Online Gambling Devastates Families as 28 Suicide Deaths Are Reported in Three Years
প্রথমে ছোট অঙ্কের বাজি বা জয়ের অভিজ্ঞতা, এরপর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। একপর্যায়ে সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন কিংবা ধার করা অর্থও চলে যাচ্ছে জুয়ার প্ল্যাটফর্মে। ঋণ, সামাজিক লজ্জা ও মানসিক চাপের মধ্যে কেউ কেউ পৌঁছে যাচ্ছেন চরম সংকটে।
সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনে জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত হয়ে ঋণের পাহাড় আর পাওনাদারদের চাপ সইতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন অনেকেই। শুধু সহজে ও দ্রুত টাকা আয়ের প্রলোভনে পড়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, কৃষক, দিনমজুর, প্রবাসী, এমনকি সরকারি চাকরিজীবীরাও।
গত ১৯ জুলাই গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় জাবেদ আলী নামে ৫৫ বছর বয়সী এক ভ্যানচালকের মৃত্যু হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন জুয়ায় যুক্ত ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। মৃত্যুর আগের রাতেও জুয়ায় অর্থ হারিয়েছিলেন তিনি। ঋণের ভার ও আর্থিক চাপ সইতে না পেরে নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
দ্য ডিসেন্ট অনলাইনে সার্চ করে গত ৩ বছরে জুয়ার কারণে আত্মহত্যা করার ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত ২৮টি সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত ৩ বছরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অনলাইনে জুয়া খেলা সংক্রান্ত কারণে অন্তত ২৮ টি আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কীওয়ার্ড সার্চের সীমাবদ্ধতার কারণে বা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত না হওয়ার কারণে আরও অনেক ঘটনা এই হিসাবের বাইরে থাকতে পারে।
এছাড়া এই ২৮ টি ঘটনার বাইরে আরও ৫টি সংবাদ পাওয়া গেছে, যেখানে অনলাইন জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে অন্তত ছয়টি হত্যাকাণ্ড এবং স্বামীর জুয়া খেলার কারণে পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীর আত্মহত্যার একটি ঘটনা ঘটেছে।
নিহতদের বয়স, পেশা ও জেলার চিত্র
সংবাদ প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৬ থেকে ৩০ এবং ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি।
পেশার হিসাবে সবচেয়ে বেশি ছয়জন ছিলেন বেকার। চাকরিজীবী ও শ্রমিক ছিলেন পাঁচজন করে। ব্যবসায়ী চারজন এবং কৃষক তিনজন। এ ছাড়া একজন করে শিক্ষার্থী, প্রবাসী, আইনজীবী, রিকশাচালক ও ফটোগ্রাফারের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি চারটি ঘটনা পাওয়া গেছে ঠাকুরগাঁওয়ে। চট্টগ্রামে পাওয়া গেছে তিনটি। ঢাকা, গাইবান্ধা, রংপুর ও রাজশাহীতে দুটি করে ঘটনা পাওয়া গেছে। জয়পুরহাট, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ঝিনাইদহ, যশোর, টাঙ্গাইল, নাটোর, নীলফামারী, খুলনা, পঞ্চগড়, মৌলভীবাজার ও পিরোজপুরে একটি করে ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, অনলাইন জুয়া কোনো নির্দিষ্ট পেশা, বয়স কিংবা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণ থেকে শুরু করে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, প্রবাসী এবং চাকরিজীবীরাও এর আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
প্রথমে ছোট বাজি, পরে ঋণের ফাঁদ
অনলাইন জুয়া হলো ইন্টারনেটভিত্তিক এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে ঘরে বসেই বিভিন্ন খেলা বা ক্যাসিনো গেমে টাকার বিনিময়ে বাজি ধরা যায়। সাধারণত ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন অননুমোদিত আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপে নাম, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে এই কার্যক্রমে যুক্ত হন।
কীভাবে অনলাইন জুয়ার আসক্তি তৈরি হয় এবং বারবার অর্থ হারানোর পরও কেন একজন মানুষ জুয়া চালিয়ে যান—তা জানতে নিহতদের পরিবার ও প্রতিবেশী, বর্তমানে জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, মনোবিজ্ঞানী এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট।
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে রতন চন্দ্র দেবনাথ নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়। তার প্রতিবেশী বিপ্লব সরকার জানান, স্মার্টফোন ব্যবহার শুরু করার পর স্থানীয় কয়েকজনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে রতনের পরিচয় হয়। শুরুতে কখনো কখনো অল্প টাকা জিতলেও অধিকাংশ সময় তিনি হারতেন। ধীরে ধীরে দোকানের আয়ও জুয়ায় চলে যেতে থাকে।
ঋণ সামাল দিতে তার মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা বিভিন্ন সময় ধার করে ১০ হাজার, ২০ হাজার কিংবা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জোগাড় করেছেন। পরিবার তাকে বারবার জুয়া থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করলেও তিনি বের হতে পারেননি বলে জানান বিপ্লব।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন এক পান ব্যবসায়ী কিছু সময়ের জন্য প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা রতনের দোকানে রেখে যান। সেই অর্থ জুয়ায় হারানোর পর রতন চরম মানসিক চাপে পড়েন। আগে ছোট অঙ্কের ঋণ পরিশোধে পরিবার সহযোগিতা করলেও এত বড় অঙ্কের টাকা জোগাড় করা সম্ভব হবে না—এমন আশঙ্কা তার মধ্যে তৈরি হয়েছিল বলে পরিবারের ধারণা।
রতন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার স্ত্রী ও একটি ছোট সন্তান রয়েছে। তার মৃত্যুর পর পরিবারটি আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় নাহিদ রানা নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়। তিনি একটি সিগারেট কোম্পানিতে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তার প্রতিবেশী ওয়াহেদ আলী জানান, চাকরির পাশাপাশি গোপনে অনলাইন জুয়ায় যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন নাহিদ। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত অর্থের পাশাপাশি কোম্পানির বিক্রির টাকাও জুয়ায় হারান এবং বাবার কাছ থেকেও অর্থ নেন।
নাহিদের বাবা সাদেকুল ইসলাম বলেন, তার ছেলে যে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েছেন, তা পরিবার আগে জানত না। কোম্পানির লোকজন পাওনা অর্থের খোঁজে বাড়িতে আসার পর তারা প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন।
“জুয়া খেলার বিষয়টা আমরা জানতাম না। জানলে অবশ্যই নিষেধ করতাম, বাধা দিতাম,” বলেন তিনি।
অনলাইন জুয়ার বিষয়টি পরিবার থেকে গোপন রাখার একই প্রবণতা পাওয়া গেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মারা যাওয়া তমাল রায়ের ক্ষেত্রেও। তার ভাই শিমুল রায় জানান, মৃত্যুর আগে তমাল কখনো পরিবার কিংবা স্বজনদের কাছে জুয়া খেলার কথা বলেননি।
“আগে কিছুই জানতাম না। কোনো কিছু শেয়ারও করেনি। করলে হয়তো আমরা বুঝতে পারতাম,” বলেন শিমুল।
তিনি জানান, মৃত্যুর প্রায় দেড় ঘণ্টা আগেও ভাইয়ের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়েছিল। সে সময় তমালের আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা বুঝতে পারেননি তিনি। মৃত্যুর পর পুলিশের উদ্ধার করা একটি নোটের মাধ্যমে পরিবার তার অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা জানতে পারে।
জুয়ার আসক্তিতে বিপর্যস্ত পরিবার
বর্তমানে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত কয়েকজনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করেছিল দ্য ডিসেন্ট। তারা কথা বলতে রাজি না হওয়ায় তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। পরিচয় প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় তাদের নাম উল্লেখ করা হলো না।
কক্সবাজারের একটি পরিবারের এক সদস্য জানান, তার ছোট ভাই এইচএসসি পাস করার পর চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ী হিসেবে পরিচিত ওই তরুণ কয়েক বছরের চাকরিজীবনে আট থেকে দশ লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। পরিবারকে নিয়মিত অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি স্থায়ী আমানত ও মাসিক সঞ্চয় হিসাবেও টাকা রাখতেন।
বন্ধুদের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। প্রথমে ৫০০ কিংবা এক হাজার টাকা করে বাজি ধরতেন। পরে একে একে স্থায়ী আমানত ও অন্যান্য সঞ্চয় ভেঙে জুয়ায় অর্থ ঢালতে থাকেন।
পরিবারের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে প্রায় ২০ লাখ টাকা হারিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে শুধু দুই মাসেই হারিয়েছেন প্রায় চার লাখ টাকা। বিভিন্ন অজুহাতে পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া এক লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং গাড়ি বিক্রি করে পাওয়া প্রায় দুই লাখ টাকাও অল্প সময়ের মধ্যে জুয়ায় হারিয়েছেন বলে দাবি পরিবারের।
পরিবারের ওই সদস্য বলেন, “সে নিজেও জানে, এভাবে চললে তার ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাবে। তবু নিজেকে থামাতে পারে না। একবার বড় অঙ্কের টাকা জিতলে মনে করে, আবারও জিতবে। সেই আশাতেই বারবার খেলতে থাকে।”
একপর্যায়ে ওই তরুণের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তাও তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি। এরপর পরিবার তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। বর্তমানে তাকে একা থাকতে দেওয়া হচ্ছে না এবং স্মার্টফোন ব্যবহারও সীমিত করা হয়েছে।
“এই আসক্তি শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো পরিবারকে বিপর্যস্ত করে দেয়। আমাদের পরিবারের সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। মা-বাবাও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন,” বলেন পরিবারের ওই সদস্য।
কক্সবাজারের আরেকটি পরিবারের এক তরুণ প্রায় দুই বছর ধরে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত বলে জানিয়েছেন তার মালয়েশিয়াপ্রবাসী বড় ভাই। একসময় পারিবারিক মুদি দোকান ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন তিনি। স্থানীয় কয়েকজন দোকানে টাকা লেনদেন করতে এসে অনলাইন জুয়া খেলতেন। তাদের দেখেই প্রথমে আগ্রহী হন তিনি।
২০২৩ সালের শেষ দিকে অল্প অঙ্কের টাকা দিয়ে জুয়া শুরু করলেও পরে ব্যবসার মূলধন ব্যবহার করতে থাকেন। একপর্যায়ে গ্রাহকদের লেনদেনের টাকাও ফেরত দিতে না পারায় পরিবার বিষয়টি জানতে পারে।
বড় ভাই বলেন, “তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তাকে আবার ব্যবসায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু দুই মাসের মধ্যে সেই টাকাও শেষ করে দিয়েছে।”
পরিবারের হিসাবে, তিনি অন্তত সাত থেকে আট লাখ টাকা হারিয়েছেন। তবে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। ব্যবসার টাকা শেষ হওয়ার পর আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তিনি ধার নিয়েছেন বলে দাবি পরিবারের।
তাকে বুঝিয়ে, নজরদারিতে রেখে এবং নতুন করে ব্যবসায় ফেরানোর চেষ্টা করেও জুয়া থেকে দূরে রাখা যায়নি। পরিবারের দাবি, কিছুদিন বিরত থাকার পর হাতে টাকা এলেই তিনি আবার জুয়ায় ফিরেছেন।
“প্রথমে অন্যদের জিততে দেখে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পরে খেলতে খেলতে এমন পর্যায়ে গেছে যে ব্যবসা ও পরিবার—দুটিই প্রায় শেষ,” বলেন তার বড় ভাই।
যেভাবে তৈরি হয় আসক্তি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান বলেন, অনলাইন জুয়া শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একধরনের আচরণগত আসক্তিতে পরিণত হতে পারে। জেতার অনিশ্চিত সম্ভাবনা মস্তিষ্কের পুরস্কারব্যবস্থাকে উদ্দীপিত করে। ফলে কখন পুরস্কার পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত না হলেও ব্যক্তি বারবার খেলার তাগিদ অনুভব করেন।
প্রথম দিকে ছোট অঙ্কের জয় একজন ব্যবহারকারীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। পরে অর্থ হারালে সেই ক্ষতি পুনরুদ্ধারের আশায় তিনি আরও বড় অঙ্কের বাজি ধরেন। জুয়ার আসক্তি নিয়ে গবেষণায় এই আচরণকে ‘চেজিং লস’ বা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বলা হয়।
সৈয়দ তানভীর রহমান বলেন, আর্থিক সংকট, ঋণের চাপ, সামাজিক লজ্জা, অপরাধবোধ এবং নিজেকে পরিবারের জন্য বোঝা মনে করার অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। অনেকেই জুয়া এবং ঋণের বিষয়টি পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে গোপন রাখেন। ফলে সংকট সম্পর্কে অন্যরা জানার আগেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, অনলাইন জুয়া এখন বহুমাত্রিক ডিজিটাল ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। অনলাইন ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং, র্যান্ডম নম্বর বা ড্রভিত্তিক খেলা এবং বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে যেকোনো স্থান থেকে এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা যায়। বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট, স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের সুযোগও রয়েছে। এই সহজলভ্যতা জুয়ার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তুলেছে।
এসব প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীরা ক্রিকেট ও ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলায় বাজি ধরার পাশাপাশি স্লট, রুলেট, পোকার ও লাইভ ক্যাসিনোর মতো খেলায় অংশ নেন। বাজিতে জেতা অর্থ প্রথমে ব্যবহারকারীর ভার্চ্যুয়াল হিসাবে যোগ হয়। প্ল্যাটফর্মের নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে সেই অর্থ নগদ হিসেবে তোলার সুযোগ দেওয়া হয়।
সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং শুরুতে ছোট অঙ্কের জয়ের অভিজ্ঞতা অনেককে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। পরে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যক্তি ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে আর্থিক ভারসাম্য হারান।
কী বলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অনলাইন জুয়া-সংক্রান্ত মোট ৩টি মামলা তদন্ত করেছে সংস্থাটির সাইবার টিম। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত অভিযানে অনলাইন জুয়া চক্রের সক্রিয় সদস্য, পরিচালনায় জড়িত ব্যক্তি এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনে সহায়তাকারীসহ মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে সিআইডি জানিয়েছে, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ও অপরাধের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা মূলত স্থানীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ের এজেন্ট এবং অবৈধ আর্থিক লেনদনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিলেন। তবে চক্রগুলোর মূল হোতা বা মাস্টারমাইন্ড শনাক্তের কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান দ্য ডিসেন্টকে জানান, অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে সংস্থাটির সাইবার পুলিশ সেন্টারে ২৪ ঘণ্টা সাইবার পেট্রোলিং পরিচালিত হচ্ছে। এই পেট্রোলিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য হলো অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী ওয়েবসাইট ও প্ল্যাটফর্ম শনাক্ত করা এবং সেগুলো বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, "এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে বেশ কিছু সফলতা পেয়েছি। একাধিক মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অনেকগুলো জুয়ার সাইট শনাক্ত করে বন্ধ করা হয়েছে।"
তবে অনলাইন জুয়ার বিস্তারের তুলনায় বিদ্যমান সক্ষমতা এখনও অপর্যাপ্ত বলে স্বীকার করেন তিনি। তার ভাষায়, "অনলাইন জুয়া অনেকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। সীমিত জনবল ও সক্ষমতার মধ্যেই আমরা কাজ করছি।"
তিনি আরও বলেন, সাইবার পেট্রোলিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জনবল ও অবকাঠামো বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। "পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও সক্ষমতা বাড়লে অনলাইন জুয়াকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।"
নতুন আইনে কী আছে
গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬ পাস হয়। পরবর্তী সময়ে এটি জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ হিসেবে কার্যকর হয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে প্রায় ১৫৯ বছরের পুরোনো প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
নতুন আইনে প্রচলিত জুয়ার পাশাপাশি অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল বেটিং, ভার্চ্যুয়াল ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া, ডিজিটাল ওয়ালেট ও দূরবর্তী বেটিংকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
জুয়ার উদ্দেশ্যে অর্থ লেনদেন, বিদেশি অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা, ভুয়া মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসাব বা ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার, জুয়ার বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা এবং ম্যাচ বা স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য আলাদা শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের মাত্রাও আলাদা।
তবে বিশেষজ্ঞ সৈয়দ জাহিদ হোসেন মনে করেন, শুধু আইন কিংবা প্রযুক্তি দিয়ে অনলাইন জুয়া পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। একটি ওয়েবসাইট বন্ধ করা হলে বিকল্প ডোমেইন, ভিপিএন, প্রক্সি কিংবা মিরর সাইট ব্যবহার করে আবার কার্যক্রম চালানোর সুযোগ থাকে।
তার মতে, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে ধারাবাহিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সন্দেহজনক অর্থ লেনদেন শনাক্ত করতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকগুলোর নজরদারিও বাড়ানো প্রয়োজন।
মনোবিজ্ঞানী সৈয়দ তানভীর রহমান বলেন, অনলাইন জুয়াকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে পরিস্থিতির একটি অংশ আড়ালে থেকে যাবে। এটিকে জনস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তার মতে, জুয়ার প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে হবে। পরিবারকে সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করা এবং সংকটে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে।