ফেসবুকে ভাইরালের নেশায় মহাসড়কে ‘বাউলি’ আর ‘গ্যাপ শট’এর মরণখেলা
বন্ধুদের সঙ্গে বাস ভাড়া করে ঘুরতে গিয়েছিলেন ধ্রুবজিৎ রায় আপন। চলতি বছরের ২৩ আগস্ট সেই বাসের চাকায় চাপা পড়ে মারা যান তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চলন্ত বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আপন। চালক ‘বাউলি’ দিলে তিনি রাস্তায় পড়ে যান এবং বাসের চাকায় পিষ্ট হন। পরে তার মরদেহ সেখানে ফেলে বাস নিয়ে চলে যান সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া বন্ধুরা।
‘বাংলাদেশ বাস স্পটার’ নামে একটি ‘বাস লাভার’ দলের ভ্রমণে ঘটনাটি ঘটে।
গত মার্চের আরেকটি ঘটনা। বগুড়ার চাঁদনী পরিবহনের একটি বাসের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেল বাসটি এদিক ওদিক ‘বাউলি’ দিতে গিয়ে এর ডান পাশের চাকাগুলো রীতিমত শূন্যে উঠে যায়। আর বাম পাশের বডি ডিভাইডারে ঘষা খেয়ে উল্টে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়।
এই ঘটনার পর ঘটনার ব্যাখা দিয়েছিলেন কয়েকজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তাদের ভাষ্য, তারাই মূলত বাস চালককে বাউলি দিতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। বাস চালক প্রথমে রাজি না হলেও পরে বাউলি দেয়।
ঠিক এমনই অনেক ভিডিও দেখা যায় ফেসবুকে। মহাসড়কে বাসের প্রতিযোগিতা আর এঁকেবেকে ‘বাউলি’ দেওয়ার মত বিষয়গুলো এখন হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অন্যতম আকর্ষণ। ভাইরাল হওয়ার নেশায় ‘বাস লাভারের’ নামে একদল তরুণ মেতে উঠেছে মরণ খেলায়। তারা বেপরোয়া গতিতে বাস চালিয়ে ভিডিও করেন। উল্লাস করেন। এসব ভিডিওতে কয়েক মিলিয়ন পর্যন্ত ভিউ হয়।
ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজে ‘খেলা হবে’, কখনো হিন্দি গান আবার কখনো মিমস মিউজিক। চলে বেহিসাবি বেপরোয়া বাউলি। চালক ও যাত্রী সবাই মিলেই করেন উদযাপন। এমনকি বাইকেও বেপরোয়া বাউলি দিতে গিয়ে সড়ক দূর্ঘটনার খবর সামনে আসে।
দেশে ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তবুও বদলাচ্ছে না কিছুই।
বাসের ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যারা বাসের ব্লগ ভিডিও বানায় তাদের বেশিরভাগ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ট্যুর করে বেড়ান। এসব বাসের গতি সবসময় থাকে বেপরোয়া। মানা হয় না সড়কে থাকা গতিসীমা। একাধিক বাস চলে একসাথে। রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নামেন কে আগে যেতে পারে। আর সময়ে সময়ে ক্যামেরা চালু করলেই চলে বেহিসাবি বেপরোয়া বাউলি।
বাউলি দিতে গিয়ে উল্টে যায় বাস। অনেকসময় চলে যায় মহাসড়কের বাইরেও। এত ঝুঁকিও যেন থোরাই কেয়ার করে এসব টুরিস্ট নামে কনটেন্ট ক্রিয়েটরেরা। তাদের পাশপাশি বাসচালক ও চালকের সহকারীরাও ভিডিও বানায়।
টুরিস্ট গ্রুপগুলোর সঙ্গে উদযাপনে মেতে উঠেন চালকরাও। একাধিক ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চালক স্টেয়ারিং ছেড়ে উঠে যাচ্ছেন। ইঞ্জিন কাভারে বসে ঘুরাচ্ছেন স্টেয়ারিং। গতি থাকা অবস্থায়ই পরিবর্তন হচ্ছে চালক। এক হাতে মোবাইল নিয়ে বানাচ্ছেন ভিডিও। এমনকি মেইন রোডেই শিশুদের হতে স্টেয়ারিং ছেড়ে দিচ্ছেন অকপটে।
ঝুঁকিপূর্ণ চালনার ভাষা ‘বাউলি’, ‘গ্যাপ শট’, ‘ক্লোজ কল’
বেপরোয়া বাস চালনার ভিডিওগুলোতে চালকদের ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল বোঝাতে ‘বাউলি’, ‘গ্যাপ শট’ ও ‘ক্লোজ কল’ এর মতো শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। এসব শব্দের মাধ্যমে মহাসড়কে বাস এঁকেবেঁকে চালানো, চলন্ত যানবাহনের মাঝের সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া কিংবা অন্য যানবাহনের খুব কাছ ঘেঁষে অতিক্রম করার মতো বিপজ্জনক আচরণকে তুলে ধরা হয়।
পাশাপাশি ‘রিস্কি বাউলি’, ‘মাথা নষ্ট বাউলি’, ‘হাড্ডাহাড্ডি গতির লড়াই’ ও ‘১২০+ গতিতে বাউলি দিয়ে ছুটে চলা’র মতো ক্যাপশনেও এসব কৌশলকে বর্ণনা করা হয়। কোথাও আবার ‘Sudden Entry’ কিংবা ‘Luck or Skill!?’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তকে উদযাপন করা হয়। এসব শব্দ ও ক্যাপশনে বিপজ্জনক চালনাকে শুধু বর্ণনা করাই নয়, বরং কখনো কখনো সেটিকে দক্ষতা হিসেবেও তুলে ধরা হয়।
এসব ভিডিও নির্মাণ করেন যারা
বাসের ভেতর ও বাইরে থেকে ধারণ করা ‘বাউলি’, বিপজ্জনক ওভারটেকিং এবং দুর্ঘটনার ভিডিও প্রকাশ করে—এমন ১০০টি ফেসবুক পেজ শনাক্ত করেছে দ্য ডিসেন্ট। অনুসারীর সংখ্যার ভিত্তিতে বাছাই করা কয়েকটি পেজের ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে কোথাও চালককে চলন্ত বাসের স্টিয়ারিং ছেড়ে নাচতে, কোথাও শিশুর হাতে স্টিয়ারিং তুলে দিতে দেখা যায়। আবার কোনো ভিডিওতে এঁকেবেঁকে চলার সময় বাসের চাকা শূন্যে উঠে যাচ্ছে। নিচে এমন ১০টি পেজের ভিডিও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
১. রিয়ান আহমেদ রনি: চলন্ত বাসে আসন ছাড়ছেন চালক
রিয়ান আহমেদ রনি পেশায় বাসচালক। তার ফেসবুক প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, বাড়ি শেরপুরে, থাকেন গাজীপুরে। বাস চালানোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরি করেন তিনি। ফেসবুকের বাইরে টিকটক ও ইউটিউবেও তার উপস্থিতি রয়েছে।
তার ফেসবুক পেজের অনুসারীর সংখ্যা ৩ লাখ ১৫ হাজার। বেশির ভাগ ভিডিওতে নিজের বাস চালানোর দৃশ্য প্রকাশ করেন তিনি। অন্য চালকদের ভিডিওও শেয়ার করেন। এসব কনটেন্টে বেপরোয়া চালনা, বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও ‘বাউলি’কে বিনোদন হিসেবে তুলে ধরা হয়।
“ড্রাইভার কই গেলোগা” ক্যাপশনের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চলন্ত বাসে চালক হঠাৎ নিজের আসন ছেড়ে পাশের ইঞ্জিনের ঢাকনার ওপর বসেন। সেখান থেকেই স্টিয়ারিং ঘোরাতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর আবার আসনে ফিরে আসেন।
অন্য কয়েকটি ভিডিওতেও দ্রুতগতিতে বাস চলার সময় চালককে উঠে দাঁড়াতে, ইঞ্জিনের ঢাকনায় বসতে কিংবা স্টিয়ারিং ছেড়ে দিতে দেখা যায়। এর মধ্যেই বাস এঁকেবেঁকে চলছে। এসব দৃশ্য ব্যবহার করে মিমধর্মী ভিডিওও তৈরি করা হয়েছে।
পেজটিতে মূল সড়কে শিশুকে দিয়ে বাস চালানোর ভিডিওও রয়েছে।
আরও ভিডিও: ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮।
২. নাঈম দ্য ট্রাভেলার: স্টিয়ারিং ছেড়ে নাচ, যাত্রীদের উল্লাস
নাঈম দ্য ট্রাভেলার পেজের অনুসারীর সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার। নিয়মিত ভ্রমণ প্যাকেজের পোস্ট দেওয়া হয় এই পেজ থেকে। পাশাপাশি প্রকাশ করা হয় বাসের ঝুঁকিপূর্ণ চালনার ভিডিও।
“ট্যুরের ৩ ইকোনো যখন তাফালিং শুরু করে তখন আর কেউ পাত্তাই পায় না”—এমন ক্যাপশনের একটি ভিডিও দেখা হয়েছে ১০ মিলিয়ন বা এক কোটি বার। এতে একটি বাসকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য যানবাহন অতিক্রম করতে এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেখা যায়। আরেকটি বাস থেকে দৃশ্যটি ধারণ করা হচ্ছিল। সেই বাসের কয়েকজন যাত্রী উল্লাসের পাশাপাশি অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করছিলেন।
আরেকটি ভিডিওর ক্যাপশন, “দূর্বল হার্টের লোকজন এই ভিডিও থেকে দূরে থাকুন। ঈগল পরিবহনের এমন ভয়ানক পাগলামি যা আগে কখনো দেখেননি ঈগল VS ঈগল”।
ওই ভিডিওতে একটি বাস সড়কে এঁকেবেঁকে চলছে। পেছনের বাস থেকে যারা দৃশ্যটি ধারণ করছেন, তারা উল্লাসের পাশাপাশি সামনের বাসটিকে অতিক্রম করতে চালককে উৎসাহ দিচ্ছেন।
“This is Comander” ক্যাপশনের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দ্রুতগতিতে বাস চলার সময় চালক স্টিয়ারিং ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। পেছনে ঘুরে উল্লাস করছেন তিনি।
“আগে নেচে নেই গাড়ি পরেও চালানো যাবে সিদ্দিক ভাই অন চিল মুড”—এই ক্যাপশনের আরেকটি ভিডিওতে চালককে মাঝেমধ্যে স্টিয়ারিং ছেড়ে গানের তালে নাচতে দেখা যায়। যাত্রীরাও তার সঙ্গে উল্লাস করছেন।
পেজটিতে ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ‘বাউলি’, ‘গ্যাপ শট’ ও বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতার আরও অনেক ভিডিও রয়েছে।
আরও ভিডিও: ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮।
৩. বিডি বাস ভ্লগার: সংকীর্ণ ফাঁকে বাস, আম দিয়ে স্টিয়ারিং
বিডি বাস ভ্লগার পেজের দুজন অ্যাডমিন হলেন সাজ্জাদ হোসেন শিহাব ও আশিকুর রহমান সাগর। পেজটিতে ‘বাউলি’ ও ‘গ্যাপ শট’সহ ঝুঁকিপূর্ণ চালনার একাধিক ভিডিও পাওয়া গেছে।
“Sudden Entry” ক্যাপশনের একটি ভিডিওতে একটি বাসকে এঁকেবেঁকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। একই সময় বিপরীত দিক থেকে আরেকটি বাসও আসছে এঁকেবেঁকে।
“Luck or Skill” ক্যাপশনের ভিডিওতে সড়কের আইল্যান্ড ও অন্য একটি বাসের মাঝের সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে একটি বাস বেরিয়ে যায়। আর “একটুর জন্য ও মাগো থেকে ঐ লো” ক্যাপশনের ভিডিওতে এঁকেবেঁকে চলা বাসটির সামনে হঠাৎ আরেকটি বাস চলে আসে।
“হালায় কামডা করল কি” ক্যাপশনের ভিডিওতে ‘বাউলি’ দেওয়ার সময় বাসের একটি চাকা সড়কের পাশের খাদে নেমে যায়। এরপরও বাসটি এগিয়ে চলে। “ঐডা কি ছিল” ক্যাপশনের আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায় ঝুঁকিপূর্ণ ‘গ্যাপ শট’।
পেজটির “Mango Forid” ক্যাপশনের একটি ভিডিওতে চালককে আম দিয়ে স্টিয়ারিং ঘোরাতেও দেখা যায়।
৪. বাস ট্রাভেলার সজল: প্রতিযোগিতার মধ্যেই শূন্যে চাকা
বাস ট্রাভেলার সজল পেজের একটি ভিডিওতে ১০ মিলিয়ন বা এক কোটি ভিউ রয়েছে। পেজটি থেকে নিয়মিত ‘বাউলি’, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং ও বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতার ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
“টুরের দুই ঈগলের চরম লেভেলের পাগলামি” ক্যাপশনের একটি ভিডিওতে ভ্রমণে যাওয়া একটি বাসকে মহাসড়কে সর্পিলভাবে চলতে দেখা যায়। বাসের পেছনে লেখা ‘Bus lover Unite’।
“কামডা করলো কিহ সৌদিয়া সিল্কী” ক্যাপশনের ভিডিওতে রাতের বেলায় এঁকেবেঁকে বাস চালিয়ে ওভারটেক করছেন চালক। আর “টুরের তিন গাড়ির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি গতির লড়াই কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ” ক্যাপশনের ভিডিওতে তিনটি বাসকে প্রতিযোগিতায় নামতে দেখা যায়। বাসগুলো এঁকেবেঁকে চলার সময় ভেতরের যাত্রীরা উল্লাস করছেন।
“টুরের হিমালয়ের বাউলির সাথে গর্জন” ক্যাপশনের ভিডিওতেও সর্পিলভাবে বাস চালানোর দৃশ্য রয়েছে। অন্যদিকে, “টুরের নীলাচল করে কিহ” ক্যাপশনের ভিডিওতে এঁকেবেঁকে এগিয়ে আসা নীলাচলের একটি বাস হঠাৎ একদিকে হেলে পড়ে। এ সময় অন্য পাশের সামনের চাকা শূন্যে উঠে যায়।
“টুরের হানিফের বাম্পারে ফাহমিদা ও শান্তির হাড্ডাহাড্ডি খেলা” ক্যাপশনের ভিডিওতে কয়েকটি বাস প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে একটি বাস এঁকেবেঁকে এগিয়ে আসছে।
“ফটোশুটের জোনাকির বাউলিবাজি” ক্যাপশনের ভিডিওতে পেছনের বাস অতিক্রম করার চেষ্টা করলে সামনের বাসটিকে বাধা দিতে দেখা যায়। সামনের বাসটি তখন এঁকেবেঁকে চলছিল।
“এন্ট্রি নিয়েই পাগলামি শুরু করলো গোল্ডেন লাইন” ক্যাপশনের ভিডিওতেও গোল্ডেন লাইনের একটি বাস একইভাবে এগিয়ে যায়।
আরও ভিডিও: ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭।
৫. মাদারীপুর বাস লাভার সজিব: ‘নাগিন ড্যান্স’ ও ‘ভাইরাল ডান্স’ নামে ভিডিও
মাদারীপুর বাস লাভার সজিব নামের প্রোফাইলে নিজেকে গ্রিন লাইন পরিবহনের ‘বাস ওয়ার্কার’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। সেখানে তার ছবিও রয়েছে।
এই প্রোফাইলে বাসের এঁকেবেঁকে চলার দৃশ্যকে নাচের সঙ্গে তুলনা করে ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। “পাগল নাগিন ড্যান্স” ক্যাপশনের একটি ভিডিওতে বাসকে হেলেদুলে ও এঁকেবেঁকে এগোতে দেখা যায়। “ভাইরাল ডান্স” ক্যাপশনের ভিডিওতে একইভাবে চলছে দুটি বাস।
“ইমরান ট্রাভেলস মানেই আগুন” ক্যাপশনের ভিডিওতেও একটি বাস এঁকেবেঁকে সামনে আসে। “ঈগল পাগল” ক্যাপশনের ভিডিওতে মহাসড়কে একইভাবে চলা বাসটির পেছন থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।
“গেস দা লোকেশন” ক্যাপশনের আরেকটি ভিডিওতে তিনটি বাস একসঙ্গে এঁকেবেঁকে চলছে। সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন সেই দৃশ্য ধারণ করছেন।
৬. মারুফ ট্রাভেলিং: ‘বাউলি’ ও ‘গ্যাপ শট’ ঘিরে উল্লাস
মারুফ ট্রাভেলিং পেজে অবস্থান হিসেবে পাবনার উল্লেখ রয়েছে। নিয়মিত ভ্রমণের বিজ্ঞাপন দেওয়ার পাশাপাশি পেজটি থেকে বাসের ঝুঁকিপূর্ণ চালনার ভিডিওও প্রকাশ করা হয়।
“সরকার এস আই দুই টুরের গাড়ির মাথা নষ্ট পাগলামি দেখুন” ক্যাপশনের একটি ভিডিওতে বাসকে বেপরোয়াভাবে এঁকেবেঁকে এগোতে দেখা যায়।
“হিমাচল খাজা এনার মধ্যে কঠিন লড়াই কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ” ক্যাপশনের ভিডিওতে ভ্রমণে যাওয়া তিনটি বাস এঁকেবেঁকে চলার পাশাপাশি প্রতিযোগিতা করছে।
“ট্যুরের হাসান এক্সপ্রেস যা দেখাইলো তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না Route explore BGC” ক্যাপশনের ভিডিওতে একটি বাস এঁকেবেঁকে এসে সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে সামনে চলে যায়।
“হঠাৎ এন্টিতে চাকা আকাশে” ক্যাপশনের ভিডিওতে ‘বাউলি’ দেওয়ার সময় বাসের পেছনের চাকা শূন্যে উঠে যায়।
“নীলাচল বাম্পারে একুশে এর কড়া প্রেসার অতঃপর নীলাচল পাগলামি” ক্যাপশনের আরেকটি ভিডিওতে একটি বাস এঁকেবেঁকে অন্য বাস অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। পেছনের যে বাস থেকে ভিডিও করা হচ্ছিল, সেটির যাত্রীরা এ সময় উল্লাস করেন।
৭. বাস ট্যুর: উল্লাসের পাশাপাশি ভয় ও দুর্ঘটনার দৃশ্য
বাস ট্যুর পেজে ঝুঁকিপূর্ণ চালনার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ভিডিওও পাওয়া গেছে।
“শুর টা চেনা চেনা লাগে” ক্যাপশনের একটি ভিডিওতে একজনকে জানালার বাইরে দিয়ে সামনের বাসের দৃশ্য ধারণ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর ক্যামেরার দৃশ্য বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ধাক্কা ও কাচ ভাঙার শব্দ শোনা যায়।
“বাউলি এমন দেও যাতে মেম্বার বলে ভয় পাই” ক্যাপশনের ভিডিওতে বাসের ভেতর থেকে কয়েকজনকে “ভয় পাই” বলে চিৎকার করতে শোনা যায়।
“নীলাচল এর বাম্পারে কামড়ে ধরলো হিমাচল” ক্যাপশনের ভিডিওতে দ্রুতগতিতে অন্য যান অতিক্রম করার সময় একটি বাস মূল সড়কের বাইরে চলে যায়। “একটুর জন্য বেচে গেলো” ক্যাপশনের ভিডিওতে সড়কের আইল্যান্ডের সামনের সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে বাস বেরিয়ে যায়।
“ট্যুরের সোনিয়া হঠাৎ ঈগল কে কড়া ভাবে চাপ দিলো” ক্যাপশনের ভিডিওতে সোনিয়ার একটি বাস এঁকেবেঁকে অন্য যানবাহন অতিক্রম করে সামনে যায়। পেছনের একটি বাস থেকে দৃশ্যটি ধারণ করা হচ্ছিল। সেই বাসটি অতিক্রম করার চেষ্টা করলে সামনের বাস সেটিকে চাপ দেয়।
“হানিফ ৪৩৯৩ জিদান হাওলাদার ৯৬০৩ ইকোনো হলিউড বাপ্পি ভাই” ক্যাপশনের ভিডিওতে হানিফের একটি বাস এঁকেবেঁকে এগোয়। এর পেছনের অংশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।
“রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে রাস্তা বানিয়ে গাড়ি চালাবো” ক্যাপশনের ভিডিওতে বাস সড়কের বাইরে চলে যাওয়ার পরও ভেতরের ব্যক্তিদের উল্লাস করতে দেখা যায়।
পেজটিতে ব্যস্ত সড়কে, যানজটের মধ্যে এবং বৃষ্টির সময়ও ‘বাউলি’, ‘গ্যাপ শট’ ও প্রতিযোগিতার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
৮. লাক্সারিয়াস বাসেস অ্যান্ড কোচেজ: প্রায় ধাক্কা লাগার দৃশ্যও কনটেন্ট
লাক্সারিয়াস বাসেস অ্যান্ড কোচেজ বা এলবিসি পেজের একটি ভিডিওতে বাসকে এঁকেবেঁকে চলতে দেখা যায়। ভেতরের যাত্রীরা সেই দৃশ্য উদযাপন করছেন।
“১৫ তম ট্যুরের সার্বিকের বাউলি” ক্যাপশনের ভিডিওতে ভ্রমণে যাওয়া একটি বাসের পেছনের চাকা শূন্যে উঠে যায়। পেজটিতে একই ধরনের আরেকটি ভিডিওও রয়েছে।
“আর খালি ওরবে ওরবে” ক্যাপশনের ভিডিওতে অন্য যান অতিক্রম করার সময় বাসের একটি অংশ মূল সড়কের বাইরে চলে যায়।
“গোল্ডু করে কি” ক্যাপশনের ভিডিওতে ব্যস্ত সড়কে গোল্ডেন লাইনের একটি ভ্রমণের বাস এঁকেবেঁকে চলছে। সামনে ট্রাক ও পেছনে বাস থাকা অবস্থাতেই চালক এভাবে বাস চালাচ্ছেন।
“নিজেদের মধ্যে খেলা হলে আর কি লাগে” ক্যাপশনের ভিডিওতে সড়ক বিভাজকের কাছে থাকা একটি ট্রাকের সামনে ও বিভাজকের মাঝের সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে বাস বের করে নেওয়া হয়। ভিডিও প্রকাশকারীরা এই চালনাকে ‘গ্যাপ শট’ বলেন।
পেজটিতে ‘ক্লোজ কল’ নামে ভিডিওও প্রকাশ করা হয়েছে। এসব দৃশ্যে বাসকে অন্য বাস বা ট্রাকের এত কাছ দিয়ে যেতে দেখা যায় যে প্রায় ধাক্কা লাগার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
৯. ড্রাইভ বাংলা: ৮০ কিলোমিটারের সড়কে স্পিডমিটারে ১৩০
ড্রাইভ বাংলা পেজে দেওয়া ইমেইল ঠিকানার সূত্রে অ্যাডমিনের নাম হৃদয় হোসাইন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বাড়ি বরিশালে। পেজটি সাকুরা ব্র্যান্ডের একটি ফেসবুক গ্রুপেরও অ্যাডমিন।
“Level high” ক্যাপশনের একটি ভিডিওতে বাসের স্পিডমিটারে ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার গতি দেখা যায়। অথচ ওই সড়কে গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
“Hanif vs Sakura” ক্যাপশনের ভিডিওতে ওভারটেক করার সময় বাস মূল সড়কের বাইরে চলে যায়।
“রিস্ক হয়ে যায় জানের উপরে” ক্যাপশনের আরেকটি ভিডিওতে রয়েছে ‘গ্যাপ শট’-এর দৃশ্য।
১০. আরকে বাস ভ্লগার: ‘মরলে লাশ বাচলে ইতিহাস’ ক্যাপশনে ভিডিও
আরকে বাস ভ্লগার পেজের একটি ভিডিওর ক্যাপশন, “SARBICK ON FIRE মরলে লাশ বাচলে ইতিহাস”। ওই ভিডিওতে একটি বাস এঁকেবেঁকে এগোনোর সময় পেছনের চাকা শূন্যে উঠে যেতে দেখা যায়।
আরেকটি ভিডিওর ক্যাপশন, “মরন খেলা Sরায়হান খাজা এনা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই”। এর সঙ্গে Bappy Hossain নামের একটি প্রোফাইল যুক্ত করে লেখা হয়েছে “ভাই”।
ভিডিওটিতে ভ্রমণে যাওয়া কয়েকটি বাস আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। একই সঙ্গে বাসগুলো ঝুঁকিপূর্ণভাবে এঁকেবেঁকে চলছে।
ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন না গ্রুপ অ্যাডমিনরা
নাইম দ্য ট্রাভেলার পেইজের অ্যাডমিন নাইম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমি মূলত পড়াশোনা করি। ভাই-ব্রাদার মিলে কোথাও ঘুরতে গেলে এই ধরণের ভিডিও বানাই। আমি নিজেই ভিডিও করি।
ঝুঁকিপূর্ণ কী-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমর কাছে এই ধরণের ভিডিও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয় না। আমি নিজেও কখনো দূর্ঘটান শিকার হইনি। তাছাড়া ঘর থেকে কেউ নরমালি কেউ বের হলেও তো দূর্ঘটনা হতেই পারে।”
বাস ট্রাভেলার সজল পেইজের অ্যাডমিন আজিজুল ইসলাম সজল সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। তিনি নিজে দূর্ঘটনার শিকার না হলেও দূর্ঘটনা ঘটে বলে জানান।
সজল দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমি স্টুডেন্ট। সব ট্যুরে যাই না তাই সব ভিডিও আমার করা না। বিভিন্ন গ্রুপের অ্যাডমিনরা ভিডিও পাঠায়। সেগুলো আপলোড করি। মাঝেমধ্যে নতুন ট্যুরগ্রুপগুলো এক্সিডেন্ট করে ফেলে। তবে সতর্কতা অনুযায়ী এগুলো করা হয়। এখন পর্যন্ত আমরা বিপদের মুখোমুখি হইনি। আর এগুলো নিজেদের গাড়ির মধ্যেই হয়ে থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের ফেসবুক গ্রুপ মুলত কয়েকটা আছে। যেগুলো বহু পুরাতন। আমরা সুন্দরভাবে রিল্যাক্স টুর দেওয়ার জন্য যাই এবং নিজেদের গাড়ির মধ্যেই খেলা ও ভিডিও চলে। কিন্তু ইদানিং নতুন কিছু বাস লাভিং গ্রপ বের হয়েছে। তাদের জন্য এগুলো সমস্যায় আমাদের পরতে হচ্ছে।”
সজল বলেন, “নতুন গ্রুপগুলোর এসব কাজ আমরা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট চেষ্টা করছি। কিছুদিন আগে ৩০ এর অধিক গ্রুপ মিলে মিটিংও করেছি।”
বাস লাভার ট্যুর গ্রুপের বাউলিতে বাসে চাপা পরে তরুনের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি বলেন, “কিছুদিন আগে যে একটা ছেলে মারা গেলো। ঐ গ্রুপের আগেও অনেক ইস্যু ছিলো। ওদের প্রত্যক টুরে কিছু না কিছু ঘটনা ঘটতো।”
এ বিষয়ে জানতে কুষ্টিয়ার এক বাসপ্রেমীর সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। নিয়মিত বাসচালক, মালিক ও কাউন্টারের ব্যক্তিদের সঙ্গে উঠাবসা আছে তার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডিসেন্টকে তিনি বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ট্যুর গ্রুপগুলো বাউলি ও গ্যাপশটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় মেতে ওঠে। মূলত রোমাঞ্চকর অনুভূতি পাওয়ার জন্যই তারা এসব করে। অনেক সময় বাসচালকেরা নিজেরা আগ্রহী না থাকলেও ট্যুর গ্রুপের সদস্যরা তাদের বাউলি দিতে উৎসাহিত করেন। কিছু উৎসাহী চালকও আছে যারা এসব কাজে সায় দেয়। আর ফেসবুকের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে ভিউ পাওয়ার নেশা তো আছেই।”
তিনি আরও বলেন, “ট্যুরের বাইরে বেপরোয়া বাস চালানো যেখা যায়, অনেক সময় বাস মালিকরা ড্রাইভারদের চাপ দেয় দ্রুত গন্তব্যতে পৌঁছানোর জন্য। এজন্য ড্রাইভাররা বেপরোয়াভাবে বাস চালায়। দেখা গেলো কোনো কোম্পানির ৬টা বাস আছে। কিন্তু সে ১০টা ট্রিপ করবে। এজন্য ড্রাইভাররা চাপে থাকে দ্রুত ঐভাবে বাস চালাতে। আবার অনেক সময় দ্রুত ট্রিপ করলে এক্সটা কমিশন পায়। এই কমিশনের জন্যেও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাদ চালাতে দেখা যায়।”
বাউলি কোনো ভাবেই সমর্থনযোগ্য না: বাস চালক
আকিজ উদ্দীন দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দূরপাল্লার দূরপাল্লার বাস চালিয়েছেন। তিনি একসময় ঢাকা-মেহেরপুর, কুষ্টিয়া-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে বাস চালিয়েছেন বলে জানান।
দ্য ডিসেন্টকে তিনি বলেন, “অ্যাক্সিডেন্ট মানে নিতান্ত ড্রাইভারের ভুল। এটা হলো প্রথম কথা। ড্রাইভার যদি চায় অ্যাক্সিডেন্ট হবে না, এটা একদম ৯৯ পারসেন্ট। এক পারসেন্ট বাকি নির্ধারণ করেন আল্লাহ তাআলা। ড্রাইভার ভুল না করে, তাতে প্রাণহানি ঘটবে না–এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহ তাআলা কাউকে যদি মৃত্যু দান করেন, তাইলে তো এখানে কিন্তু কারোরই করার নাই; সে বসে থাকলেও মরে যেতে পারে। কিন্তু ড্রাইভারের ভুলটাই হলো সবচাইতে বড় জিনিস। ভুল না করলে সে কিছুতেই হোক, অ্যাক্সিডেন্ট হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আসলে শুধু ট্যুরের জন্য না, গাড়ির ভিতরে ধরেন যদি স্বাভাবিকভাবে ঢাকা পরিবহন বলেন, তাও তো ৩০ জন ৪০ জন যাত্রী থাকে। আর তার ভিতরে অন্তত ১০ জন যাত্রী এরকমও থাকে যে, ‘ওই গাড়ি আগে চলে গেল, আপনি কী করছেন? কিরকম গাড়ি চালান? আপনার কি গাড়ি চলে না, হাত চলে না, না চলে না?’ এইরকম অনেক সময় অনেক কিছু হয়। তো এগুলার দিকে কান দেওয়া যাবে না। যাত্রীর কথা শুনলে হবে না, ড্রাইভারের নিজের চলতে হবে।”
আকিজ উদ্দীন বলেন, “এইদিক দিয়ে ওইদিক দিয়ে এইরকম ওইরকম করে টান দেন, সামনে যায়, একটা গাড়ির সামনে যায় বা পাশ কেটে নিয়ে যায়– এগুলাকে বাউলি বলে। বাউলি শুধু বাসের ক্ষেত্রে না, যে স্টিয়ারিং ধরুক, সে ট্রাক হোক, ভ্যান হোক, অটো হোক, মোটরসাইকেল হোক, আর সাইকেল হোক আর বাস হোক এটা কোনোটাই ঠিক না। এটা কোনোভাবে সমর্থনযোগ্য না। একটা গাড়ি যাবে তার সাইড দিয়ে সুন্দরভাবে যাবে, তার লেন থাকবে আলাদা। এটাই হওয়া উচিত।”
“এটা আসলে উঠতি বয়সের অনেকেই করে। আমি একসময় ঢাকা-মেহেরপুর গাড়ি চালাইতাম, কুষ্টিয়া-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার চালাইছি। সেসময়তেও আমরাও এগুলা অনেক সময় কাজ করেছি, এগুলা ভুল করেছি। পরে অনুধাবন করেছি যে, না, এগুলা যে আসলে আমরা ভুল করছি, আমার জীবনের থেকে পৃথিবীর মূল্য বেশি না।” – যোগ করেন আকিজ উদ্দীন।
আইন থাকলেও বাড়ছে মৃত্যুর পরিসংখ্যান
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এর ৪৪ ধারায় মোটরযানের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বলা হয়েছে।এই ধারা অনুয়ায়ী–
(১) কর্তৃপক্ষ, সড়ক বা মহাসড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সাথে পরামর্শক্রমে, বিভিন্ন শ্রেণির সড়কে মোটরযানের গতিসীমা নির্ধারণ বা পুনঃনির্ধারণ করিতে পারবে।
(২) কোনো মোটরযানের চালক সড়ক বা মহাসড়কে নির্ধারিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে বা বেপরোয়াভাবে মোটরযান চালাইতে পারবেন না।
(৩) কোনো মোটরযান চালক সড়ক বা মহাসড়কে বিপজ্জনকভাবে বা অননুমোদিতভাবে ওভারটেকিং করিতে পারবেন না বা মোটরযান চলাচলে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিতে পারবেন না।
আইনটির ৮৭ ধারায় এ সংক্রান্ত দন্ডের বিধান আছে। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৪৪ এর বিধান লঙ্ঘন করেন, তাহলে উক্ত লঙ্ঘন হইবে একটি অপরাধ হবে। এই অপরাধের জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) মাসের কারাদণ্ড, বা অনধিক ১০ (দশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং, চালকের ক্ষেত্রে, অতিরিক্ত হিসাবে দোষসূচক ১ (এক) পয়েন্ট কর্তন হইবে।
আইনের ৯৮ ধারায় ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালনার ফলে দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের দণ্ড সম্পর্কিত বিধান আছে।
এই বিধান অনুযায়ী, যদি নির্ধারিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে বা বেপরোয়াভাবে বা ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বা ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালনার ফলে কোনো দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট মোটরযানের চালক বা কন্ডাক্টর বা সহায়তাকারী ব্যক্তির অনুরূপ মোটরযান চালনা হবে একটি অপরাধ। তার জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বছর কারাদণ্ড, বা অনধিক ০৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে প্রদানের নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।
আইনটির ৯৯ ধারায় অপরাধ সংঘটনে সহায়তা, প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের দন্ডের বিধান আছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেন বা প্ররোচনা প্রদান করেন বা ষড়যন্ত্র করেন এবং যাহার ফলে সংশ্লিষ্ট অপরাধটি সংঘটিত হয়, তাহা হইলে উক্ত সহায়তাকারী, যড়যন্ত্রকারী বা প্ররোচনা প্রদানকারী ব্যক্তি উক্ত অপরাধ সংঘটনের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের সমপরিমাণ দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
সড়ক পরিবহন আইনের ১০৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হইলে বা তাহার প্রাণহানি ঘটলে, উক্ত ব্যক্তি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক ০৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
আইনটির ১০০ ধারা অনুযায়ী, এই আইনে উল্লিখিত কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডভোগকারী একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করিলে, উক্ত ব্যক্তিকে সংঘটিত অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ দণ্ডের দ্বিগুণ দন্ডে দন্ডিত করা যাইবে এবং ইহা কোনোক্রমে পূর্বে প্রদত্ত দণ্ডের দ্বিগুণের কম হইবে না।
আইন থাকলে সড়কে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। দেশে ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংগঠনটি এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে আজ বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংগঠনটির দাবি, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে হাসপাতালভিত্তিক কোনো তথ্য দেয়নি তারা।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬.৯৪ শতাংশ। আর মৃত্যুর হার বেড়েছে ৫.৭৯ শতাংশ। আহতের হার ১৪.৮৭ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন।
২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। এ সংখ্যা যথাক্রমে মোট দুর্ঘটনার ৩৭.৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যার ৩৮.৪৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যার ১৪.৯৮ শতাংশ।
স্যোশাল মিডিয়া মনিটর করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে পুলিশ
হাইওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি মুনতাসিরুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরাও বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি, ফেসবুকে বিভিন্নরকম গ্রুপে এগুলা হচ্ছে। এটা বেসিক্যালি আমরা আমাদের হাইওয়েতে বা আমাদের যে যারা আমাদের ফোর্স অফিসার আছে, বিভিন্ন ইউনিট আছে, তাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছি– যারা এই জাতীয় কাজ করে, তারা যদি সড়ক পরিবহন আইনের কোনো ব্যত্যয় করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, “এরা তো পুলিশের সামনে ভিডিওটা করে না। তাই না? তো এরা যখন দেখে যে রাস্তায় কোনো একটা নির্জন স্থান আছে বা যে জায়গাটার মধ্যে মানে ওরা এই ধরনের কাজটা করে নির্বিঘ্নে চলে যেতে পারে... ওদের অ্যাকচুয়ালি এইটা সারা রাস্তা ভরে ঢাকা-চিটাগাং রোড, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড– এই পুরা রাস্তায় যে এইভাবে এরা জিগজ্যাগ করে চালায় বিষয়টা কিন্তু তা না। বিষয়টা হচ্ছে যে, ওরা ভিউ বাড়ানোর জন্য এই কাজটা করে নির্জন এবং যে জায়গায় পুলিশ নাই, হাইওয়ে পুলিশ নাই, সেইসব জায়গাগুলাতে এরা এই কাজগুলা করে।”
মুনতাসির বলেন, “সে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালাচ্ছে এটা একটা দিক আছে, আর পাশাপাশি ইয়াংস্টার যারা আছে, যারা অল্প বয়সের তরুণ আছে, তাদের কাছে একটা ভুল মেসেজ যাচ্ছে। তাদেরকে এই ধরনের বিপজ্জনক বাস চালনাতে বা চড়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সেইজন্য আমরা নির্দেশনা দিয়েছি যে আমাদের হাইওয়ে পুলিশের নজরে যেখানেই আসবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিও নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে করণীয় হচ্ছে আইন প্রয়োগ। আর পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে, সাইবার কোনো মনিটরিংয়ের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না সেইটা নিয়ে আমরা ভাবছি।”