Claim of Sex With a Goat Misrepresents Allegation of Possessing Bestiality Videos
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় প্রাণীর সঙ্গে যৌন কর্মকাণ্ডের ছবি বা ভিডিও ধারণ, বিতরণ বা সংরক্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন এক বাংলাদেশি শিক্ষক। তার নাম রাইয়ান আবদুল বাতেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার সহকারী অধ্যাপক।
বাংলাদেশি এই শিক্ষককে গ্রেফতারের পর এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে বাংলাদেশি বেশকিছু সংবাদমাধ্যম। এসব প্রতিবেদনের শিরোনামে দাবি করা হয়েছে, ‘ছাগলের সঙ্গে যৌন কর্মকাণ্ড’ বা ‘যৌনাচার’ এর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে ওই শিক্ষককে।
প্রতিবেদনগুলোতে তাকে ‘সাবেক শিবির নেতা’ ও ‘জামায়াত সমর্থক’ শিক্ষক বলেও দাবি করা হয়েছে।
চ্যানেল ওয়ান ও মোহনা টিভি রাইয়ান বাতেনের ছবি যুক্ত করে ছবির শিরোনামে লিখেছে, “যুক্তরাষ্ট্রে ছাগলের সঙ্গে যৌনাচার, গ্রেপ্তার সাবেক শিবির নেতা বাতেন!”
কালের কণ্ঠ শিরোনামে লিখেছে, “যুক্তরাষ্ট্রে ছাগলের সঙ্গে যৌনাচার গ্রেপ্তার সাবেক শিবির নেতা বাতেন!”
বাংলানিউজ২৪ শিরোনাম করেছে, “যুক্তরাষ্ট্রে ছাগলের সঙ্গে যৌন বিকৃত কর্মকাণ্ড, সাবেক শিবির নেতা গ্রেপ্তার”
ঢাকা পেপারস এক ফটোকার্ডের শিরোনামে লিখেছে, “যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণীর সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার, সাবেক শিবির নেতা গ্রেপ্তার”
ওই কার্ডে ঢাকা পেপারস লিখেছে, “যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লোরিডায় প্রাণীর সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার এবং সেসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও ধারণের মতো গুরুতর ও অস্বাভাবিক অভিযোগে রাইয়ান আবদুল বাতেন নামে এক বাংলাদেশি শিক্ষক ও সাবেক শিবির নেতা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ২৮ অক্টোবর ফ্লোরিডার হিলসবরো কাউন্টি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।”
প্রবাস থেকে পরিচালিত একাধিক অনলাইন পোর্টালেও তাকে ‘জামায়াত সমর্থক’ ও ‘সাবেক শিবির নেতা’ উল্লেখ করে ‘ছাগলের সঙ্গে যৌনাচারের’ দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে শিরোনাম ও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
এমন কিছু প্রতিবেদন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে,
এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একই দাবিতে অনেকেই পোস্ট করেছেন।
মোহনা টিভির ফটোকার্ড শেয়ার করে বিএনপিন্থী এক্টিভিস্ট মারুফ মল্লিক লিখেছেন, “আমার ধারণা ছিল এটা মিথ্যে টকিং। কিন্তু না। মানুষের এতটা অধঃপতন কিভাবে হয়! কোনোকিছুই বাদ দিচ্ছে না জাশির লোকজন”
Sheela Mostaf নামে একজন লিখেছেন, “বুয়েটের এই প্রাক্তন ছাত্র এবং ফ্লরিডার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ছাগলের সাথে যৌনকর্ম করে ধরা পড়েছে।”
Jesmin R Mohona লিখেছেন জুলাইয়ের লাল বদর বুয়েটের সাবেক শিবির কর্মী আব্দুল বাতেন যুক্তরাষ্ট্রে পশুর সাথে যৌনচারে লিপ্ত হওয়ার ঘটনায় তার পাসপোর্ট জব্দ করেছে পুলিশ।
এছাড়াও পাপেট তন্ত্র, ইসলাম টিভি, Barta Bazar, Bdmorning এবং Awaz News পেজ থেকেও একই দাবিতে পোস্ট করা হয়েছে।
রাইয়ান বাতেনের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে দ্য ডকুমেন্ট ও জিলাইভ২৪-এর প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার ‘সাবেক সহপাঠীদের’ বরাতে দাবি করা হয়, বুয়েটে অধ্যয়নকালে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি ও তাঁর স্ত্রী জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সমর্থক।
অন্যদিকে বাংলা টাইমস ৩৬০ লিখেছে, “তার ফেসবুক আইডি থেকে জানা যায় সে বাংলাদেশে ২০২৪ এর ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে প্রতিনিয়ত উৎসাহ প্রধান করেছিলো।”
তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, রাইয়ান আবদুল বাতেন ‘ছাগলের সঙ্গে যৌন কর্মকাণ্ড’ বা ‘যৌনাচার’ এর অভিযোগে গ্রেফতার হননি। প্রাণীর সঙ্গে যৌন কর্মকাণ্ডের ছবি বা ভিডিও ধারণ, বিতরণ বা সংরক্ষণের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
অন্যদিকে রাইয়ানের ‘শিবির নেতা’ হওয়ার দাবিটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দ্য ডিসেন্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের Clerk of the Circuit Court & County Comptroller (সার্কিট কোর্টের ক্লার্ক ও কাউন্টি কম্পট্রোলার) এর ওয়েবসাইট থেকে রাইয়ান আবদুল বাতেনকে গ্রেফতার সংক্রান্ত ১০টি নথি সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেছে।
নথিতে অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট লেখা আছে, FILM, DISTRIBUTE, OR POSSESS IMAGE OR VIDEO OF SEXUAL ACTIVITY WITH AN ANIMAL (ANIM6041).
অর্থাৎ তাকে ‘প্রাণীর সঙ্গে যৌন কার্যকলাপের ছবি/ভিডিও ধারণ, বিতরণ বা সংরক্ষণ’ এর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
নথির কোথাও তিনি ‘ছাগলের সাথে যৌনাচারে’ লিপ্ত হয়েছেন বলে উল্লেখ নেই।
ড্রপবক্সের তথ্য থেকে গ্রেফতার হন বাতেন
সার্কিট কোর্টের ক্লার্ক ও কাউন্টি কম্পট্রোলারের Criminal Report Affidavit এর তথ্য অনুযায়ী, ড্রপবক্সের একটি অ্যাকাউন্টে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক উপাদান (CSAM) শনাক্ত হওয়ার পর ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেনের (NCMEC) কাছে সাইবার টিপ নম্বর (255726211) পাঠায় প্রতিষ্ঠানটি।
ড্রপবক্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ জুন ১৬টা ১৬ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড UTC সময়ে 47.200.20.147 আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করে অ্যাকাউন্টটিতে একটি ভিডিও আপলোড করা হয়।
নথিতে তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, ২৪ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওটিতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং মধ্যপ্রাচ্যীয় বংশোদ্ভূত একটি শিশুকে দেখা যায়।
কর্মকর্তার বর্ণনা অনুযায়ী, শিশুটির শারীরিক গঠন, অপরিপক্বতা ও শিশুসুলভ মুখাবয়বের ভিত্তিতে তাকে শিশু বলে শনাক্ত করা হয়েছে। ভিডিওটিতে শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতনের দৃশ্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নথিতে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে তালিকাভুক্ত অভিযোগ কেবল প্রাণী বিষয়ক কন্টেন্ট সংরক্ষণ সংক্রান্ত।
নথিতে লেখা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট আইপি অ্যাড্রেসটি Frontier Communications-এর মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত ঠিকানা ছিল 10420 McKinley Dr. Apt 7301, Tampa, FL 33612। ওই ইন্টারনেট সংযোগের অ্যাকাউন্টধারী হিসেবে বাতেনের নাম পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা ওই ড্রপবক্স অ্যাকাউন্ট তল্লাশির জন্য সার্চ ওয়ারেন্ট তৈরি করেন। বিচারক Leslie Schultz-Kin ওয়ারেন্টটি পর্যালোচনা করে স্বাক্ষর করার পর ড্রপবক্সের অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে তা পাঠানো হয়। ১৫ অক্টোবর ড্রপবক্স ছয়টি জিপ ফোল্ডারে মোট ৩৮৪ গিগাবাইট তথ্য সরবরাহ করে। পরে Axiom সফটওয়্যারের মাধ্যমে ফোল্ডারগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।
২২ অক্টোবর ড্রপবক্স থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনার সময় তদন্ত কর্মকর্তা পশুর সঙ্গে যৌনাচারসংক্রান্ত ১৩টি ফাইল শনাক্ত করেন। এর মধ্যে একটি ২৮ মিনিটের ভিডিওতে বিভিন্ন নারীকে বিভিন্ন কুকুরের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে দেখা যায় বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফাইলটিকে ফ্লোরিডার আইনবিরোধী বলে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া ফাইলগুলোতে বাতেনের সেলফি এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (USF) অধ্যাপক হিসেবে তার কাজসংক্রান্ত নথিপত্র পাওয়া যায়। পাশাপাশি হাজার হাজার প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফি-সংক্রান্ত ফাইলও শনাক্ত করা হয়।
গত ২৮ অক্টোবর CSAM ও পশুর সঙ্গে যৌনাচারসংক্রান্ত ফাইলের সন্ধানে ওই শিক্ষকের বাসায় সার্চ ওয়ারেন্ট কার্যকর করা হয় ও একইদিন সকাল ৯টা ৩৪ মিনিটে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নথি অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে ওই শিক্ষক ড্রপবক্স অ্যাকাউন্টটি তার বলে স্বীকার করেন। তবে CSAM-সংবলিত ফাইলটি ভুলবশত ডাউনলোড করেছিলেন বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, পশুর সঙ্গে যৌনাচারসংক্রান্ত ফাইলগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ডাউনলোড করার কথা তিনি স্বীকার করেন বলে উল্লেখ রয়েছে নথিতে। দুটি ভিডিওর স্ক্রিনশট তাকে দেখানো হলে তিনি সেগুলো নিজের বলে শনাক্ত করেন। নথি অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদে বাতেন আরও জানান, প্রাণীর সঙ্গে যৌনাচার তার যৌন পছন্দ বা প্রবণতার (Kink) অংশ।
ফ্লোরিডার ডিপার্টমেন্ট অব হাইওয়ে সেফটি অ্যান্ড মোটর ভেহিকেলসে সংরক্ষিত ছবির মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছিল।
যেভাবে ছড়ায় ‘ছাগলের সাথে যৌনাচার’ এর দাবি
গত ৩ নভেম্বর আওয়ামীপন্থী এক্টিভিস্ট ডেভিড আরিফ এক পোস্টে দাবি করেন তারাই বাংলাদেশ এক্সপোজ নামক একটি পেইজ থেকে সর্বপ্রথম নিউজটি বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছান।
তিনি লিখেন, “সর্ব-প্রথম এই নিউজটি Bangladesh Expose থেকে করা এই নিউজ যেসব জায়গায় পৌঁছানো হয়েছে সেসব জায়গায় থেকে ভাল রেসপন্স আসছে এটাই সফলতা আমাদের”
৩ নভেম্বর বাংলাদেশ এক্সপোজ নামক পেইজে নিউজ আকারে একটি ফটোকার্ড পাওয়া যায়, যেখানে শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, “ছাগল বলাৎকারের দায়ে জামায়াত পন্থী ও জুলাই ষড়যন্ত্রকারী প্রফেসর রায়য়ান আব্দুল বাতেন’কে গ্রেফতার করেন ফ্লোরিডা পুলিশ”
ওই প্রতিবেদনের শুরুতে লেখা হয়েছে, “যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে প্রাণীর সঙ্গে যৌ*ন কর্মকাণ্ডের ভিডিও ধারণ ও সংরক্ষণের অভিযোগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া রাইয়ান আবদুল বাতেন (৩২) ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।”
এই পোস্টের পর বাংলাদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসে ঘটিনাটি। এবং ঘটে তথ্যের বিকৃতিও।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ এক্সপোজ নামক ফেসবুক পেইজটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নানা কর্মকাণ্ড ও প্রোপাগাণ্ডা প্রচার করে।