তদন্তের আগেই হিন্দু পুলিশ সদস্যকে দায়ী করে মিডিয়ায় খবর, ফেসবুকে উস্কানি

২৮ অক্টোবর, ২০২৬

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলে স্থানীয়দের বিক্ষোভের মুখে কৃপেশ রায় (৪০) নামের এক যুবককে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

গত ২৫ অক্টোবর ‘Kripash Ray’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সোমবার সকাল থেকে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

তবে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়ার আগেই ২৬ অক্টোবর থানায় ‘Kripash Ray’ আইডিটির কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জিডি করেন। একইদিন কৃপেশ রায় তার নিজের ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করে জানান, তার নামে ভুয়া আইডি খোলে তাকে ফাঁসাতে উস্কানিমূলক পোস্ট দেয়া হচ্ছে।

তবে এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকলে ২৬ অক্টোবর দুপুরে উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের রাজারগাঁও গ্রাম থেকে তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদন মতে, পুলিশ তাকে নিয়ে নৌকায় ওঠার সময়ে পেছন থেকে কিছু কিশোর-তরুণ ঢিল ছোড়েন এবং তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর পুলিশ তাকে দ্রুত থানায় নিয়ে যায়। এরপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মামলা দায়ের করে পুলিশ। এই মামলায় মঙ্গলবার তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। কৃপেশ রায় ওই গ্রামের ক্ষিতীন্দ্র চন্দ্র রায়ের ছেলে। 

তদন্তের আগেই সংবাদমাধ্যমে উপসংহারমূলক শিরোনাম, ফেসবুকে উস্কানি

২৬ অক্টোবর আরটিভি “কর্মস্থলে গরহাজির হলেও মহানবীকে (সা.) নিয়ে কটূক্তিতে সরব এই পুলিশ সদস্য!” শিরোনামে ফেসবুকে একটি ফটোকার্ড এবং ওয়েবসাইটে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

শিরোনামে কৃপেশকে ধর্ম অবমাননার জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের সপ্তম অনুচ্ছেদে লেখা হয়েছে, “অভিযোগ অস্বীকার করে কৃপেশ রায়ের দাবি, একই গ্রামের তার আপন চাচাতো ভাই পন্টি রায়ের সঙ্গে পারিবারিক জমিজমা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। ওই বিরোধের জেরে তাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে তার ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে অথবা ভুয়া পোস্টের মাধ্যমে এ ধরনের মন্তব্য ছড়ানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনি সুরক্ষা চেয়ে সোমবার সকালে তিনি নিজেই তাহিরপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।”

পরের অনুচ্ছেদেও কৃপেশের একজন প্রতিবেশীর বরাতে অ্যাকাউন্টটিকে ভুয়া বলা হয়েছে। কিন্তু এসব তথ্য শিরোনামে প্রতিফলিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের মালিকানা বা পোস্টদাতার পরিচয়ের প্রমাণ না দিয়েই শিরোনামে উপসংহার টানা হয়েছে, কৃপেশ ‘মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তিতে সরব’।

আরটিভির এই প্রতিবেদনটি ফেসবুকে ভাইরাল হয় কৃপেশের শাস্তির দাবিতে অনেকেই সরব হোন। এর মধ্যে কিছু ফেসবুক একাউন্টে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক ভাষায় কৃপেশের বিরুদ্ধে লেখালেখি করা হয়েছে।

আরটিভির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের ফটোকার্ডসংবলিত পোস্টটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে তিন হাজারের বেশি মন্তব্য রয়েছে। এর বেশির ভাগেই কৃপেশের শাস্তি, এমনকি হত্যার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Md Emran নামের একজন লিখেছেন, “একমাত্র বিচার হচ্ছে কতল করা।” হাফিজুর রহমান লিখেছেন, “অই এখনো জীবিত আছে কিভাবে??” মাসুম নামের একজনের মন্তব্য, “ওই এলাকায় কি পুরুষ মানুষ নাই। ওর হাড়গোড় এখনো ঠিক আছে কিভাবে?” ইদরাজ হোসেন লিখেছেন, “ও যেখানে আছে সেখানে কি কোনো মুসলমান নেই ও এখনো বেঁচে থাকে কি করে।। ”

 Islam Insight নামক একটি ফেসবুক পেইজ থেকে এক পোস্টে লিখা হয়েছে, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার ঘটনায় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় কৃপেশ রায় (৪০) নামের এক কুলাঙ্গারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।“

পোস্টটি শেয়ার করে MD Badhon Islam নামে একজন লিখেছেন, “এই মালুর বাচ্চার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।“

এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত Islam Insight নামক পেইজের পোস্টে প্রায় ২ হাজার কমেন্ট পাওয়া যায়। সেখানেও বহু কমেন্টেই কৃপেশ রায়কে হত্যা বা জবাই করার আহ্বান পাওয়া গেছে।

আলম নামে একজন লিখেছেন, “ইতে এতক্ষণ বেঁচে আছে কোনো বুৃঝলাম, এখনো দিনের আলো দেখে কেমনে??” শাহাবুল নামে একজন লিখেছেন, “মৃত্যুদণ্ড একমাত্র শাস্তি।“ Eshani Hussain Suhani নামে একজন লিখেছেন, “Jobai kora foroz hoye geche”

Md Shoukhot Mahmud নামের একটি একাউন্ট থেকে পোস্ট করে লিখা হয়েছে, “প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে কৃপেশ রায় কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করেছে, তার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।“

Sytiv Bangla নামক একটি ফেসবুক পেইজ থেকে কৃপেশ রায়কে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে লেখা হয়েছে, “মহানবীকে নিয়ে কটুক্তি করল কৃপেশ রায়।” 

দুটি অ্যাকাউন্ট, আগেই সতর্ক করেছিলেন কৃপেশ

ঘটনার সূত্রপাত ২৫ অক্টোবর। ‘Kripash Ray’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সোমবার সকাল থেকে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ‘Kripash Ray’ একাউন্টটি এ বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি খোলা হয়েছে। সেখানে প্রথম পোস্ট করা হয়েছে গত ১০ অক্টোবর। একাউন্টটি পর্যবেক্ষণের সময় মোট ১১টি পোস্ট পাওয়া যায়। এর মধ্যে পাঁচটিতে কৃপেশ ও তার পরিবারের সদস্যের ছবি এবং দুটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমর্থনে দেওয়া পোস্ট। তবে মহানবী (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগ ওঠা পোস্টটি এই রিপোর্ট লেখার সময় আইডিতে পাওয়া যায়নি। যদিও ভাইরাল হওয়া স্ক্রিনশটটি ভুয়া নয় বলে নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডিসেন্ট। অর্থাৎ, সমালোচনার পর পোস্টটি ওই আইডি থেকে ডিলিট করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কৃপেশের মূল ফেসবুক একাউন্ট ‘B.P. Kripash Ray’ খোলা হয়েছে ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সেই একাউন্ট থেকে দেওয়া একটি ‘ফ্রেন্ডস-অনলি’ পোস্টে কৃপেশ লিখেছেন, “‘Kripash Ray’ নামের আইডি আমার নয়। কে বা কাহারা আমার নাম, ছবি সহ আমার স্ত্রী সন্তানের ছবি ব্যবহার করিয়া ‘Kripash Ray’ নামে ফেইসবুক আইডি খুলিয়া বিভিন্ন প্রকার আপত্তিকর ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক পোস্ট করিয়া আমার ক্ষতিসাধনের অপচেষ্টায় লিপ্ত রহিয়াছে। সকলেই উক্ত আইডি হইতে সাবধান থাকিবেন।”

পোস্টে তিনি এই ঘটনায় থানায় করা একটি জিডির কপি যুক্ত করেন।

ওইদিন পুলিশ তাকে হেফাজতে নেওয়ার আগেই তাহিরপুর থানায় জিডি করেন কৃপেশ। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তি তার ও পরিবারের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক মন্তব্য ছড়াচ্ছে। এ কারণে তিনি ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জিডিতে নিজের নিরাপত্তাও চান তিনি।

প্রতিবেশীরাও বলছেন, অ্যাকাউন্টটি ভুয়া

কৃপেশের প্রতিবেশী কাঞ্চন রায় দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “কৃপেশের মূল ফেসবুক আইডিতে আমি যুক্ত আছি। যে আইডি দিয়ে সাম্প্রদায়িক ও উসকানিমূলক পোস্ট দেওয়া হয়েছে, সেটি থেকে সম্প্রতি আমাকেসহ আরও অনেককে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছিল। পরে আমি কৃপেশকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানিয়েছেন যে, এই আইডি তার না। রবিবার ওই আইডি থেকেই আপত্তিকর পোস্ট দেওয়া হয়। বিষয়টি জানার পরই কৃপেশ থানায় জিডি করেন।”

আরেক প্রতিবেশী শাকিল আহমেদ দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “এটা আসলেই অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। উনি বলছেন যে, এই আইডি উনার না এবং থানায় জিডিও করছেন। তারপরেও উনাকে ব্লেম দেওয়াটা ঠিক না। উনি যদি সত্যি কোন অপরাধ করে থাকেন সেটা তদন্ত করে বের করা হোক। এই আইডি ওনার না বলে উনি যে স্টেটমেন্ট দিয়েছেন এটা তদন্ত করে বের করা হোক আসলে উনার কিনা।”

কৃপেশের চাচাতো ভাই কিরণ রায় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, কৃপেশ সিলেটের লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে প্রায় এক বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।

কৃপেশের ফুফা, স্থানীয় শিক্ষক বিকাশ রায় একই সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আগে সে পুলিশে চাকরি করত। বছরখানেক ধরে সে বাড়িতেই আছে। তবে চাকরির বর্তমান অবস্থা কী, তা আমাদের জানা নেই।”

তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক আহমেদ দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “কৃপেশ রায় পুলিশের একজন গরহাজির সদস্য। সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে তাকে রাজারগাঁও থেকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার করা জিডির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হবে।”

জিডির পরেও পুলিশ বাদি হয়ে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা তদন্তাধীন বিষয়। কিন্তু জিডি অপরাধ থেকে সুরক্ষা দেয়না। আমরা ধর্ম অবমাননা ও ডিজিটাল সুরক্ষা আইনে মামলা দিয়েছি। এবার ফরেনসিক করে বিস্তারিত খতিয়ে দেখা হবে।”

কৃপেশ রায় পুলিশের চাকরিতে আছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তিনি ৬/৭ মাস আগেই স্টেশন ত্যাগ করেছেন তবে আনুষ্ঠানিক ভাবে পদত্যাগ করেননি।” 

কৃপেশের প্রকৃত আইডি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সেখানে তিনি রাজনৈতিক কোন বিষয়ে পোস্ট করতেন না। বিগত এক বছরের বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ পোস্ট দিয়েছেন সেগুলো তার কোন একজন আত্মীয়র সাথে জমিজমা নিয়ে বিরোধ কেন্দ্রিক। বাকিগুলো পারিবারিক ছবি।