কারা সেই দুই সাবেক সেনাসদস্য যাদের শঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে সরকার?
দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা করে সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। নিষিদ্ধঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সদস্যের যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার পর এই নির্দেশনা জারি করা হয়।
গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো একটি চিঠিতে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। দুই পৃষ্ঠার চিঠির উপরিভাগে 'গোপনীয়' লেখা থাকলেও দুইদিন ধরে এটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
শনিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন জানিয়েছেন, এখনো কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা যায়নি। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার শঙ্কা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সতর্কবার্তার বিষয়ে কাজ শুরু করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।
এডিশনাল আইজিপি কামরুল আহসানের স্বাক্ষরে চিঠিটি ইস্যু করা হয়। দ্য ডিসেন্ট এ ব্যাপারে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে আপনাকে কোনো মন্তব্য দিতে পারবো না আমি।”
তবে পুলিশের বিশেষায়িত শাখা এসবি, এটিইউ ও সিটিটিসির অন্তত তিনজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দ্য ডিসেন্টকে চিঠি প্রাপ্তির কথা নিশ্চিত করেছেন।
চিঠির প্রথম পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, "সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী আবু বক্কর আবু মোহাম্মদ এর সাথে চাকরিচ্যুত দুই জন সেনাসদস্যের (কপি সংযুক্ত) নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহে (জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ/সেনাবাহিনীর সদস্য অথবা স্থাপনাসমূহ, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্রসমূহ, শাহবাগ চত্বর প্রভৃতিতে) বোমা বিস্ফোরণ এমনকি দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে মর্মেও জানা যায়। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকতে পারে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
এমতাবস্থায়, বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহের নিরাপত্তা জোরদারকরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এছাড়াও নজরদারি বৃদ্ধিসহ বর্ণিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও অনুরোধ করা হলো।"
পরের পৃষ্ঠায় "হামলা পরিকল্পনাকারী ব্যক্তিদের নাম এবং পরিচয়" হিসেবে দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়েছে।
তাদের একজন হলেন, মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদ এবং অন্যজন মোঃ রাকিব হাসান। এদের উভয়ের বিভিন্ন ছদ্মনাম রয়েছে।
দ্য ডিসেন্ট পুলিশ ও গোয়েন্দাদের একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছে, এই দুই ব্যক্তির মধ্যে মাহেদ সেনা সদস্য; যার বাড়ি সিলেটে। রাকিব সেনা সদস্য নন। তার বাড়ি ঢাকার ধামরাই এলাকায়।
এদের মধ্যে মাহেদ কোথায় আছেন বা তাকে গ্রেফতার করা হয়েছ কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রাকিবকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। তাকে ঢাকার নিকটবর্তী একটি থানায় তাকে রাখা হয়েছে।
গোপনীয় চিঠিতে দুই সেনাসদস্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে একজন মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদ। কিন্তু অন্যজনের নাম চিঠিতে নেই। দ্য ডিসেন্ট-কে কোন সূত্র তার পরিচয়ের বিষয়ে কিছু জানাতে পারেনি।
মাহেদের ফেসবুক প্রোফাইলে যা পাওয়া গেছে
গোপনীয় চিঠিতে সেনা সদস্য মাহেদ এবং সিভিলিয়ান রাকিবের ফেসবুক প্রোফাইলের লিংক যুক্ত করা হয়েছে। তাদের উভয়ের প্রোফাইল দুটি বর্তমানে ডিএক্টিভ রয়েছে।
তবে আলোচ্য চিঠি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের আগে থেকে অনলাইন স্পেস মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদের ফেসবুক প্রোফাইলটি দ্য ডিসেন্ট এর পক্ষ থেকে অনুসরণ করা হতো। এতে তার বিভিন্ন সময়ের বেশ কিছু পোস্টের স্ক্রিনশট সংগ্রহ করেছে দ্য ডিসেন্ট।
এসব পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাবেক এই সেনা সদস্য নিয়মিত উগ্রপন্থী বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট শেয়ার দিতেন। সিলেট কেন্দ্রিক অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা করার পাশাপাশি নিয়মিত উগ্রপন্থী লেখালেখি করতেন। এমনকি ভিন্ন চিন্তার ব্যক্তিদের হত্যার আকাঙ্খা জানিয়ে পোস্ট দিতেন তিনি। আল-কায়েদা নেতা আনোয়ার আল আওলাকির ছবিও পোস্ট করতেন তিনি।
২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট তিনি ফেসবুকে লেখেন, “সেনাবাহিনী দলগত মুরতাদ। প্রথমত এর কারণে বারাত। দ্বিতীয় বারাতের কারণ হলো ওরা জালেম। তৃতীয় বারাতের কারণ হলো ওরা আওয়ামী দোসর।”

সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আল্লাহর জমিন প্রশস্ত। সুতরাং যে জমিনে আল্লাহর সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাফরমানি করতে হয়, শিরক করতে হয়, তাগুতের কাছে বিচার চাইতে হয়, সে জমিন হয় ফিতনামুক্ত করার চেষ্টা করো তলোয়ার দ্বারা, অথবা সে জমিন ত্যাগ করো।”
৫ সেপ্টেম্বর এক পোস্টে তিনি লেখেন, “মাজারপূজারি, মিলাদুন্নবী পালনকারীরা মুশরিক, বেদাতি। এদেরকে হত্যা করা বৈধ, রক্ত সর্বাবস্থায় হালাল। সুতরাং, হে মুমিনরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো।”
জুলাইয়ের ১৬ তারিখে এক পোস্টে তিনি বলেন, “তারা জঙ্গি বলে আমাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ফেলতে চায়। জানিয়ে দাও, এটাই আমাদের পরিচয়। আমি কে, তুমি কে—জঙ্গি, জঙ্গি।”

২০২৫ এর ১৫ আগস্ট মাহেদের একটি পোস্ট ভাইরাল হয় ফেসবুকে। সেটিতে লিখেছিলেন, “১৫ আগষ্ট সারা দিন...বঙ্গবনল্ডুকে তাকফির করার দিন...। পুরো শেখ পরিবার কাফের শুধু নাবালক বাচ্চারা ছাড়া , শেখের অনুসারীরা কাফের, তার দলের নেতারা কাফের, কর্মীরা কাফের। তাদেরকে মুসলমান মনে করা শায়েখরাও কাফের।”
দ্বিতীয় যে সেনা সদস্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে (নাম উল্লেখ করা হয়নি) চিঠিতে তার পরিচয় জানাতে পারেনি কোন সূত্র।
তবে চিঠিতে উল্লেখিত সিভিলিয়ান রাকিব হাসান ছদ্মনামে একাধিক ফেসবুক আইডি পরিচালনা করেন। তার মূল আইডিটি ডিএক্টিভ থাকলেও অন্য আরও দুটি আইডি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনি জঙ্গি সংগঠন আইএস এর সমর্থনে বিভিন্ন কন্টেন্ট শেয়ার করতেন। শেষে ‘উসামা’ নামের একটি আইডি থেকে ইরাকে আইএস জঙ্গিদের পতাকা বহনের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশন দেয়া হয়েছে, “দুটি পথ আছে: হয় বিজয়, যা আমরা অর্জন করি, অথবা জান্নাত, যেখানে রয়েছে সবচেয়ে মনোরম আবাস। আমরা হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করি না, হাজার হাজার বীর জড়ো করেও নয়। আমরা সেই বিশ্বাস নিয়ে যুদ্ধ করি, যার পতাকা আমাদের প্রাথমিক দিনগুলোতে বিজয় নিশ্চিত করেছিল। দারুল ইসলাম।”

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদ বা ধর্মীয় উগ্রপন্থার আলাপ নতুন নয়।
গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি একতলা মাদ্রাসা ভবনে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মাদ্রাসা ভবনটির দুটি দেয়াল উড়ে যায় এবং নারী-শিশুসহ চারজন আহত হন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৯টি তাজা বোমা, গ্যালনভর্তি হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, এসিটোন ও নাইট্রিক অ্যাসিডসহ ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক, বোমা তৈরির পাউডার, শর্টগানের গুলিসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করে।
উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল নামের যে মাদ্রাসা ভবনটিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, সেটি পরিচালনা করতেন শেখ আল-আমিন ওরফে রাজিব ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। আল-আমিন আইএস মতাদর্শী ‘নিউ-জেএমবি’র সঙ্গে যুক্ত বলে দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছে সন্ত্রাস দমন নিয়ে কাজ করা পুলিশের একাধিক সংস্থার সূত্র। ইতোমধ্যে আল-আমিনের নামে সন্ত্রাসবিরোধী ধারাসহ সাতটি মামলা ছিল। সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
তাকে জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত ছিলেন একাধিক সংস্থার অন্তত তিনজন কর্মকর্তা দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো। এই লক্ষ্যে আল-আমিন ও আবু বকর মোট ৮৫টি বোমা তৈরি করেন ও বিতরণ করেন।
এর আগে ১ ডিসেম্বর কয়েকজন বাংলাদেশি আলেম পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে খারেজি সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করে সংগঠনটির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত না হতে বাংলাদেশিদের পরামর্শ দেন। এরপর টিটিপির পক্ষ থেকে ভিডিও বার্তা দিয়ে ওই আলেমদের সতর্ক করা হয়। জঙ্গি সংগঠনটির অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের কেউ কেউ তাদের হুমকিও দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে একাধিক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর দ্য ডিসেন্টের এক প্রতিবেদনে ফয়সালের নিহত হওয়ার বিষয়টি সর্বপ্রথম বাংলাদেশে প্রকাশ্যে আসে।
এছাড়াও, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ‘মুরতাদ’ আখ্যা দিয়ে অনলাইনে পরিচালিত ক্যাম্পেইন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য ডিসেন্ট।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় কারা জড়িত, তা জানা যায়নি। পুলিশের চিঠিতে গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।