Four Months Since Coast Guard Detained Miraj, His Family Still Awaits His Return
বাগেরহাটের মোংলা এলাকার জয়মণি ঠোটা গ্রামের বাসিন্দা মিরাজ শেখ। ৩০ বছর বয়সী মিরাজ পেশায় সুন্দরবনের মৎস্যজীবী ও মৌসুমী মধু আহরণকারী। পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন গার্মেন্টসকর্মী। তাদের ৭ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। মিরাজের বাবা মোস্তফা শেখ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। মা বয়োবৃদ্ধ তাসলিমা বেগম। পাঁচজনের সংসারে মিরাজই একমাত্র উপার্জনকারী।
জয়মণি গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে স্থানীয় শ্যালা নদী। এই নদীতেই অবস্থিত বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশন। স্টেশন বরাবর নদীর তীরে রয়েছে বেশ কিছু ছাপড়া ঘর। এগুলোর কোনটিতে জেলেরা থাকেন আবার কোনটি ছোট ছোট দোকান। এসব দোকানের মধ্যেই একটি আল আমিনের চায়ের টং। স্থানীয় জেলে, কোস্টগার্ডের সদস্য এবং অন্যান্যরা এই দোকানে চা খেতে আসেন।
মিরাজ শেখও আল আমিনের দোকানের নিয়মিত গ্রাহক। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে মিরাজ দোকানটিতে চা খেতে যান। সঙ্গে ছিল তার লাল রঙের প্লাটিনা মোটরসাইকেলটি (নম্বর BAGHERHAT-HA-11-9433)।
মিরাজ দোকানে পৌঁছে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল আলমকেও পান সেখানে। তারা এক সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প করছিলেন দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে। এমন সময় একটি ছোট নৌকা এসে তাদের পাশে তীরে ভিড়ে। নৌকাতে তিনজন পুরুষ লোক ছিলেন। একজন মাঝি মিজান শেখ আর বাকি দুইজনকে কেউ চিনে না। নৌকাটি এসেছে নদীর মাঝখানে অবস্থিত কোস্টগার্ডের স্টেশন থেকে।
অপরিচিত দুই ব্যক্তি নৌকা থেকে নেমে মিরাজের দিকে এগিয়ে যান এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি মিরাজ?’। হ্যাঁ সূচক উত্তর পেয়েই দুই পাশ থেকে দুই ব্যক্তি মিরাজকে চেপে ধরেন এবং টেনে নৌকার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মিরাজ ধস্তাধস্তি করলে তাকে মারধর করেন ওই দুই ব্যক্তি। মিরাজকে যেই জায়গা থেকে ধরা হয় সেখান থেকে নৌকার দিকে নিয়ে যাওয়ার পথে একটি বড় তেতুল গাছ পড়ে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ওই গাছের নিচে পড়ে থাকা লাঠি হাতে নিয়ে মারতে থাকেন অপরিচিত ব্যক্তিদের একজন। অন্যজন তাকে ধরে রাখেন। এভাবে মারতে মারতে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় জেটির দিকে। মিরাজকে আটক করার জায়গা থেকে জেটি পর্যন্ত দূরত্ব আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ মিটার। জেটির শেষ প্রান্তে নিয়ে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন তারা। এই সময় ভিন্ন আরেকটি নৌকা পাশ দিয়ে যাচ্ছিল; যার মাঝির নাম মান্নান মাঝি। নৌকাটি থামিয়ে মিরাজকে সেটিতে তুলে নিয়ে মাঝনদীতে থাকা স্টেশনের দিকে যান অপরিচিত দুই ব্যক্তি।

মিরাজকে আটক করার পর ধস্তাধস্তি করে এই দূরত্ব পার হতে এবং নৌকা জোগাড় করে স্থান ত্যাগের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ মিনিটের মতো সময় লেগেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এই ঘটনা যখন ঘটছিল তখন আশপাশে বেশ কিছু লোক ছিলেন। তাদের প্রকৃত সংখ্যা বা সবার নাম জানা যায়নি। তবে নৌকা থেকে দুইজন লোক উঠে টেনে ও মেরে মিরাজকে অন্য আরেকটি নৌকায় তুলে নিয়ে যাওয়ার পুরো ঘটনা যারা নিজের চোখে দেখেছেন এমন চারজন ব্যক্তি হলেন চায়ের দোকানদার আল আমিন, মিরাজের সাথে গল্প করতে থাকা সোহেল আলম, এনামুল এবং স্থানীয় গৃহবধু মোছাম্মত সেলিনা; যাদের সাক্ষাৎকার নেয়া সম্ভব হয়েছে এই প্রতিবেদনের জন্য। পাশাপাশি ঘটনার আংশিক প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনেরও সাক্ষাৎকার নিয়েছে দ্য ডিসেন্ট।
মিরাজকে ধরে মারধর শুরুর পরপরই প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন (উপরে উল্লিখিত তিনজনের বাইরে; যার নাম স্মরণ করতে পারেননি মিরাজের স্ত্রী) মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুনকে ফোন করে বিষয়টি জানান।
“আমারে এক লোকে ফোন দিয়া বলছে, ‘মিরাজ ভাইরে ধইরা নিয়া যাইতেছে, তাড়াতাড়ি জেটিতে আসেন”, দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন মুক্তা; যিনি ঘটনার আংশিক প্রত্যক্ষদর্শী।
মিরাজের বাড়ি থেকে জেটি পায়ে হেঁটে ৫ মিনিটের দূরত্ব। মুক্তা দৌড়ে ঘটনাস্থলে যান। এবং তার দাবি, “আমি খবর পাওয়ার পর দৌড়ে ২ মিনিটের মধ্যে জেটিতে যাই। গিয়ে দেখি তারে মারতেছে। এরপর জোর করে নৌকায় তুলে নিয়া গেছে। কত জায়গায় গেছি। এখনও তার খোঁজ পাইনি।”
১০ এপ্রিল দুই অপরিচিত ব্যক্তি কর্তৃক জোরপূর্বক মিরাজ শেখকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আজ ৩০ জুলাই পর্যন্ত ১১২ দিন ধরে তিনি নিখোঁজ আছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার। এই ঘটনাকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ঘটা ‘প্রথম গুমের ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ক্ষমতায় থাকাকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের নির্দেশদাতা হিসেবে গত বছর শেখ হাসিনার ফাঁসির দণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল।
এইচআরডাব্লিউর বলছে, “মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম জানিয়েছেন, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি কোস্টগার্ডের পন্টুনে গিয়ে দেখেন, স্বামীকে আটকে রাখা হয়েছে এবং পরে স্পিডবোটে করে তাকে হাড়বাড়িয়া ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়৷ প্রথমে ফাঁড়ি থেকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলা হলেও পরদিন গিয়ে দায়িত্বরত নতুন দল বিষয়টি অস্বীকার করে৷ মিরাজের বোনের দাবি, তার ভাইয়ের মোটরসাইকেলও কোস্টগার্ড সদস্যরাই নিয়ে গিয়েছিল৷”
বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। এখনকার এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে সত্যিকারের সংস্কার ছাড়া এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে এই ধরনের চর্চা গেঁথে গেছে।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও স্বাধীন তদন্তের লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকার সেটি বাতিল করে নতুন একটি আইন প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাবিত আইনে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হবে এবং গুমের তদন্তভার পুলিশের হাতেই থাকবে।”
ধরে নিয়ে গেছে কারা: প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে সেদিনের ঘটনা
দ্য ডিসেন্ট মিরাজের স্ত্রীসহ অন্তত আটজন প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান পেয়েছে এবং তাদের মধ্যে সাতজনের সাথে কথা বলে মিরাজকে ধরে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা শুনেছে এবং অষ্টমজন সোহেল আলমের (মিরাজের সাথে গল্পরত ছিলেন) একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করেছে যেখানে তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। সোহেলের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মিরাজের বোন লিজা ইসলাম। সোহেলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
রেকর্ড করা ভিডিওতে ঘটনার বিবরণ দিয়ে তাকে বলতে দেখা যায়, “মিরাজকে যেদিন সন্ধ্যার সময় ধরে, ওইদিন মিরাজ আমার পাশেই ছিল। আমরা ভাই-বন্ধু হিসেবে যেভাবে সবসময় কথাবার্তা বলি, ঐরকম আমরা সাইডে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলতেছিলাম। এই সময় পল্টন (হাড়বাড়িয়া স্টেশন, পন্টুন) থেকে একটা নৌকা আসে, সিভিলে (সিভিল পোশাকে) দুইজন লোক আসে। নৌকা থেকে সিভিলের লোক দুইজন নেমে সোজা এসে মিরাজকে ধরে।’’
সোহেল আরও বলেন, ‘‘ধরার পরে মিরাজকে ঠেলতে ঠেলতে দক্ষিণ সাইডে একটা জেটি আছে, জেটিতে নিয়ে যায়। নেওয়ার পরে আমরা বুঝতে পারছি যে, কোস্টগার্ডে ধরছে। যেহেতু পল্টন থেকে একটা নৌকা আসছে, নৌকায় দুইজন লোক আসছে, অন্য কোনো লোক ঐ পল্টনে যাতায়াত করতে পারে না এবং ঐ পল্টনে দ্বিতীয় আর কোনো লোক উঠতে পারে না একমাত্র প্রশাসনের লোক ছাড়া এবং কোস্টগার্ড ছাড়া।’’

“জেটিতে নিয়ে তাদের বোট একটু আসতে দেরি হওয়ার কারণে জাহাজের এক ভাড়ায় চলা বোট (মান্নান মাঝির নৌকা) দক্ষিণ দিক থেকে আসে। আসার পর ঐ বোটে করে মিরাজকে উঠিয়ে তারা পল্টনে নেয়। নেওয়ার পরে ৩০/৪০ মিনিট পরে একটা ফাইবার বোট আসে কোস্টগার্ডের। কোস্টগার্ডের পোশাক পরা ৬ থেকে ৭ জন লোক ঐ বোটে ছিল। আরও ৩০/৪০ মিনিট পর ঐ বোটে করে মিরাজকে নিয়ে তারা চলে যায়। আমরা এতটুক পরিমাণ দেখছি। এর বেশি আমরা দেখতে পারিনি”, বলেন সোহেল।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী হলেন মোছাম্মত সেলিনা। তিনি ও পাড়ার একজন গৃহবধু। ওই দিন সন্ধ্যায় নদীর ধারের দোকানগুলো থেকে বাজার করতে এসেছিলেন তিনি।
তিনি কী দেখেছিলেন তার বর্ণনা দিয়ে দ্য ডিসেন্টকে মোছাম্মত সেলিনা বলেন, “আমি আসছিলাম দোকানে বাজার নিতে, সেসময় দেখি যে, মিরাজরে ধরছে। পাশে একজন মহিলা ছিল, নাম ঝুমুর, তার পাশ থেকে ধরছে। দুইজন সিভিল পোশাকে। একটা নৌকা কইরা বাইয়া আইছে। ওরে আইয়া জিগাইছে ‘আপনের নাম কি মিরাজ?’ কইছে, ‘হয়’। হ্যাঁ কওয়ার লগে লগে দুই ঘাড় ধরছে, হাতের দুই ডানা ধইরা টানতে টানতে কয়, ‘এইদিকে আসেন’। আর মিরাজ বলতে আছে যে, ‘কী কারণে বলেন’। কয়, ‘এইদিকে আসো’। মিরাজ কয়, ‘ঐদিকে কেন যাবো?’
মোছাম্মত সেলিনা আরও বলেন, ‘‘সেসময় আমার স্বামী আমার সাথে ছিল। আমার স্বামীরে বলছে, ‘ও বেয়াই এরা আমারে কোথায় ডাকে?’ হেই সময় হেরা (যারা ধরে নিয়ে যাচ্ছিল) বলছে ‘তোর বেয়াইর গোষ্টি…’ কয়া একটা খারাপ কথা বলছে। পরে ওরে (মিরাজ) টানতে টানতে তেঁতুল গাছতলায় নিয়া গেছে, কর্নারে একটা তেতুল গাছ আছে। গাছতলা নিয়া একটা বাড়ি (প্রহার) দিছে। একটা পিডান মারছে দুইজনার একজনে, মারার পর ওখান থেকে আবার ধাক্কাইতে ধাক্কাইতে ওরে পল্টনে ঐ সিঁড়িটার মাথায় নিছে। মাথায় নেওয়ার পরে ঐ জাগাতে ধাক্কা দিয়া ফালায় দিছে। একটা বোট, জাহাজের বোট সাদা (রঙের), উপরে রঙ করা হেই বোটের ভিতরে (ঢুকাইছে)।’’
‘‘বোটের উপর ফালাইয়া ওহানে একজনে পিটাচ্ছে, আর ও চিক্কুর পাড়তেছে (চিৎকার করছে), আরেকজনে মুখ চেপে ধরছে। পরে দ্রুতভাবে নিয়া গেছে পল্টনে। পল্টনে নেওয়ার পরে পল্টনে উঠাইছে। উঠানোর পরে পল্টনের ভিতরে নিয়া গেছে এবং পরে দেখছি যে কালো কম্বল দিয়া ঢাইকা দিছে। পরে কোনো শব্দ নাই কিছু নাই কী যে করছে, মারছে নাকি বলতে পারি না।’’
‘‘কতক্ষণ পরে মিরাজের বউ আইছে, মিরাজের শাশুড়ি আইছে, শ্বশুর আইছে। পরে আমরা সব ঐ সিঁড়িটার মাথার উপরে গেছি। মানা করছে তারা বারবার যে, ‘ওর উপর আইসেন না’। তারপরেও আমরা গেছি, যাইয়া আমরা তিন-চারজন ঐহানে দাঁড়াই রইছি। কিন্তু ভয়ে আমরা পল্টনের গায়ে যাইতে পারি নাই।’’
‘‘পরে দেহি যে কিছুক্ষণ পর কেবিন ক্রুজার আইছে, স্পিড বোট বলে, কোস্টগার্ড লেখা, কোস্টগার্ডের পোশাক পইরা আইছে। আসার পরে তিন/চারজন ঐ বোটে উঠছে। উইঠা কী বলছে বলতে পারি না। মনে হয় ২০/২৫ মিনিট ঐ জাগা ওয়েট করছে। ওয়েট করার পরে মিরাজসহ তারা ঐ পল্টনের লোক তারাও তিন/চারজন উঠছে। উঠার পরে প্রায় ৮/৯ জন লোক ঐ স্পিডবোটে ওর মাথা নোয়াইয়া ঠেলে ভিতরে ঢুকাইয়া পরে বোট চালাইয়া মংলার দিক চলে গেছে। এইটুক পর্যন্ত আমরা দেখছি।’’
ঘটনার শুরু থেকেই প্রত্যক্ষদর্শী আরেকজন হলেন চায়ের দোকানদার আল আমিন শেখ।
তিনিও ওই দিনের ঘটনার একই রকম বর্ণনা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার সময় আমার এখানে দোকানের সাইড দিয়ে মিরাজ ভাইরে কোস্টগার্ড ধরে নিয়ে গেছে। নিয়ে যাওয়ার পর ৫/৬ মিনিটের মধ্যে আমারে ফোন দিছে (যারা ধরে নিয়ে গেছে তারা)। দিয়ে কয়, ‘আপনার এখানে মিরাজের গাড়ি আছে?' আমি কই, ‘কীসের গাড়ি?’ কয়, ‘দাঁড়ান আমরা আসতেছি।’’ ‘আসার পর আমাকে বের হতে বলছে দোকান থেকে। আমি বের হইলে আমারে বলছে, ‘এই গাড়িটা রাখেন।’ আমি কই, ‘না, আমার এখানে গাড়ি রাখা যাবে না।’ কয়, ‘দোকানের মধ্যে রাখেন।’ আমি কই, ‘রাখা যাবে না।’ তারপর সেই গাড়িটা আমার গাড়ির সাইডে রেখে গেছে। রেখে যাওয়ার ১০-১১ দিন পর রাত ৪টার সময় এসে কোস্টগার্ড পরিচয় দিয়া গাড়ি নিয়া গেছে। আমি পরিচয় জিজ্ঞেস করার পর তাদের একজন বলেন আমরা হইছি কোস্টগার্ড, আমার নাম রবিন।”

আল আমিনের দোকানে রাখা মিরাজ শেখের ব্যবহৃত বাইক।
আল আমিন আরও বলেন, ‘‘গাড়ি রাত ৪টার সময় নিয়ে গেছে। পরবর্তীতে তারা বলতেছে আমরা কোনো গাড়ি নেইনি। গাড়ি চালাইয়া গেছে। ওর গাড়িতে তেল ছিল না, নিজেরা তেল ভরে চালাইয়া নিয়া গেছে। আর এই যে দুইজন যারা কোস্টগার্ড, এরা কয় ‘আমরা গাড়ি নেইনি’।
‘‘গাড়ির চাবি তো মিরাজের কাছে ছিল। সে তো গাড়ি এখানে চালাইয়া এনে রাখছে। গাড়ির চাবি মিরাজ ভাইয়ের কাছে ছিল। তাইলে এরা গাড়িটা যে নিল, চাবি পাইল কই? ওই মিরাজ ভাইয়ের কাছে যে চাবি ছিল, সেই চাবি দিয়াই গাড়ি নিয়া গেছে। এখন তারা কয় গাড়ি নেয়নি”, যোগ করেন তিনি।
ধরে নিয়ে যাওয়ার দিন দুইজন অপরিচিত ব্যক্তিকে যে নৌকা নিয়ে এসেছিল তাকে চেনেন আল আমিন। তিনি বলেন, “পল্টনের বোট মাঝিটা আমাদের এলাকার পোলা। নাম মিজান শেখ।”
ঘটনার শুরু থেকে না দেখলেও হইচই শুনে ঘটনাস্থলে এসে আংশিক স্বাক্ষী হয়েছেন এমন কয়েকজনের সাথেও কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। তাদের বেশিরভাগই নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি নন।
এমন একজন সেলিনা বেগম। তার বাড়িও কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশনের কাছাকাছি।
তিনি বলেছেন, ‘‘কোস্টগার্ডের অফিস সোজাই আমাদের বাসা। যে সময় মিরাজরে এখান থেকে ধরে নিয়ে গেছে, ও সময় আমরা ঘরের ভিতরে। সবাই বলছিল, ‘‘মিরাজরে ধরে নিয়ে গেছে কোস্টগার্ডে, মিরাজরে ধরে নিয়ে গেছে কোস্টগার্ডে’’। শোনার পর আমরা সবাই দৌড়ায় বাইরে আসছি ঘর থেকে। পরে আমরা বের হতে হতে দেখি কোস্টগার্ডের পল্টনের ভিতরে ঢুকানো হয়ে গেছে। পরে সবাই দাঁড়িয়ে ছিল। ওখানে (পল্টনে) একটা কালো তেনা (কাপড়) টাঙাইয়া দিছে যেন কেউ না দেখে। নাকি কি বুঝে দিছে তারাই জানে।”
‘‘পরে এক সাইড দিয়ে একটু দেখছি, কতক্ষণ পর দেখছি একটা বোট আসছে মংলার ওদিক দিয়ে। কোস্টগার্ডের একটা বোট আসছে। তারপরে বোটটা ভিড়াইছে, ভিড়াইয়া মিরাজরে ওখান দিয়ে বের করছে। মিরাজরে হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো আমরা স্পষ্ট দেখছি। হ্যান্ডকাফ লাগানো, ও ওখান দিয়া আস্তে আস্তে পা একটু কেমন যেন খুঁড়াই খুঁড়াই ওখান দিয়া ঐ বোটে উঠছে। বোটে প্রায় ৫/৭ জন কোস্টগার্ডের লোক ছিল। কোস্টগার্ডের পোশাক পরা আমরা ওখানে দাঁড়াইয়া সবাই দেখছি। পরে এই বোটে ভইরা (তুলে) দেখছি আবার সোজা টান দিয়া আস্তে আস্তে ওখান দিয়ে সিঁড়ি তে নামাইয়া একেবারে আস্তে আস্তে গেছে।’’
প্রত্যক্ষদর্শী ৪৭ বছরের একজন পুরুষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মিরাজ সেদিন হোন্ডার থেকে নাইমে দাঁড়ালি কোস্টগার্ডের দুডো লোক ধরে ধাক্কাইতে ধাক্কাইতে নিয়ে যায়। এট্টু সামনে নিয়ে মারছে এরপর আবারো ধাক্কাইতে ধাক্কাইয়ে জেটিতে নিয়ে গেছে। সেখানে একটা বোটে তুইলা মিরাজকে পিডায়। তখন ও চিক দেওয়ার লগে লগে আরেট্টা মুখ চাইপে ধরছে। পরে আরেক বোটে নিয়ে চইলে গেল। অনেকেই দেখছে।”
এনামুল নামে আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “আমি দোকানে মিরাজের পাশে চা খাচ্ছিলাম। মিরাজ দোকানে আসছে আর স্টেশন থেকে কোস্টগার্ডের লোকেরা এসে মিরাজরে মারতে মারতে নিয়ে গেছে। হাড়বাড়িয়া স্টেশনে নিয়ে আরো মারছে। স্টেশনে তিনটা বাতি জ্বলছিলো কিন্তু তারা রুমে নিয়ে কালো কিছু পর্দা টানাই দিছে। আমরা দেখিনি কিন্তু মিরাজের চিৎকার শুনেছি। এরপর তো কোস্টগার্ডের বোট এসে ওরে নিয়ে গেছে।”
২৩ বছরের আরেক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে একই রকম বর্ণনা দেন।
মিরাজের বোন যা বললেন
মিরাজের ছোট বোন লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “১০ এপ্রিল সন্ধা ৭টার দিকে আমার ভাইয়া ঘর থেকে বের হয়। আমাদের বাড়ির কিছুটা দূরে পাঁচ থেকে সাত মিনিট হাটার দুরত্বে আল আমিন নামে এক ব্যক্তির চায়ের দোকানে যায়। সাথে ওর লাল কালারের একটি পুরাতন প্লাটিনা গাড়ি ছিল। ও গাড়িটা বাসা থেকে চালায় নিয়ে বের হয়। পরনে ছিলো একটি লুঙ্গি ও গেঞ্জি।”
মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার সময়কার কোনো ছবি বা ভিডিও আছে কিনা জানতে চাইলে মিরাজের বোন লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “ঐ সময় কয়েকজন ছবি/ ভিডিও তুলেছিলো বলে আমি জেনেছি। কিন্তু ভয়ে কেউ দিচ্ছে না। আমি কয়েকজনের কাছে অনুরোধ করেছি, পা ধরেছি কিন্তু সবাই অস্বীকার যায়। কোস্টগার্ডের লোকেরা সবাইকে হুমকি দিয়েছে, কেউ সাহস করছেনা।”

কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশন।
“মিরাজকে খাবার খেতে দাও, ওরে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হবে”
মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে যখন মারধর করে তখন আমি সেখানে ছিলাম না। নেওয়ার সময় আমি আসছি। আমি দেখছি দুইজন তাকে নিয়ে যাচ্ছে। হাড়বাড়িয়া স্টেশনে তাকে নিয়ে গিয়ে সিসির ((কন্টিনজেন্ট কমান্ডার) রুমে রাখে। ২০ মিনিট পর বাংলাদেশ কোস্টগার্ড লেখা স্পিডবোটে করে ১১/১২ জন লোক আসে। সবাই কোস্টগার্ডের পোশাক পরে ছিলো। তারপর তারা ছবি তুলে এবং হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে নিয়ে যায়।”
মুক্তা খাতুনের দেওয়া সিসির নম্বর অনুযায়ী যোগাযোগ করা হলে একজন ব্যক্তি কল রিসিভ করেন।
প্রতিবেদক প্রথম প্রশ্ন করেন, “আপনি কী মোংলা হাড়বাড়িয়া স্টেশনের সিসি কিনা?” জবাবে তিনি বলেন, “হ্যা, কে বলছেন?”
পরিচয় দিয়ে মিরাজ শেখের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, “আপনি আপনার পুরো পরিচয়, ঠিকানা আমাকে লিখে পাঠান। আর আমাদের অফিসে যোগাযোগ করেন।”
এরপর আবার তার নাম জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপ-এ তার নাম জিজ্ঞেস করে মেসেজ করা হলে কোনো উত্তর দেননি।
যারা তুলে নিয়ে গেছে বলে দেখেছেন তাদের নাম পরিচয় জানেন কিনা জানতে চাইলে মুক্তা খাতুন জানান, তিনি তাদের নাম জানেন না। তবে দেখলে চিনবেন। তারা গেঞ্জি পরা ছিলো
তবে তিনি একটি ভিডিও থেকে তাদের একজনের ছবি নিতে পেরেছেন বলে জানান। তিনি ছবিটি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে বলেন, “এই লোক আমার এবং আমার ননদকে আরেকদিন মারধর করেছিলো; যেদিন আমরা মিরাজের খোঁজ চেয়ে মানববন্ধন করেছিলাম। সেদিন আমাদের উপর হামলা করা হয়, এবং এই লোক আমাদের মারধর করে।”
তবে মুক্তা বা লিজা ইসলাম এই ব্যক্তির নাম পরিচয় জানেন না বলে জানান। পাশাপাশি ওই ভিডিওটির একটি কপি চাইলে তিনি জানান, ফেসবুকে ভিডিওটি দেখে স্ক্রিনশট নিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি সংরক্ষণ করেননি।

মিরাজের স্ত্রীর দেওয়া এক ব্যক্তির ছবি
দ্য ডিসেন্টও এই ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করতে পারেনি এবং মিরাজের ঘটনার সাথে তার কোন সংশ্লিষ্ট ছিল কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেনি।
মুক্তা খাতুন আরো বলেন, “মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার পর আমি আমার এলাকার নজরুল মেম্বারের কাছে যাই। মেম্বারের কাছে সব বলার পর তিনি সিসিকে কল দেন কিন্তু তিনি কল ধরেননি। এরপর সিসির নম্বর নিয়ে আমি কল দেই। সিসি আমাকে তখন বলে যে, মিরাজকে আমরা সন্দেহজনক হিসেবে ধরছি। ডাকাতের সোর্স। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সত্যতা পেলে মামলা দিবো নাহলে ২/৩ দিন পর ছেড়ে দিবো। আমি তখন কী তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করেছে জিজ্ঞেস করলে তিনি কোনো উত্তর দেয়নি। মিরাজকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, জিজ্ঞেস করা হলেও তিনি কোনো তথ্য দেননি।”
এ ব্যাপারে স্থানীয় মেম্বার মোঃ নাজমুল দ্য ডিসেন্টকে জানান, “আমি ঘটনার সময়ে উপস্থিত ছিলাম না। ঘটনার পর মিরাজের স্ত্রী আমাকে এসে বলেছিলো। আমি এতোটুকুই জানি। এর বেশি কিছু জানিনা।”
মুক্তা খাতুন বলেন, “তারপরের দিন আমি নিজে কোস্ট গার্ডের দিগরাজ বেইজে যাই। সেখানে গিয়ে বলি, আমার স্বামীরে তো এই জায়গায় আনা হইছে, আমি একটু দেখতে চাই। প্রথমে অস্বীকার করেছে। পরে আমি পা ধরে কান্নাকাটি করার পর উপাশীন বা উশাশীন নামে একজন যিনি বেইজের গেইটে ছিলেন তিনি তখন কাউকে ফোন দেন। মোবাইলে কথা শেষে তিনি আমাকে বলেন, আপনার স্বামীকে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হয়েছে। আপনি বিকালে আসেন, তখন দেখতে পারবেন। আমি ঐ সময় গেইটে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি তখন তাদের বলতে শুনেছি, তারা বলাবলি করছিলো, মিরাজকে খাবার খেতে দাও, ওরে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হবে।”
মিরাজকে অপারেশনে নিয়ে যাওয়া হবে এই কথা কে বলেছেন জানতে চাইলে মুক্তা খাতুন জানান, গেইটের অপর পাশ থেকে কোস্টগার্ডদের একজনকে বলতে শুনেছি। তার নাম জানিনা, নেমপ্লেট পড়তে পারিনি। তবে আমি দেখলে চিনবো।
তিনি বলেন, “এরপর আমি অপেক্ষা করতে থাকি। বিকেল ৪টা/৫টার দিকে আমি আবার যাই, তখন গেইটে আরেকজন ছিলো। আমি মিরাজের কথা জিজ্ঞেস করি। তিনি তখন কারো সাথে ফোনে কথা বলেন এবং আমাকে জানান, আপা আমরা দেশের সেবা করি। এভাবে কাউকে ধরে আনতে পারি না। মিরাজ নামের কাউকে আমরা ধরিনি।”
মিরাজের বোন লিজা ইসলাম বলেন, “এরপর আমরা আবার দিগরাজ বেজে যাই। সেখানে আমাদের সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করে। আমরা প্রতিবাদ করলে তখন আরেফিন এবং সজীব স্যার নামে দুইজন আমাদের বেজের চারতলায় নিয়ে যায়। তাদের কী পদ সেটা জানিনা, তবে আরেফিন স্যারকে অফিসের সবাই ছোটো স্যার বলে ডাকে। সেখানে আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে। আমাদের কথা শুনে। আমরা সব বলি। তখন তাদের কথা শুনে মনে হচ্ছিলো যে আমার ভাইকে তাদের কাছেই নিয়ে রেখেছে। তারা সবকিছু জানে। এক পর্যায়ে আরেফিন আমাদের বলেন, আপনারা কী জানেন যে সুন্দরবনে বন্দুক যুদ্ধে কিছু মানুষ নিহত হয়েছে? তখন আমরা বলি, এ কথা কেন বলছেন? আমার ভাইয়ে ধরে নিয়েছেন চা দোকানের সামনে থেকে, সবার সামনে থেকে। জঙ্গলে কে নিহত হয়েছে সেটা আমাকে বলছেন কেন? আর আমার ভাইকে যদি অপরাধ করে থাকে তাহলে প্রমাণ দেন। আদালত বিচার করবে, আমরা মেনে নিবো। তারপর আমি কান্না করতে করতে তাদের বলি যে, আপনারা যদি আমার ভাইকে মেরেও ফেলেন তবে আমার ভাইয়ের লাশটা যেন আমাদের দেয়া হয়। তখন তারা বলে যে, না না, আমি বলিনি যে বন্দুকযুদ্ধে আপনার ভাই নিহত হয়েছে। আমি এমনি বলেছি।”

দিগরাজ বেইজ এ ৪ তলায় একটি কক্ষের ছবি। ছবিটি দিয়েছেন মিরাজের বোন লিজা ইসলাম।
লিজা ইসলাম দিগরাজ বেজের ৪ তলায় যেখানে তাদের সাথে দুই অফিসারের কথা হয়েছে সেই রুমের একটি ছবি দ্য ডিসেন্টকে দেন।
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘আমরা স্বামীর খোঁজে মন্ত্রীর (প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম) কাছে ৬ বার গেছি। উনি আমাদের সামনে কোস্টগার্ডকে ফোন দিলে তারা জানায় কিছু জানে না। আমাদের একটাই দাবি, আমার স্বামী অপরাধী হলে সাজা দিক, কিন্তু ওরে এভাবে গুম করা কেন?’
এ ব্যাপারে জানতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মোংলা দিগরাজ বেইজের জোনাল কমান্ডার (পশ্চিম জোন) ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলামকে ফোন করা হলে প্রথমে ফোন রিসিভ করা হয়। পরিচয় জানিয়ে নিখোঁজ হওয়া মিরাজের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কিছুক্ষণ কোনো জবাব আসেনি। কয়েক মুহুর্ত পর ভিন্ন একটি কন্ঠ থেকে নতুন করে সালাম দিয়ে জানানো হয়, “ভাইয়া, আমি আপনাকে আরেকটি নাম্বার দিচ্ছি। সেখানে কথা বললে সব জানতে পারবেন।” এরপর একটি ফোন নাম্বার দিয়ে কল কেটে দেওয়া হয়।
তার দেওয়া ফোন নাম্বারে কল করা হলে প্রথম কল রিসিভ করা হয়নি। দ্বিতীয় কল রিসিভ করে পরিচয় জানিয়ে প্রশ্ন করার পর কল কেটে যায়। এরপর আর সেই ফোন নাম্বারে একাধিকবার কল করা হলেও রিসিভ করা হয়নি।
দ্য ডিসেন্ট কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।
তবে লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, “ ‘তার (মিরাজ) সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্যই নেই। নিখোঁজের যে বিষয়টি বলা হচ্ছে, এটি জিডি হবার পর আমরা থানা থেকে জানতে পেরেছি। তাঁদের (মিরাজের পরিবারের) অভিযোগের কোনো সত্যতাও আমরা খুঁজে পাইনি।’
মিরাজ আদৌ নিখোঁজ হয়েছেন কি না বা কোথায় গেছেন, সে বিষয়ে জানা নেই দাবি করে মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এখানে আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, গত ২১ তারিখে আমরা সামাদ নামের এক ডাকাতকে ধরছিলাম। সুন্দরবনের ছোট সুমন বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড সামাদ জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচজনের নাম বলে। ওই পাঁচজনের মধ্যে মিরাজের নামও ছিল। পরবর্তীতে গত ২২ এপ্রিল যৌথ বাহিনীর একটা অভিযান হয়। এ সময় আমরা ওই পাঁচজনের মধ্যে দুজনকে আটক করি। তখন মিরাজকেও খোঁজা হয়। কিন্তু সেদিন তাঁকে পাওয়া যায়নি। আর ২২ তারিখের ওই অভিযানের পর ২৩ তারিখ তাঁর পরিবার থানায় মিরাজ নিখোঁজ উল্লেখ করে জিডি করে।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘১০ তারিখে যদি নিখোঁজ হয়, ১২-১৩ দিন পর জিডি হবে? বিষয়গুলো খুবই সাসপেশিয়াস।’
জিডির প্রসঙ্গে লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “আমরা ৪ বার থানায় যাই আমাদের জিডি নেয়না। পরবর্তীতে ২৩ এপ্রিল আমাদের জিডি নেওয়া হয়। পুলিশ তখন আমাদের বলে দেখেন আমরা কী করবো, ওদের অনেক পাওয়ার।”
দ্য ডিসেন্ট জিডির নথিপত্রগুলো পর্যবেক্ষণ করে। জিডিতে মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম বাদি হয়ে লিখেছেন, “আমার স্বামী নিজ বসতবাড়ি বাসার নিচে নিজের অজান্তে হারিয়ে যায়।”
চা দোকান থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করলেও জিডিতে কেন বাসার নিচে থেকে নিজের অজান্তে লেখা হয়েছে জানতে চাইলে মুক্তা খানম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “জিডির লেখা পুলিশে লিখে দিয়েছে। এটা নিয়ে আমরা থানায় প্রতিবাদ করেছি তখন তারা বলেছে যে কোস্টগার্ডের নাম লেখা যাবেনা। এরপর বাধ্য হয়ে আমরা সাক্ষর করি।”
মোংলা সার্কেল অফিসের সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ রেফাতুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “জিডি নিতে না চাওয়ার অভিযোগটি সত্য নয়। থানায় সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। মিরাজের পরিবার ২২ তারিখে সন্ধায় এসেছিলেন, কিন্তু উনারা মামলা করবেন না জিডি করবেন সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তখন পুলিশ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরদিন আসার পরামর্শ দেওয়া হয়। জিডির ভাষার ব্যাপারে যদি বলি, অপহরণ, গুম এসব শব্দ জিডিতে লেখা যায়না। মামলা করতে হবে। আবার কোস্ট গার্ড বা আন্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া যাবেনা, সেজন্য কোর্টে বা আইনজীবির মাধ্যমে পরামর্শ নিতে বলা হয়েছিলো তাদেরকে। পরে উনারা জিডি করেন।”
জিডি করার পর মোঃ রেফাতুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তাসহ সরেজমিনে মিরাজের গ্রামে যান। তিনি দ্য ডিসেন্টকে জানান, “আমরা তদন্ত করছি। কিন্তু এখোনো তার কোনো খোঁজ পাইনি। আমরা সারাদেশে বেতার বার্তায় সকল থানাকে জানিয়েছি। তথ্য প্রযুক্তি বের করে তার সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চলছে, কিন্তু এখোনো কোনো সন্ধান পাইনি।”
এ ব্যাপারে পুলিশের মোংলা থানার অফিসার ইনচার্জ আতিকুর রহমান দ্য ডিসেন্টকে জানান, “ থানায় জিডি করা হয়েছে। আমরা তদন্ত করছি। কিন্তু বলার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি এখোনো নেই।”
পুলিশ ভিন্ন ভাষায় জিডি লিখে দিয়েছে এমন অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা সত্য নয়। এমনটা হওয়ার সুযোগ নেই।”
১৪ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ আইজি ও কোস্টগার্ডের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত আবেদন করেছেন মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খানম।
এই আবেদনে কোস্টগার্ড সদস্যদের দ্বারা তুলে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
গুমের প্রতিবাদের সময় হামলা, পন্টুনে পাল্টা হামলার অভিযোগ
নিখোঁজ মিরাজ শেখের সন্ধান চেয়ে গত ৯ জুন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্বজন ও গ্রামবাসীরা জয়মনির ঘোল এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এই কর্মসূচিকে ঘিরে কোস্টগার্ড এবং এলাকাবাসীর মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়ায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মিরাজের বোন লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “মানবন্ধন করায় কোস্টগার্ড আমার অসুস্থ মা, ভাবি এবং আমাকে লাঠিপেটা করেছে। আমাদের চুল ধরে নিচে ফেলে দিয়ে আমার অসুস্থ মাকে লাথি দিয়েছে। আমরা ভাইকে খুঁজতে গিয়েছি বলে আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে ২৭ দিন জেল খাটানো হয়েছে। তারা আমাদের রাত ৩টার সময় বাসায় এসে হুমকি দেয় যে মিরাজের মতো আমাদেরও গুম করে দেবে।’
মানবন্ধনকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পরদিন স্থানীয় কিছু ব্যক্তি কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া চেকপোস্ট ও স্টেশনে হামলা চালায়। হামলাকারীরা কোস্টগার্ডের স্পিডবোট, পন্টুন অফিস ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে কোস্টগার্ড।
তবে কোস্টগার্ড বলছে, গ্রামবাসী নয়, একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুর চালায়। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও অসাধু চক্র নিজেদের অপকর্ম পরিচালনার সুবিধার্থে সেখান থেকে কোস্টগার্ডকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে হামলা, ভাঙচুর, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া একজন স্থানীয় বাসিন্দা এবং একজন সাংবাদিক দ্য ডিসেন্টকে জানান, “মিরাজের সন্ধান দাবিতে কোস্টগার্ড বেজের (পশ্চিম জোন) সামনে গ্রামবাসী একটা মানববন্ধন করে। সেখানে কোস্টগার্ডের সদস্যরা বিনা উস্কানিতে এসে ব্যানার–ফেস্টুন কেড়ে নেয়। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের তাড়িয়ে দেয়। এরপর ১১ জুন সকালে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কোস্টগার্ডের পন্টুনে (হারবাড়িয়া স্টেশন) যান মিরাজ শেখের মা, বোন, স্ত্রী ও শাশুড়ি। সেখানে তাঁরা কোস্টগার্ড সদস্যদের কাছে মিরাজের সন্ধান চান। এ পর্যায়ে তাঁরা পন্টুনে উঠে বসে পড়েন। তখন পন্টুন থেকে নামানোর জন্য কোস্টগার্ড তাঁদের লাঠিপেটা করে। যা দেখে স্থানীয় জনতা একত্র হয়ে বোট নিয়ে পন্টুনে ওঠেন। এবং সেখানে হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় একদল লোক কোস্টগার্ডের পন্টুন ও একটি স্পিডবোটে ভাঙচুর চালান। এরপর দিগরাজ থেকে কোস্টগার্ডের অতিরিক্ত সদস্যরা এসে ফাঁকা গুলি করেন এবং জয়মনি ঠোঁটা এলাকায় ঘরে ঘরে ঢুকে লোকজনকে লাঠিপেটা করেন। এতে ২০-২৫ জন আহত হয়েছেন। কোস্টগার্ড নিখোঁজ মিরাজের মা, বোন ও স্ত্রীকে আটক করে।
ঘটনার সময় বিভিন্নজনের ধারণ করা কয়েকটি ভিডিও সংগ্রহ করেছে দ্য ডিসেন্ট। সেগেুলোতে দেখা যায়, নৌকা ও ট্রলারে করে ঝাড়ু, লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল নারী-পুরুষ কোস্টগার্ডের স্টেশনের দিকে যাচ্ছেন। একদল সেখানে উঠে ভাঙচুর করে। পাশে থাকা বাহিনীটির একটি স্পিডবোটও ভাঙতে দেখা যায়।
দ্য ডিসেন্টের হাতে আসা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, নদীর পাড়ে কোস্টগার্ড লাঠি ও বুট দিয়ে প্রকাশ্যে দুজনকে মারধর করছে। এক নারী কান্না করতে করতে সেখান থেকে তাঁদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। একজন পুলিশ সদস্যকেও তখন আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠা কোস্টগার্ড সদস্যদের নিভৃত করতে দেখা যায়।

স্থানীয়দের হামলা করতে দেখা যায়। ছবিটি দিয়েছেন ্লিজা ইসলাম।
আরেকটা ভিডিওতে দেখা যায়, কোস্টগার্ডের হামলার পরে গ্রামবাসীরা একজন আহতকে ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি ভিডিওতে দুজন গ্রামবাসীর মাথা থেকে রক্ত পড়তে দেখা যায়।

আহত একজন গ্রামবাসী। ছবিটি দিয়েছেন লিজা ইসলাম।
জেল খেটেছেন মা-স্ত্রী-বোন, মারধরেরও অভিযোগ
হাড়বাড়িয়া স্টেশনে হামলার পর ১১ জুন কোস্টগার্ডের পিও মো. শাহিনুর রহমান বাদী হয়ে মিরাজের স্ত্রী, অসুস্থ মা ও বোনসহ ৪৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩০০ জন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার মালামাল চুরি ও ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়।
এই মামলায় মিরাজের পরিবারের তিন নারীসহ ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা টানা ২৭ দিন (১২ জুন থেকে ৯ জুলাই) জেল খাটার পর জামিনে মুক্তি পান।
লিজা ইসলাম বলেন, ‘আমার বাবা প্যারালাইজড। আমরা তিন নারী ভাইকে খুঁজছি বলে আমাদের গুমের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং মিথ্যা মামলায় জেল খাটানো হয়েছে।’
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা বলেন, ‘যুদ্ধের সময়ের মতো অবস্থা! মানুষ কবরের ভেতর শুইয়া থাকে, পুরুষ বাড়িতে থাকে না। ওরা পিডন (পেটানো) দেয়।’
লিজা ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “আমাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দিয়েছে। ওরা বলেছে যে আমরা নাকি ওদেরকে হত্যা করার জন্য গিয়েছি। আমাদের কাছে নাকি ধারালো অস্ত্র ছিলো। অথচ এগুলো মিথ্যা। আমরা ওখানে একটাই কথা বলেছি যে, আমাদের মিরাজের খবর দেন। ওরা নিউজ করছে আমরা হামলা করতে গেছি। আমার ভাইকে যদি নাই নিতো তবে গ্রামবাসী কেন ঝাপায়া পড়বে আমাদের মারতে দেখে।”
তিনি আরো বলেন, “ওরা ওইখানে (হাড়বাড়িয়া স্টেশনে) মারছে। এরপর রুম বন্ধ করে আমাদের প্রচন্ড পরিমাণে মারছে। এমনকি আমাদের কাছে একটা ফোন ছিলো, যেখানে অনেক প্রমাণ ছিলো, সেই ফোনটাও ওরা কেড়ে নিয়েছে। এখন আমাদের গ্রামের যে পরিস্থিতি গ্রামে একটা মানুষ শান্তিতে থাকতে পারছেনা। শুধু আমাদের কারণে গ্রামে ওরা রাতে অভিযান চালায়। মানুষ যদি ঘরে তালা মারা থাকে সেই তালা ভেঙ্গে পিটায়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের মতো।
প্রতিবাদ করায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকির অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দা ও দৈনিক আজকের বাংলার মোংলা প্রতিনিধি শেখ তাইজুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে জানান, মিরাজের নিখোঁজ হওয়ার পর এ নিয়ে লেখালেখি করায় আমাদের ওপর নানানভাবে চাপ তৈরি করা হয়েছে। হুমকি দেওয়া হয়েছে।
যে চা দোকান থেকে মিরাজকে তুলে নেওয়া হয়েছে, সে চা দোকানদার আল আমিন বলেন, “মিরাজকে তুলে নেওয়া নিয়ে মুখ খোলায় আমার নামেও মামলা করা হয়েছে।”
দ্য ডিসেন্টকে তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা বিভিন্নভাবে হুমকি পাচ্ছেন যাতে মিরাজের নিখোঁজের ব্যাপারে কোনো কথা না বলা হয়।
মিরাজের বোন লিজা ইসলাম বলেন, “আমার ভাবি ইপিজেডে গার্মেন্টস এ কাজ করতো। ভাবি কাজ থেকে আসার পথে অনেকে ভাবিকে ফলো করতো। বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দিতো। শেষে আমার ভাবি চাকরি ছেড়ে দেন। আমাদের বাসায় গভীর রাতে এসে হুমকি দেওয়া হয়েছে বারবার। আমরা ভয়ে বাড়ি ছেড়ে আত্বগোপনে আছি। আমি ফোন বন্ধ রেখেছি, আপনি আমাকে সিমে কল দিলে পাবেন না, সিম বন্ধ করে হোয়াটসএপ চালাচ্ছি।”
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা অভিযোগ করেন, “মিরাজকে তুলে নিয়ে যেতে দেখা প্রত্যক্ষদর্শীরা রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারেনা। জঙ্গলে, কবরস্থানে রাত কাটাতে হচ্ছে।”
মিরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী?
স্থানীয় একজন সাংবাদিক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দ্য ডিসেন্টকে জানান, “স্থানীয় জলদস্যুদের সাথে মিরাজের যোগাযোগ ছিলো। এজন্য হয়তো তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছে কোস্টগার্ডের সদস্যরা।”
সুন্দরবনের স্থানীয় একজন মৎস্যজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জলদস্যু সুমনের সাথে মিরাজের ফোনে কথা হতো। সুমনের দলের একজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের ফোনে মিরাজের নাম্বার পেয়ে মিরাজকে তুলে নিয়ে গিয়েছে শুনেছি।”
তবে মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুন দ্য ডিসেন্টকে জানান, “আমার স্বামী কোনো খারাপ কাজে যুক্ত ছিলেন না। তিনি সুন্দরবনে মাছ ধরতে, কখোনো বা মধু সংগ্রহ করতে যেতেন। জঙ্গলে যাওয়ার আগে তিনি ওদের (জলদস্যুদের) ফোন করতেন কখোনো টাকা দিতে বাধ্য হতেন। কারণ অনুমতি নিয়ে না গেলে ওরা অপহরণ করতো, অনেক টাকা দাবি করতো। এতো টাকা আমরা কোথায় পাবো?”
মিরাজকে আদালতে হাজির করতে নির্দেশ হাইকোর্টের
মিরাজ শেখকে ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে আদালতে হাজির করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ১২ জুলাই রুলসহ এই আদেশ দেন।
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মুহা. মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, মিরাজকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়নি, এ বিষয়ে আদালত যাতে সন্তুষ্ট হতে পারেন, সে জন্য তাঁকে হাজির করতে এবং তাঁর অবস্থান প্রকাশ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রসচিব, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালক, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ ৯ বিবাদীকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানান রিট আবেদনকারীর এই আইনজীবী।
মিরাজকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়নি, তা নিশ্চিত করতে তাঁকে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে তাঁর বাবা মো. মোস্তফা শেখ আবেদনকারী হয়ে গত ২২ জুন রিটটি করেন।
নিরপেক্ষ তদন্ত চায় আসক
মিরাজ শেখকে গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এ অভিযোগ পাওয়ার পর একটি প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান চালিয়ে এ দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠনটি।
ঘটনাটি নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র গত ১৬ ও ১৭ মে দুই দিনব্যাপী সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান চালায়। তখন মিরাজের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি, সাংবাদিক, পুলিশ ও কোস্টগার্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন আসকের প্রতিনিধিরা।
তথ্যানুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আসক জানিয়েছে, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে সাদাপোশাকে থাকা কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি জয়মনির ঘোল এলাকার আল আমিনের চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজ শেখকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যান।
আসক অবিলম্বে মিরাজ শেখের অবস্থান নির্ণয়, তাঁর পরিবারের কাছে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ, অভিযোগের বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “ ৫ আগস্টের পর আমাদের বিশ্বাস ছিলো গুমের মতো ঘটনা আর হবে না। কিন্তু ২ বছর না যেতেই সুন্দরবনের মিরাজ শেখের ঘটনাটি ঘটলো যা অত্যন্ত হতাশাজনক। আমরা দেখেছি গুমের ঘটনার পর কোস্টগার্ডের সবাইকে বদলি করা হয়েছে। বিগত দিনের গুমের ধরণ দেখা যাচ্ছে। এটি কাম্য না।”