Indian Media Make False, Misleading Claims About Dhaka’s Waste-to-Energy Project
ভারতীয় কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ‘ভারতকে শিক্ষা’ দিতে ১২৭% বেশি খরচে চীন থেকে বিদ্যুৎ কিনছে বর্তমান সরকার।
গত ৩ সেপ্টেম্বর দৈনিক আনন্দবাজারে “আধ পয়সা বেশি চাইতেই অগ্নিশর্মা, ভারতকে ‘শিক্ষা’ দিতে ১২৭% বেশি খরচে চিনা বিদ্যুৎ কিনছে ‘বুদ্ধিমান’ বাংলাদেশ!” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “ভারত বিরোধিতার নামে নিজের পায়েই কুড়ুল! বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে ফুটে উঠছে সেই চিহ্ন। নয়াদিল্লিকে বাদ দিয়ে সম্প্রতি চিনা বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ঢাকা। এর খেসারত হিসাবে ইউনিটপ্রতি ১২৭ শতাংশ বেশি খরচ করতে হবে পদ্মাপারের বাসিন্দাদের। যদিও বিষয়টিকে পাত্তা না দেওয়ার ভাব দেখাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার।”
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “চলতি বছরের অগস্টে তাতে ইউনিটপ্রতি ০.০১ রুপি চার্জ চাপায় নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশন (সিইআরসি)। ফলে বেলাগাম মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ঢাকা। এর পরই বিদ্যুতের এসএনএ চার্জ কমাতে ভারতকে অনুরোধ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। পদ্মাপারের আর্থিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে তাদের প্রস্তাব মেনে নেয় নয়াদিল্লি। রাতারাতি অর্ধেক কমানো হয় চার্জ। ফলে বর্তমানে ইউনিটপ্রতি ০.০০৫ রুপিতে নেমে এসেছে সেটি। কিন্তু, তা সত্ত্বেও এ দেশের থেকে মুখ ঘুরিয়ে চিনা বিদ্যুৎ কেনায় সিলমোহর দিয়েছে তারেক রহমানের সরকার।”
১ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়া টুডে-তে “Bangladesh protests India's Rs 0.01 hike, eyes 127% costlier Chinese power. Here's why” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংক্রান্ত নীতিতে এক চমকপ্রদ বৈপরীত্য ফুটে উঠছে। আন্তর্জাতিক বিদ্যুৎ লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য ভারতের প্রস্তাবিত প্রতি ইউনিটে ০.০১ রুপি চার্জ নিয়ে ঢাকা আপত্তি জানানোর (যা দিল্লি পরবর্তীতে কমিয়ে ০.০০৫ রুপি করেছিল) মাত্র কয়েক দিন পরই, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বর্জ্য থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের জন্য একটি চীনা কোম্পানিকে প্রতি ইউনিটে ২৫ টাকা দিতে প্রস্তুত হচ্ছে।”
এছাড়াও ২ সেপ্টেম্বর হিন্দুস্থান টাইমস বাংলায় “ভারত আধা পয়সা চার্জ করায় রাগ! দ্বিগুণেরও বেশি দামে চিনা বিদ্যুৎ কিনতে অবশ্য সমস্যা নেই বাংলাদেশের।” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব দুই দেশের নানা ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রেও সেই চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ভারত থেকে তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ চিনের একটি সংস্থার কাছ থেকে অনেক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে রাজি হয়েছে।”
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। জানা গিয়েছে, চিনা সংস্থার একটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরির প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ কিনতে প্রতি ইউনিটে ২৫ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অথচ ২০২৫-২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১১ টাকা খরচ হত। অর্থাৎ চিনা প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম ভারতের তুলনায় প্রায় ১২৭ শতাংশ বেশি।”
এসব প্রতিবেদনে দু’টি দাবি করা হয়েছে।
এক. ঢাকার আমিনবাজারে চীনা কোম্পানীর সাথে করা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের চুক্তিটি করা হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে।
দুই. ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি চার্জ ০.০১ রুপি বৃ্দ্ধি করায় ‘ভারতকে শিক্ষা’ দিতে চীন থেকে ১২৭% বেশি খরচে বিদ্যুৎ কিনছে সরকার।
প্রথম দাবিটি যাচাই করে দেখা যায়, দাবিটি সত্য নয়। বর্তমান সরকারের আমলে নয়, চুক্তিটি করা হয়েছিলো ২০২১ সালে, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।
২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “সরকার আমিনবাজারে বর্জ্য পোড়ানোর মাধ্যমে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যেহেতু এ পদ্ধতি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়।”প্রতিবেদনে বলা হয়, “বর্জ্য পোড়ানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইনসিনারেশন পদ্ধতি বাংলাদেশে জাপান ও ইউরোপের পদ্ধতির চেয়ে সবচেয়ে ভালো,”
রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ কথা বলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।”
এছাড়া ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে আরো দাবি করা হয়েছে, ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ০.০১ রুপি চার্জ বৃ্দ্ধি করায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়ে চীন থেকে ১২৭% বেশি খরচে বিদ্যুৎ কিনছে।
কিন্তু যাচাই করে দেখা যায়, দাবিটি বিভ্রান্তিকর। চীনা প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সাথে এর কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি।
গত ২৭ আগস্ট বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “ঢাকার আমিনবাজারের ল্যান্ডফিলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কাজ করছে চীনা কোম্পানি। প্রকল্পটি চালু হলে বর্জ্য থেকে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ২৫ টাকা প্রতি ইউনিট দরে এই বিদ্যুৎ কিনবে সরকার।”
প্রকল্পটির বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, “খরচটা একটু বেশি হবে, কিন্তু আমাদের লাভটা অন্য জায়গায় আছে। আমরা তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনবো প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে। এটা এমনিতে মনে হচ্ছে অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের লাভটা হচ্ছে অন্য জায়গায়। আমাদের ময়লা আবর্জনাগুলো তো তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং সেখানে যে ময়লা আবর্জনা ওয়েস্ট থাকছে, সেখান থেকে জৈব সার হচ্ছে। তারা ল্যান্ডফিল ব্যবহার করবে, এটার জন্য তারা সিটি করপোরেশনকে মাসিক একটা ভাড়া দেবে এবং এই জায়গায় বাংলাদেশ সরকারের বিন্দুমাত্র কোনও ইনভেস্ট করতে হচ্ছে না। ময়লা আবর্জনা আমাদের একটা বড় বোঝা—এই জাতির জন্যে, ঢাকা শহরের জন্যে। তো এখান থেকে যদি তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আমাদের ফ্রি দেয় এবং মূল্যটা বেশি মনে হচ্ছে, কিন্তু পরিবেশের দিক বিবেচনা করলে আমাদের ওই খরচটা আবার অন্যভাবে চলে আসবে।’’
অর্থাৎ, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।