‘আমি না থাকলে ওর কী হবে?’—বিশেষ সন্তানের মা-বাবাদের অভিন্ন উদ্বেগ
নয় বছর চার মাস বয়সী আয়াতুল্লাহ মাহমুদ আয়াত এখন নিজের কিছু প্রয়োজনের কথা বলতে পারে। কী খেতে চায়, কখন স্কুলে যাবে—এগুলো জানাতে পারে সে। কয়েক বছর টানা থেরাপির পর এই পরিবর্তন এসেছে। তার মা উম্মে সালমার উদ্বেগ অবশ্য অন্য জায়গায়। তার প্রশ্ন, “আমি যখন থাকব না, তখন আমার সন্তানকে কে দেখবে?”
এই প্রতিবেদনের জন্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর অন্তত ৩০ জন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। তাঁদের প্রায় সবাই চিকিৎসা, থেরাপি, শিক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি দেখাশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে দূরত্ব, দীর্ঘ অপেক্ষা, বিশৃঙ্খলা এবং পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
সরকার বলছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভাতা ও সেবার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে মাসিক প্রতিবন্ধী ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। সুবিধাভোগীর সংখ্যা সাড়ে ৩৪ লাখ থেকে ৩৮ লাখে নেওয়ার কথা জানিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
কিন্তু একটি শিশুর নিয়মিত থেরাপির খরচই অনেক ক্ষেত্রে এর কয়েক গুণ। ব্যবধানটি বড়।
তিন বছর বয়সে প্রথম সন্দেহ
আয়াতের বয়স তিন বছর হওয়ার পর তার বিকাশের কিছু ভিন্নতা চোখে পড়ে উম্মে সালমার। পরিবারের সদস্যরা বলেছিলেন, সে হয়তো একটু দেরিতে কথা বলছে। বয়স বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে।
মাদ্রাসায় ভর্তির পর একজন শিক্ষক জানান, আয়াত বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে না। নির্দেশনা বুঝতে তার অসুবিধা হয়। সে অস্থির থাকে। এরপর তাকে সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড বা সিআরপিতে নেওয়া হয়।
উম্মে সালমা বলেন, “সিআরপিতে নিয়ে যাওয়ার পর একে একে অটিজমের লক্ষণগুলো মিলে যায়। হাত নাড়ানো, নিজের মতো করে খেলায় মগ্ন থাকা, প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া—চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে এসব আচরণ মিলে যায়।”
তখন অটিজম সম্পর্কে তার ধারণা ছিল না। শিশুর বাবা আশিক ইমরানও প্রথমে বিষয়টি মানতে পারেননি। উম্মে সালমা অবশ্য অপেক্ষা করেননি। শুরু করেন চিকিৎসা ও থেরাপি।
পরিবারটি বরিশালে থাকে। আয়াতের বাবা আশিক ইমরান তিন বছর বেকার থাকার পর সম্প্রতি সৌদি আরব গিয়েছেন। উম্মে সালমা অনলাইনের নকশীকাঁথা এবং পার্ল জুয়েলারি বিক্রি করেন। উম্মে সালমার দাবি, তাদের পারিবারিক মাসিক আয় ২৫হাজারেরও কম। আর্থিক টানাটানি থাকলেও স্পিচ ও অকুপেশনাল থেরাপির জন্য বারবার ঢাকা-বরিশাল যাতায়াত করতে হয়েছে। সন্তানের দেখাশোনার জন্য চাকরির সুযোগও ছাড়তে হয়েছে উম্মে সালমাকে। একপর্যায়ে তাঁকে নিজেকেও মনোবিদের পরামর্শ নিতে হয়।
সামাজিক চাপ ছিল আলাদা। সন্তানকে নিয়ে বাইরে গেলে তাঁকে শুনতে হয়েছে, “বাচ্চাকে সামলাতে পারেন না?” অটিজমের বৈশিষ্ট্যকে অনেকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখেছেন।
কয়েক বছর পর আয়াত নিজের কিছু প্রয়োজন জানাতে শিখেছে। তবে উম্মে সালমার মূল উদ্বেগ কাটেনি। সরকারি ভাতা বা সীমিত সহায়তাকে তিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা হিসেবে দেখেন না।
তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কথা বলেন, যেখানে থেরাপি, শিক্ষা, জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনে আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। তার চাহিদা শুধু বর্তমানের সেবা নয়। প্রশ্নটি দীর্ঘমেয়াদি দেখাশোনার।
আয়াতের অভিজ্ঞতা নিয়ে উম্মে সালমা ফেসবুকে লিখছেন। আরও কিছু পোস্ট দেখা যাবে এখানে ও এখানে। তিনি বলেছেন, এসব লেখা দেখে অন্য কোনো পরিবার লক্ষণ শনাক্ত করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে সেটিই তার উদ্দেশ্য পূরণ করবে। তবে সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে কটাক্ষও শুনতে হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, তিনি সন্তানের অসুস্থতা ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫-১৭ বছর বয়সী প্রায় ১.৭% শিশুর কোনো না কোনো শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং প্রায় ৩.৬% শিশু কোনো না কোনো কার্যক্ষমতার প্রতিবন্ধকতায় (functional difficulty) ভুগছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট নিবন্ধিত প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩৯.২৩ লাখ। যার মধ্যে পুরুষ ২৩.৫২ লাখ আর নারী ১৫.৬৭ লাখ।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির (সাবেক পিজি) অধীন ইন্সটিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিসঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা)-এর এক গবেষণা জরিপে দেখা গেছে গ্রামে প্রতি দশ হাজার শিশুর মধ্যে ১৪ জন শিশু অটিজম আক্রান্ত। অন্যদিকে শহরে এ সংখ্যাটি দশ হাজার জনে ২৫ জন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রতিবন্ধী ভাতা কার্যক্রমের জন্য সরকার ৪,৫৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। মাসিক ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করা হয়েছে। পূর্বে সাড়ে ৩৪ লাখ প্রতিবন্ধী এই সুবিধা পেলেও, এবারের বাজেটে সুবিধাভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৩৮ লাখে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের থেরাপি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সারাদেশের ৬৪টি জেলা ও ৩৯টি উপজেলায় সর্বমোট ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রগুলো থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে থেরাপিউটিক, কাউন্সেলিং ও রেফারেল সেবা এবং সহায়ক উপকরণ প্রদান করা হয়।
কীভাবে লক্ষণ শনাক্ত করা যায়?
সব শিশুর বিশেষ চাহিদা বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না। সেরিব্রাল পালসি (সিপি) বা ডাউন সিনড্রোমের কিছু বৈশিষ্ট্য জন্মের পরপরই দৃশ্যমান হতে পারে। তবে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার বা এএসডির লক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে শিশুর বয়স দুই বছর হওয়ার পর স্পষ্ট হয়।
স্নায়বিক, মানসিক বা শারীরিক বিকাশের ভিন্নতার কারণে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নানা ধরনের সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। কোনো শিশু চোখে চোখ রেখে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না-ও করতে পারে, কথা বলতে দেরি হতে পারে বা একই কাজ বারবার করতে পারে। ডাউন সিনড্রোম থাকা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ তুলনামূলক ধীর হতে পারে এবং কারও কারও জন্মগত হৃদ্রোগ থাকতে পারে। তবে কেবল কয়েকটি লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্তে না গিয়ে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন নেওয়া জরুরি।
চার ঘণ্টা অপেক্ষা, পাঁচ মিনিটের সাক্ষাৎ
আশিক মাহমুদ (ছদ্মনাম) নামের একজন সাংবাদিক তার ছোট ছেলেকে নিয়ে শাহবাগের ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিসঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম বা ইপনায় গিয়েছিলেন। সেখানে টিকিট, চিকিৎসক ও পরীক্ষার জন্য আলাদা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে তিনি জানান।
তার অভিযোগ, চিকিৎসকের কাছ থেকে তিনি সহানুভূতিশীল আচরণ পাননি। সন্তানের অবস্থা নিয়েও অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করা হয়। এরপর তিনি বেসরকারি চিকিৎসা নেওয়া শুরু করেন।
তিনি বলেন, “অন্তত চার ঘণ্টা বসে থেকে পাঁচ মিনিটের জন্য ডাক্তার দেখাতে পেরেছি। এত দূর থেকে এসে এত সময় অপেক্ষার পরও যদি ডাক্তার ভালোভাবে কথা না বলেন, তাহলে এখানে কেন যাব?”
তাঁর এলাকায় কাছাকাছি এমন সরকারি সেবা নেই। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভিড় বেশি—এটি তার পর্যবেক্ষণ। তবে ইপনায় দৈনিক কত রোগী আসেন, কতজন চিকিৎসক আছেন এবং রোগীপিছু গড় সময় কত—এই তিনটি তথ্য ছাড়া সমস্যাটির মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না।
এই প্রতিবেদনের জন্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অন্তত ৩০ জন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। তাদের প্রায় সবাই সরকারি সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে এক বা একাধিক সমস্যার কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সেবাকেন্দ্রের দূরত্ব, দীর্ঘ অপেক্ষা, ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা, চিকিৎসকের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া এবং নিয়মিত থেরাপির সীমিত সুযোগ। অপেক্ষার পুরো সময় শিশুকে সামলানোও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা, থেরাপি, স্কুল ও বিশেষ খাবারের জন্য একটি পরিবারকে মাসে গড়ে অতিরিক্ত ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। কেউ কেউ সন্তানের খরচ মেটাতে সম্পদও বিক্রি করেছেন। তারপরও সন্তান যথাযথ চিকিৎসা, থেরাপি বা শিক্ষা পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে তাদের সংশয় কাটে না।
কথা বলা পরিবারগুলোর অধিকাংশ শিশুর এএসডি বা এডিএইচডি রয়েছে; সেরিব্রাল পালসি ও ডাউন সিনড্রোম থাকা শিশু ছিল পাঁচজন। পরিবারগুলোর খুব কমই সরকারি ভাতা বা অন্য সহায়তা পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের দেখাশোনার জন্য মাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। এতে আয় কমার পাশাপাশি ব্যয় বেড়েছে। সরকারি ব্যবস্থায় আস্থার ঘাটতির কারণে আর্থিক চাপের মধ্যেও তারা বেসরকারি সেবার ওপর নির্ভর করছেন।
কয়েকজন অভিভাবক বলেছেন, সুবর্ণ নাগরিক কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া ভাতা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। ওই ভাতার জন্য সন্তানকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতেও তারা অনাগ্রহী।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর পরিবারকে অন্য আরেকটি পরিবারের তুলনায় গড়ে প্রতিমাসে ১৩ শতাংশ বেশি টাকা খরচ করতে হয়। বাংলাদেশে যদি কোনো পরিবারে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি থাকেন, তাহলে সেই পরিবারের দারিদ্র্যে বসবাসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এমন পরিবারগুলোর দারিদ্র্যের হার ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ, প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা পরিবারগুলো অন্যান্য পরিবারের তুলনায় অনেক বেশি অর্থনৈতিক সংকট ও দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়।
দুই সন্তান, থেমে যাওয়া থেরাপি
যখন একটি পরিবারে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর সংখ্যা একের অধিক হয়, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন।
মানসুরা হোসাইনের দুই সন্তান সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত। এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের প্রতিটি প্রয়োজন ঘিরেই প্রতিদিন তার সকাল শুরু হয়। একজন এখনো নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে পারে না, এমনকি কখন ওয়াশরুমে যেতে হবে, সেটিও বোঝাতে পারে না। অন্যজনেরও সার্বক্ষণিক তদারকি প্রয়োজন। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেন তার জীবন একটি দীর্ঘ দায়িত্বের নাম।
মানসুরা একক মা। কয়েক বছর আগে তার স্বামী মারা গেছেন। দুই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান ও আরেক ছেলেকে নিয়ে তিনি সংসার চালান। বড় ছেলে যতটা সম্ভব সহায়তা করে।
মানসুরা হোসাইন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, "স্পেশাল বাচ্চাদের জার্নিটা শুধু ওদের না, বাবা-মায়েরও। এই পথটা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, ভেতরে ততটাই কঠিন।"
মাসিক ভাতায় ওষুধের ব্যয়ও মেটে না বলে তার অভিযোগ। খিঁচুনির ওষুধ, ডায়াপার, আলাদা খাবার ও নিয়মিত চিকিৎসার ব্যয় আছে। তার ভাষ্য, খরচ সামলাতে না পেরে অনেক পরিবার চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়।
দুই সন্তানকে তিনি একসময় নিয়মিত ঢাকার সিআরপিতে নিতেন। পরে ভারতে চিকিৎসাও করিয়েছেন। এখন প্রায় এক বছর ধরে থেরাপি বন্ধ। সন্তানদের বয়স ও ওজন বেড়েছে। একা দূরে নিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তার নিজের ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের সমস্যাও আছে।
নরসিংদী থেকে সপ্তাহে দুই দিন মিরপুরে যাতায়াতে শুধু গাড়িভাড়া লাগত প্রায় আড়াই হাজার টাকা। দুই সন্তানের থেরাপি ফি ছিল দুই হাজার টাকা। অর্থাৎ এক দিনে সরাসরি ব্যয় প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা। মাসে আট দিন গেলে এই দুই খাতেই প্রায় ৩৬ হাজার টাকা লাগে। ওষুধ ও অন্যান্য ব্যয় এর বাইরে।
থেরাপির মান নিয়েও তার অভিযোগ আছে। দুই বছর সেবা নেওয়ার পরও সন্তানদের অবস্থা, ভবিষ্যৎ এবং ঘরে কীভাবে পরিচর্যা করতে হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা পাননি বলে জানান তিনি।
মানসুরার অভিজ্ঞতা ও সন্তানদের কিছু ভিডিও তার ফেসবুক পেজে এবং এখানে, এখানে, এখানে ও এখানে দেখা যাবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একেক ধরনের ব্যবস্থা
“বাংলাদেশে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থায় এখনো একটি সমন্বিত জাতীয় মানদণ্ড গড়ে ওঠেনি। ফলে একেকটি প্রতিষ্ঠান একেকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও থেরাপি-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা, কোথাও আবার শুধু স্কুলিং-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা দেখা যায়। কিন্তু একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য শিক্ষা, থেরাপি, জীবনদক্ষতা ও সামাজিক অভিযোজন এই সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি,” কথাগুলো বলেন, কিডজিল্যান্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ নাজমুল হাসান।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের অনেক বিশেষ বিদ্যালয় মূলত অভিভাবকদের তাগিদ, থেরাপিস্টদের উদ্যোগ বা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে বিশেষ শিক্ষা একটি নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। সেখানে শিশুর বয়স, সক্ষমতা ও বিকাশের স্তর অনুযায়ী আলাদা কারিকুলাম থাকে।
দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় বিশেষ স্কুলে থেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, “মালয়েশিয়ায় আমি দেখেছি, একটি শিশুর শারীরিক বিকাশ, ভাষাগত দক্ষতা, সামাজিক আচরণ, মানসিক বিকাশ ও শেখার সক্ষমতা আলাদা করে মূল্যায়ন করা হয়। তারপর সেই অনুযায়ী শিক্ষা ও থেরাপির পরিকল্পনা করা হয়। বাংলাদেশেও এই ধরনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।”
বিশেষ শিশুরা মূলধারার শিক্ষায় ফিরতে কেন সমস্যায় পড়ে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশেষ বিদ্যালয় থেকে মূলধারার শিক্ষায় শিশুকে স্থানান্তর করা।
“অনেক শিশু একাডেমিকভাবে ভালো করলেও সাধারণ স্কুলের পরিবেশে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। কারণ সেখানে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী, ভিন্ন ধরনের শব্দ, নতুন নিয়ম এবং কম ব্যক্তিগত সহায়তা থাকে। ফলে শিশুটি মানসিকভাবে চাপে পড়ে যায় এবং অনেক সময় আবার বিশেষ বিদ্যালয়ে ফিরে আসে।”
তিনি আরও বলেন, সাধারণ স্কুলে ভর্তির আগে একটি ‘ব্রিজিং বা ট্রানজিশন ইউনিট’ থাকা দরকার, যেখানে শিশুকে ধীরে ধীরে মূলধারার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
তার মতে, অনেক অভিভাবক মনে করেন সপ্তাহে এক-দুই দিন থেরাপি দিলেই শিশুর উন্নতি হবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়।
“একটি শিশুকে টয়লেট ব্যবহার শেখানো, নিজে খাওয়া, পোশাক পরা, ব্যাগ গুছানো, ক্লাসে বসে থাকা বা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা এসব শেখাতে নিয়মিত অনুশীলন দরকার। দিনে কয়েক ঘণ্টা ধারাবাহিকভাবে কাজ না করলে এই দক্ষতাগুলো গড়ে ওঠে না।”
তিনি জানান, বিদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিশুদের দিনে আট থেকে দশ ঘণ্টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মধ্যে রাখা হয়, যাতে বাস্তব জীবনের অভ্যাসগুলো তৈরি হয়। তার মতে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর চিকিৎসা ও শিক্ষার পাশাপাশি বাবা-মায়ের মানসিক সহায়তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“অনেক পরিবার এখনো এই ভিন্নতাকে রোগ, অভিশাপ বা সাময়িক সমস্যা মনে করে। ফলে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়। আবার অনেক মা-বাবা সামাজিক চাপ, আত্মীয়স্বজনের মন্তব্য ও ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাই অভিভাবকদের জন্য কাউন্সেলিং সেবা চালু করা জরুরি।”
তিনি সরকারের প্রতি কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন। যেমন, বিশেষ শিক্ষার জন্য জাতীয় গাইডলাইন ও মানসম্মত কারিকুলাম প্রণয়ন, প্রতিটি জেলায় অ্যাসেসমেন্ট ও ট্রানজিশন ইউনিট চালু করা, মূলধারার বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ, স্পিচ, অকুপেশনাল ও বিহেভিয়ার থেরাপিস্টদের জন্য লাইসেন্সিং ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য জীবনদক্ষতা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ।
“আমার বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে অনেক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুই স্বনির্ভর হতে পারবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুকে আলাদা করে রাখা নয়, বরং তাকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করে আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।”
নাজমুল হাসান তার ইউটিউব চ্যানেলে বিশেষ শিশুদের থেরাপির নানা পদ্ধতি হাতেকলমে দেখিয়ে দেন। যেটি বাবা-মা কে কিছুটা উপকৃত করতে পারে।
তার থেরাপিবিষয়ক ভিডিওগুলো দেখা যাবে এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এই পোস্টে।
আইন আছে, বাস্তবায়ন কত দূর
ইউনিসেফ বাংলাদেশের চিফ অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি মিগুয়েল মেতেউস মুনোজ দ্য ডিসেন্টকে লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন, শিক্ষা, সহায়ক উপকরণ ও পারিবারিক সহায়তা দরকার। এসব চাহিদা পূরণে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বেসরকারি সেবার মান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইউনিসেফ বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮-এর কথা উল্লেখ করেছে। এই আইনে পুনর্বাসন শিক্ষা, পেশাগত চর্চা এবং ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ও স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের নিবন্ধনের কাঠামো রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালে এ আইনের বিধিমালা জারি হয়েছে।
ইউনিসেফ বলেছে, থেরাপি যোগ্য স্নাতক থেরাপিস্টের মাধ্যমে দেওয়ার সরকারি নির্দেশনা আছে। নিবন্ধন, স্বীকৃতি, মান নিশ্চিতকরণ ও তদারকি পুরোপুরি কার্যকর হলে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর জবাবদিহি বাড়তে পারে।
ইউনিসেফ ২৫ জেলার ২১১টি সেবাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে দেশের প্রথম সেবামানচিত্র তৈরি করেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি কার্যকর থাকার কথা বলা হয়েছে। সেবার প্রাপ্যতা, প্রবেশগম্যতা, অর্থায়ন ও দক্ষ জনবলের ঘাটতিও চিহ্নিত করা হয়েছে।
‘সরকারি স্কুলগুলোতে অনেক জায়গায় আসন শূণ্য’
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামাজিক নিরাপত্তা অধিশাখার পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন দ্য ডিসেন্টকে বলেন, বিশেষ শিশুদের নিয়ে সরকারি যে স্কুলগুলো রয়েছে সেই স্কুলগুলোর অনেক জায়গায় আসন শূন্য রয়েছে। বাবা-মায়েরা স্কুলে ঠিকমতো পাঠাতে চাচ্ছে না। এর কারণটা হচ্ছে, বাবা-মায়েরা প্রতিবন্ধী বাচ্চাদেরকে বাইরে দিতে এখনো অতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তাদের কাছে রাখতে চান। এছাড়া আমাদের প্রত্যেক জেলায় এবং বেশ কিছু উপজেলায় সব মিলিয়ে ১০০টির বেশি সার্ভিস সেন্টার রয়েছে। সেখান থেকেও সেবা নিতে পারেন। তারপরও আমাদের স্কুল যে পর্যাপ্ত না, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেক জেলায়, প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে অন্তত প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় করার পরিকল্পনা আছে এবং সেই পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।
বেসরকারি স্কুলগুলোর মাননিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে আমাদের যেমন দায়িত্ব আছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগেরও একটা দায়িত্ব রয়েছে যেহেতু বিষয়টি স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট। দায়িত্ব হলো বেসরকারি স্কুলগুলো সত্যিকার অর্থেই ভালো সেবা দিচ্ছে কি না।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কর্মমুখী একটা প্রশিক্ষণ দরকার, সেটা সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের বর্তমানে অনেকগুলো এ বিষয়ক প্রকল্প চলমান রয়েছে, এবং আগামীতেও আরও প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।