পিংক বাসের ছবি ও ভিডিওতে হিজাব ছাড়াও নারী চালকদের বাস চালাতে দেখা গেছে।

বিআরটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞাও দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে হিজাব পরার কোনো বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে হিজাব পরার কোনো বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়নি। এটা সম্পূর্ণ যার যার ব্যক্তিগত চয়েস। হিজাব পরে বাস চালানোর কারণে মূলত এই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। কিন্তু হিজাব ছাড়াও অনেক বাস চালক ছিলেন। বাধ্যতামূলক করলে তারা তো হিজাব ছাড়া বাস চালাতে পারতেন না।”