Media Spread Misleading Reports of Nationwide ‘High Alert’ Over Bomb Attack Threats
গতকাল শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাতে ‘বোমা হামলার শঙ্কায় দেশজুড়ে পুলিশের সতর্কতা জারি’—এমন শিরোনামে খবর প্রকাশ করে দেশের একাধিক মূলধারার সংবাদমাধ্যম। খবরে দাবি করা হয়, বোমা হামলার আশঙ্কায় দেশের সব জেলা ও রেঞ্জে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘হাই অ্যালার্ট’ জারি করেছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।
তবে সত্যিই এমন কোনো সতর্কতা জারি করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং পুলিশের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যম পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার কাছ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার দাবি করলেও দ্য ডিসেন্টকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি এ ধরনের কোনো ‘হাই অ্যালার্ট’ বা বোমা হামলার সুনির্দিষ্ট হুমকিসংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়নি। পুলিশ সদর দফতরের কর্মকর্তারা খবরটিকে ‘গুজব’ ও ‘ফেক নিউজ’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
দেশের মূলধারার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত খবরের মধ্যে প্রথম হিসেবে কালবেলার প্রতিবেদন খুঁজে পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট। শুক্রবার রাত ১০টা ৫২ মিনিটে সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বোমা হামলার আশঙ্কায় দেশের সব জেলা ও রেঞ্জে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘হাই অ্যালার্ট’ জারি করেছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার রাতে দেশের প্রতিটি এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কালবেলার প্রতিবেদনে পুলিশের সূত্রের বরাতে বলা হয়, সারা দেশে বোমা হামলার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে জেলার রাতের টহল, মোবাইল ডিউটি ও চেকপোস্টে থাকা পুলিশ সদস্যদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো অপ্রীতিকর বা সন্দেহজনক ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, বেতার বার্তার মাধ্যমে সারা দেশের পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে এবং বিভিন্ন ইউনিটের প্রধানদের মেসেজের মাধ্যমেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে কালবেলার প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই তিনি প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছেন।
এদিকে কালবেলায় খবরটি প্রকাশের পর বাংলা ট্রিবিউন, সময়ের আলো, ইনকিলাব, ঢাকা পোস্ট, এশিয়া পোস্ট, আমার সংবাদ, সমকাল, ঠিকানা নিউজ, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ সহ একাধিক সংবাদমাধ্যম একই ধরণের খবর প্রকাশ করেছে।
তবে পরবর্তী সময়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন সরিয়ে নেয়। আবার ঢাকা পোস্ট, ইত্তেফাকসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম শিরোনাম ও প্রতিবেদনের তথ্য পরিবর্তন করে ‘বোমা হামলার আশঙ্কায় দেশজুড়ে সতর্কতা, পুলিশ বলছে গুজব’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করেছে।
এছাড়াও এই ধরণের শিরোনাম একাধিক সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করেছে। সংবাদে একই রকম তথ্য থাকলেও শিরোনামে গুজব হিসেবে উল্লেখে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইস এম শাহাদাত হোসাইনের বক্তব্য সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। শাহাদাত হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘বোমা হামলার আশঙ্কায় সারা দেশের সর্বোচ্চ সতর্কতা জারির বিষয়টি গুজব।’’
‘গোপন বার্তা’র সূত্র কোথায়?
এদিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে পুলিশের অভ্যন্তরীণ একটি ‘গোপন বার্তা’র কথাও উল্লেখ করে। ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, ঢাকা পোস্ট ও অবজারভারসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওই বার্তার ভাষ্য তুলে ধরা হয়।
বার্তায় বলা হয়— “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা গেছে আজ সারা বাংলাদেশে বোমা হামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আপনার জেলাধীন যেসব পুলিশ সদস্য রাত্রিকালীন চেকপোস্ট/টহল/মোবাইল ডিউটিতে নিয়োজিত থাকবেন তারা সর্বোচ্চ সতর্কতারসহিত ডিউটি পালন করবেন। অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক অবগত করবেন। অতীব জরুরি নির্দেশনা: পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।”
ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, ‘‘পুলিশের অপারেশন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ওই বার্তাটি হোয়াটসঅ্যাপে পেয়েছেন বলে ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন।’’
তবে এই বার্তাটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি দ্য ডিসেন্ট। ‘গোপন বার্তা’র কথা উল্লেখ করা একাধিক সংবাদমাধ্যমের কাছে এই ‘বার্তার’ কোনো স্ক্রিনশট বা কপি চাইলে সংবাদমাধ্যমগুলো দিতে পারেনি।
পুলিশ সদর দফতরের আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম এবং সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইস এম শাহাদাত হোসাইন দুইজনই দ্য ডিসেন্টকে জানান, এমন কোনো গোপন বার্তার কথা জানেন না তারা। এটি গুঁজব।
‘‘বোমা হামলার আশঙ্কায় হাই অ্যালার্টের খবর গুজব’’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে আগামীর সময় দাবি করেছে, দেশজুড়ে বোমা হামলার আশঙ্কার হাই অ্যালার্ট জারির যে খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।’’
তাদের দাবি, ‘‘শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত একটি স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।’’
তবে কালবেলার সংবাদের আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরণের পোস্ট খুঁজে পায়নি দ্য ডিসেন্ট। এ বিষয়ে আগামীর সময়ের এক প্রতিবেদক দ্য ডিসেন্টেকে জানান, কালবেলায় খবর প্রকাশের পরই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে পোস্ট করেছিল। সেই সূত্রেই খবরটি প্রকাশ করা হয়েছিল। আগামীর সময় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো গোপন বার্তার কপি বা স্ক্রিনশট দিতে পারেনি।
যা জানালো পুলিশ
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এটা আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। বিভিন্ন সময় গোয়েন্দা তথ্যে আমরা নানা তথ্য পেয়ে থাকি। সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, “গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে, বোমা হামলাসহ নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে উগ্রবাদী সংগঠন বা দুর্বৃত্তরা। এজন্য সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
সমকালও সাংবাদিকদের সঙ্গে তার বক্তব্যের বরাতে একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করে। যেখানে রফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সময় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এবার গোয়েন্দা তথ্য বলছে, বোমা হামলাসহ নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে উগ্রবাদী সংগঠন বা দুর্বৃত্তরা। সেজন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে কথা বলার সময় তার বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।
খন্দকার রফিকুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘এ নিয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টারস থেকে রিসেন্টলি কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। গতকালও (শুক্রবার) অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করছিল। আমাদের অনেক আগে একটা সাধারণ সতর্কতামূলক বার্তা সবাইকে দেওয়া হয়েছিল। সেটা মূলত বিভিন্ন স্থাপনা বা যানবাহনগুলোর নিরাপত্তার জন্য সব সময়ই করা হয়ে থাকে। এটা বেশ কিছুদিন আগের কথা, কিন্তু সম্প্রতি এ ধরনের কোনো ইনস্ট্রাকশন দেওয়া হয়নি।’’
সংবাদমাধ্যমে বোমা হামলার আশঙ্কা নিয়ে প্রকাশিত ‘‘গোপন বার্তা’’ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা বিভিন্ন সময় সাধারণ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমাদের ইউনিটগুলোকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে থাকি। সেরকম কোনো মেসেজ হতে পারে। তবে সরাসরি বোমার থ্রেট আছে বা নির্দিষ্টভাবে গাড়ি সাবধানে রাখতে হবে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট মেসেজ আমাদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।’’
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘মাঝেমধ্যে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যেমন মেট্রো রেলের নিচে বোমা সদৃশ বস্তু পাওয়া গিয়েছিল যা পরে দেখা গেল পুরনো কাগজ, বস্তা এটা সেটা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা আমাদের ইউনিটগুলোকে এবং লোকজনকে সতর্ক করার চেষ্টা করি যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু না ঘটে।’’
‘‘আমি শুনেছি যে, এ ধরণের একটা ফেক নিউজ ছড়ানো হচ্ছে। এছাড়া বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে আমাদের একটি সাধারণ নির্দেশনা ছিল।’’ – যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইস এম শাহাদাত হোসাইন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘‘হাই অ্যালার্ট জারির খবরটি সঠিক নয়। মূলত এটা কোন একটা মিডিয়া নিউজ করছে এবং ওখান থেকে ছড়িয়েছে। আমি এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ এর বেশি মিডিয়াকে বলছি যে এটা সঠিক না।’’
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ‘‘গোপন বার্তা’’র বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘মেসেজেটা আমাকেও অনেকে পাঠিয়েছে। দেখেছি আমি। এটা কোনো একটা এ্যান্টি গ্রুপ এই গুজবটা ছড়াইছে। কিন্তু আমরা এবং পুলিশের সংশ্লিষ্ট সকল শাখা নিশ্চিত যে, পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে এমন কোনো মেসেজ দেওয়া হয়নি।’’