পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত ঘিরে অনলাইনে ছড়াচ্ছে একের পর এক ভুয়া ভিডিও
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভিডিওতে মিয়ানমারের সশস্ত্র সংগঠনের প্রচারণা, কারেন জনগোষ্ঠীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের দৃশ্য এবং ভারতের সিনেমার শুটিংয়ের ফুটেজকে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওগুলোর সঙ্গে সাজেকের ঘটনার সম্পর্ক নেই। দ্য ডিসেন্ট সংশ্লিষ্ট কী-ওয়ার্ড সার্চ করে এধরনের ৬টি দাবি ও এসব দাবির ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন খুঁজে পেয়েছে।
সাজেকের দৃশ্য দাবিতে মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী সংগঠনের ভিডিও প্রচার
সাজেক ভ্যালিতে নিরাপত্তা বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের দৃশ্য দাবিতে সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তবে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনার নয়। এটি মিয়ানমারের একটি সামরিক জান্তাবিরোধী সংগঠনের প্রচারণামূলক ভিডিও।
ফেসবুকে Watch News BD 24 নামের একটি পেজ থেকে গত ২৫ অক্টোবর ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এর ক্যাপশনে লেখা ছিল, “সাজেক ভ্যালি বন্ধ: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগ।” ভিডিওর ভেতরে লেখা ছিল, “দাবি উঠেছে এরা এমন অস্ত্র পেলো কোথায়?” এতে কয়েকজন শিশু-কিশোরকে গোল হয়ে বসে অস্ত্র নাড়াচাড়া করতে দেখা যায়। তাদের মাঝখানে কয়েকটি অস্ত্র রাখা ছিল।
ভিডিওটির কয়েকটি কী-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে Wai Thin নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে এর আগের একটি সংস্করণ পাওয়া যায়। গত ২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ১৪ মিনিটে প্রোফাইলটি থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এর সঙ্গে বার্মিজ ভাষায় লেখা ছিল, “চোকসে টাউনশিপ রেভলুশনারি ফোর্স, বন্দুক তো কেবল তখনই বন্দুক যখন তা চালানো হয়, আর নারীকে ভালোবাসলেই কেবল নারী হয়ে ওঠেন, তাই না? #বিপ্লব”।
এ ছাড়া, গত ২৪ সেপ্টেম্বর “အဲနီ မိငယ်” নামের আরেকটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকেও একই ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেখানে বার্মিজ ভাষায় লেখা ছিল, “জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ এড়িয়ে চলতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের স্বাগত জানায় মিইংজানের তরুণেরা।” পোস্টটিতে ভিডিওটির উৎস হিসেবে মিইংজান রেভলুশন আর্মির নাম উল্লেখ করা হয়।
প্রাসঙ্গিক শব্দ ব্যবহার করে সার্চ করলে চোকসে রেভলুশন আর্মি (Kyaukse Revolution Army বা K.R.A) নামের একটি ফেসবুক পেজ পাওয়া যায়। মিয়ানমারভিত্তিক এই পেজে গত ২২ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে একই দৃশ্যের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল। এর ক্যাপশনে বার্মিজ ভাষায় লেখা ছিল, “সত্যি বলতে, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের মানুষের রক্তের অভাব নেই (সাহসের ঘাটতি নেই)।”
চোকসে রেভলুশন আর্মি নিজেদের মিয়ানমারের সামরিক জান্তাবিরোধী সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়। সংগঠনটির ফেসবুক পেজে এ ধরনের আরও প্রচারণামূলক ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করা হয়। এসব সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনার দৃশ্য দাবি করে ছড়ানো ভিডিওটি মূলত মিয়ানমারের একটি সংগঠনের প্রচারণামূলক ভিডিও।
সাজেকের পরিস্থিতি দাবিতে মিয়ানমারের বিদ্রোহী কারেন আর্মির অভিযানের দৃশ্য প্রচার
সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতির দৃশ্য দাবি করে সম্প্রতি ফেসবুকে সশস্ত্র ব্যক্তিদের অভিযানের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের ‘শান্তি বাহিনী’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ভিডিওটি সাজেকের নয়। এটি মিয়ানমারের তানিনথারী অঞ্চলে কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (কেএনএলএ) একটি অভিযানের দৃশ্য।
গত ২৪ অক্টোবর ‘হাতিয়ার নিউজ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ৪ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এতে কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে বন ও লোকালয়ের মধ্যে গুলি করতে করতে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা হয়, “এই হচ্ছে সাজেকের অবস্থা এরা হচ্ছে শান্তি বাহিনী।”
কিন্তু ভিডিওটির কয়েকটি কী-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। এতে ইউটিউবে গত ১২ অক্টোবর পিপলস স্প্রিং (People’s Spring) নামের একটি চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিওটির সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। ভিডিওটির শিরোনাম ছিল, “KNLA Special Forces say 10 soldiers killed in ambush near 285th Battalion”।
মূল ভিডিওর ওপরের দুই কোণে একটি করে গোলাকার লোগো রয়েছে। হাতিয়ার নিউজের পোস্ট করা ভিডিওতে ওই জায়গাগুলোতে পেজটির নিজস্ব লোগো বসানো হয়েছে। মূল ভিডিওতে বার্মিজ ভাষায় লেখা রয়েছে, ‘ভিডিও: কেএনএলএ ব্রিগেড-৪ বিশেষ বাহিনী’।
ইউটিউব ভিডিওটির বিবরণ অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর সকালে কেএনএলএ ও তাদের মিত্র বাহিনী মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি ফাঁড়িতে হামলা চালায়। ঘটনাস্থল ছিল দেশটির তানিনথারী অঞ্চলের পালাও টাউনশিপ। বিবরণে সাজেক বা শান্তি বাহিনীর কোনো উল্লেখ নেই।
একই লোগোযুক্ত ৪ মিনিট ৪ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিও গত ১৩ অক্টোবর এক্সে প্রকাশ করে ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট ‘ওয়ার নোয়ার’ (War Noir, @war_noir)। ইংরেজি ভাষার ওই পোস্টে বলা হয়, কেএনএলএ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি অবস্থানে হামলা চালিয়েছে।
এ ঘটনার বিষয়ে কেএনএলএর রাজনৈতিক সংগঠন কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) গত ১৩ অক্টোবর তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ১২ অক্টোবর সকালে পালাওয়ের মা গি গন (Ma Gyi Gone) গ্রামের কাছে সেনাবাহিনীর একটি ফাঁড়িতে যৌথ হামলা চালানো হয়।
একই দিন ডেভেলপমেন্ট মিডিয়া গ্রুপের (ডিএমজি) ইংরেজি সংস্করণ তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে কেএনইউর বিবৃতির বরাতে ঘটনাটি নিয়ে একটি পোস্ট প্রকাশ করে। সেখানে ফাঁড়িটি একটি প্যাগোডার কাছে অবস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও এ ধরনের একটি স্থাপনা দেখা যায়।
এ ছাড়া, মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত নিউজলেটার ‘বার্মা কুপ রেজিস্ট্যান্স নোটস’ (Burma Coup Resistance Notes)-এর ১৭ অক্টোবরের সংস্করণেও ঘটনাটির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়, ১২ অক্টোবর কেএনএলএ মেরগুই-তাভয় জেলার পালাওয়ের কাছে সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্পে হামলা চালায়।
অর্থাৎ, ফেসবুকে সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতি বলে ছড়ানো ভিডিওটি বাংলাদেশের কোনো ঘটনার নয়। এটি মিয়ানমারের তানিনথারী অঞ্চলে কেএনএলএর একটি অভিযানের পুরোনো দৃশ্য।
ইউপিডিএফের সশস্ত্র গোষ্ঠী বাংলাদেশে প্রবেশের দাবিতে ছড়িয়েছে ভিন্ন দেশের ভিডিও
অস্ত্র হাতে সশস্ত্র ব্যক্তিদের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, ইউপিডিএফের ‘উগ্রবাদী গোষ্ঠী’ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে ভিডিওটির ক্যাপশনে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, এ বিষয়ে দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে না কেন এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানতে দেওয়া হচ্ছে না কেন।
কিন্তু ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইউপিডিএফের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রবেশের দৃশ্য নয়। এটি মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী কারেন জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র সদস্যদের প্রশিক্ষণের পুরোনো ভিডিও।
যাচাইয়ে গত ২০ আগস্ট ARMY Esanনামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। মূল ভিডিওটির ক্যাপশনে থাই ভাষায় লেখা ছিল, ‘প্রশিক্ষণে আসার সময়েও তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে বর্ম পরে আসে।’ তবে সেখানে ইউপিডিএফের কোনো উল্লেখ নেই।
এ ছাড়া, গত ৩ অক্টোবর Karen Thai News নামের আরেকটি ইউটিউব চ্যানেলেও একই ভিডিও প্রকাশ করা হয়। চ্যানেলটির বিবরণে বলা হয়েছে, তারা কারেন জনগোষ্ঠীকে নিয়ে ভিডিও প্রকাশের পাশাপাশি প্রকৃতিবিষয়ক ভিডিওও তৈরি করে। কারেন একটি সিনো-তিব্বতি জাতিগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর মানুষ মূলত মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাস করে।
অর্থাৎ, কারেন জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র সদস্যদের প্রশিক্ষণের পুরোনো ভিডিওকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইউপিডিএফের সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রবেশের দৃশ্য বলে প্রচার করা হয়েছে।
সাজেকে সেনাবাহিনীর ওপর পাহাড়ি গোষ্ঠীর গুলির দাবিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পুরোনো ভিডিও প্রচার
সাজেকে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা সেনাবাহিনীর ওপর গুলি চালাচ্ছে, এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তবে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি সাজেকের সাম্প্রতিক সংঘাতের নয়। এটি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় রুশ সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ইউক্রেনীয় বাহিনীর গুলিবর্ষণের পুরোনো দৃশ্য।
ভিডিওটি যাচাই করতে গিয়ে CNN Prima News-এর ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেখানে আলোচিত ভিডিওটির একটি বর্ধিত সংস্করণ রয়েছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম অনুযায়ী, ভিডিওটিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় রুশ সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ইউক্রেনীয় সেনাদের গুলিবর্ষণের দৃশ্য দেখা যায়।
পরবর্তী যাচাইয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও একই ভিডিও একই ঘটনার দৃশ্য হিসেবে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, ভিডিওটির সঙ্গে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে সাম্প্রতিক সংঘাতের কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে ওই পুরোনো ফুটেজের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সশস্ত্র সদস্যদের অবস্থানের আরও কয়েকটি দৃশ্য রয়েছে। রিউমর স্ক্যানারের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ওই দৃশ্যগুলো সাম্প্রতিক সময়ের।
অর্থাৎ, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পুরোনো ভিডিওকে সাজেকে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সেনাবাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণের দৃশ্য বলে প্রচার করা হয়েছে। ফলে ভিডিওটির সঙ্গে যুক্ত দাবিটি বিভ্রান্তিকর।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার দাবিতে ভারতের সিনেমার শুটিংয়ের ভিডিও প্রচার
সাজেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দুই নারীসহ কয়েকজন পুরুষকে পাহাড়ি এলাকায় অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এটি প্রচার করে দাবি করা হয়, তাঁরা আরাকান আর্মি ও ইউপিডিএফের সদস্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান অবরোধে অস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।
কিন্তু রিউমর স্ক্যানারের যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশের কোনো পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার দৃশ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভারতের আসামে নির্মিত একটি সিনেমার শুটিংয়ের পুরোনো ভিডিওকে বিভ্রান্তিকর দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।
ভিডিওটির উৎস খুঁজে বের করতে গিয়ে Derhasar Brahma নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ২৩ জুলাই একই ভিডিওর একটি বর্ধিত সংস্করণ পাওয়া যায়। সেখানে হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে ভিডিওটিকে সিনেমার শুটিংয়ের নেপথ্যের দৃশ্য বা বিহাইন্ড দ্য সিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেজটি পর্যালোচনা করে একই নারীকে দেখা যায়, এমন আরও কয়েকটি ভিডিও পাওয়া যায়। এর একটি ভিডিওতে তাঁকে একই পোশাকে ক্যামেরার সামনে দৌড়ে অভিনয় করতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে শুটিংয়ের সেটে তাঁকে অন্য অভিনেতাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।
পেজটি থেকে জানা যায়, Derhasar Brahma একজন ক্যামেরা পারসন এবং তিনি ওই সিনেমার শুটিং করেছেন। তাঁর পেজে সিনেমাসংক্রান্ত আরও কিছু পোস্টে ‘JT2’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। পেজটির আরেকটি পোস্ট থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি ‘JANGKHRITHAINI THWISAM 2’ নামের একটি সিনেমার সঙ্গে সম্পর্কিত।
যাচাইয়ে সিনেমাটির একটি ট্রেলারও পাওয়া যায়। ট্রেলারটিতে আলোচিত ভিডিওতে দেখা নারীকে শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া, ট্রেলারের ক্যাপশনে Derhasar Brahma-কে সিনেমাটির ক্যামেরা পারসন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়, আলোচিত ভিডিওটি মূলত সিনেমাটির শুটিংয়ের দৃশ্য।
আরও যাচাইয়ে ভিডিওতে দেখা অভিনেত্রীর ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর নাম মোনালিসা হাজোয়ারি। তিনি ভারতের আসামের বাসিন্দা। ক্যামেরা পারসনের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তথ্য থেকেও সিনেমাটির শুটিং আসামে হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একই পেজের একটি পোস্টে সিনেমাটির পরবর্তী সিক্যুয়েল ‘JANGKHRITHAINI THWISAM 3’ নির্মাণের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ভারতের আসামে নির্মিত একটি সিনেমার শুটিংয়ের পুরোনো ভিডিওকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের অস্ত্র হাতে অবস্থানের দৃশ্য বলে প্রচার করা হয়েছে।
সাজেকের গোলাগুলির দৃশ্য দাবিতে মিয়ানমারের সামরিক সংঘাতের ভিডিও প্রচার
সাজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা দাবিতে ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি সাজেকের সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার নয়। গত জুলাইয়ে মিয়ানমারের সামরিক সংঘাত নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে একই ভিডিও পাওয়া গেছে।
গত ২২ অক্টোবর রিকি রকি (Ricky Rocky) নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে আট সেকেন্ডের ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। পোস্টে দাবি করা হয়, রাঙামাটির সাজেকের বাঘাইছড়ি ইউনিয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ইউপিডিএফের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পর্যটকদের ওপর হামলা এবং সংঘর্ষে দুই সেনাসদস্য আহত ও ইউপিডিএফের কয়েকজন সদস্য গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। ভিডিওতে জঙ্গলের মধ্যে কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়।
ভিডিওটির কী-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেমোক্র্যাটিক ভয়েস অব বার্মার (ডিভিবি) ফেসবুক পেজে গত ৮ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনের ২৩ থেকে ২৬ সেকেন্ড অংশে জঙ্গলের মধ্যে কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। তাদের অবস্থান, অস্ত্র এবং আশপাশের গাছপালার সঙ্গে ফেসবুকে ছড়ানো ভিডিওটির দৃশ্যের মিল রয়েছে। ডিভিবির ইউটিউব চ্যানেলেও একই ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ও ক্যাপশন অনুযায়ী, এটি মিয়ানমারের কারেন রাজ্যের ফাপুন শহরের সামরিক সংঘাত নিয়ে।
এ ছাড়া, একই দিনে ডিভিবির ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ফাপুন শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে হামলা চালাচ্ছিল কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (কেএনএলএ) সহযোগী বাহিনীগুলো।
ভিডিওতে এক সশস্ত্র ব্যক্তির পোশাকের হাতায় একটি ব্যাজও দেখা যায়। ব্যাজটির নিচের অংশে নীল, সাদা ও লাল রঙের তিনটি ভাগ রয়েছে। ওপরের অংশে লাল ও সাদা রঙের একটি চিহ্ন দেখা যায়। ইউপিডিএফের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দলীয় সংবিধান অনুযায়ী, সংগঠনটির পতাকার ওপর ও নিচের অংশ লাল এবং মাঝের অংশ নীল। মাঝখানে রয়েছে একটি সাদা তারকা। সংগঠনটির মনোগ্রাম হিসেবে তীর-ধনুক ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পতাকায় লাল ও সাদা রঙের পাশাপাশি একটি হলুদ তারকা রয়েছে। সংগঠনটির মনোগ্রামও আলাদা। ভিডিওতে দেখা ব্যাজের সঙ্গে ইউপিডিএফ বা জেএসএসের প্রতীকের মিল পাওয়া যায়নি। একইভাবে, ব্যাজটির সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পোশাক বা ব্যাজেরও দৃশ্যমান মিল শনাক্ত করা যায়নি।
অর্থাৎ, সাজেকে সেনাবাহিনী ও ইউপিডিএফের মধ্যে সাম্প্রতিক গোলাগুলির দৃশ্য দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি অন্তত গত জুলাই থেকেই অনলাইনে রয়েছে এবং মিয়ানমারের সামরিক সংঘাত নিয়ে ডিভিবির প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই দৃশ্য পাওয়া গেছে। তবে ভিডিওটি ঠিক কোথায় ধারণ করা হয়েছিল এবং এতে দেখা সশস্ত্র ব্যক্তিরা কোন বাহিনীর সদস্য, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।