‘ধারণা করে’ আ.লীগ নেতাকর্মী খুনের ভিত্তিহীন পরিসংখ্যান দিলেন ইমি

Roby Hossain
লেখক
রবি হোসাইন
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

২০২৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বাম জোটের প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা এস কে তাসনিম আফরোজ ইমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে যত মানুষ নিহত হয়েছেন, গত দুই বছরে তার প্রায় তিনগুণেরও বেশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে তার এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরে দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে আলাপকালে ইমি নিজেই বলেছেন, বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে তার জানা তথ্যের ভিত্তিতে তিনি ওই সংখ্যা ‘ধারণা’ করেছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইমি লিখেছেন, “জুলাইতে যত মানুষ মারা গেসিল, আওয়ামীলীগের তার প্রায় তিনগুণেরও বেশি নেতাকর্মী খুন হইসে গত দুই বছরে।”

অর্থাৎ তার দাবি অনুযায়ী, জুলাইয়ের আন্দোলনে যত মানুষ নিহত হয়েছেন, গত দুই বছরে তার প্রায় তিনগুণ বা তারও বেশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। 

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর বা ওএইচসিএইচআর (OHCHR) ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও সহিংসতা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া মৃত্যুর তথ্যের ভিত্তিতে তাদের ধারণা, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।

এই হিসাবের তিনগুণ করলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় ৪,২০০।

অর্থাৎ ইমির বক্তব্য ঠিক হলে গত দুই বছরে আওয়ামী লীগের প্রায় ৪,২০০ নেতাকর্মী নিহত হওয়ার কথা।

কিন্তু দ্য ডিসেন্ট যেসব প্রকাশিত তথ্য ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করেছে, তার কোনোটিতেই এর কাছাকাছি সংখ্যাও পাওয়া যায়নি। 

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নিজেদের ওয়েবসাইটে নিহত নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে।

তালিকাটির ভূমিকায় দলটি দাবি করেছে, জুলাইয়ের আন্দোলন এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তাদের ৫৩০ জন নেতা, কর্মী ও সমর্থক নিহত হয়েছেন।

ওই তালিকায় ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর পর্যন্ত নিহতদের মাসভিত্তিক সংখ্যাও দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামীপন্থী সংগঠন গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স বা জিসিডিজি (GCDG) ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ২১৩ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

এই দুই উৎসের দাবিই ইমির বক্তব্য থেকে অনেক কম। 

২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাতে বলা হয়, ওই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে হত্যার ঘটনায় দুই হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে।

এর মধ্যে শুধু মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে হত্যা মামলা হয়েছে ৯৩৪টি।

একই প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যের বরাতে বলা হয়, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৭৭ জন এবং মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন।

তবে এসব পরিসংখ্যান সারাদেশের সামগ্রিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে। এগুলো শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিহত হওয়ার হিসাব নয়। 

দাবির উৎস জানতে দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে এস কে তাসনিম আফরোজ ইমির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়।

আওয়ামী লীগের নিজেদের প্রকাশিত তালিকায় ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর পর্যন্ত ৫৩০ জন নিহতের তথ্য থাকার কথা উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, ওই তালিকাটি হালনাগাদ নয়।

তবে আওয়ামী লীগের কতজন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন—এমন কোনো হালনাগাদ তালিকা বা নির্দিষ্ট তথ্য তিনি দ্য ডিসেন্টকে দিতে পারেননি।

জুলাইয়ে নিহত মানুষের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বা তার বেশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন—এ দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রায় তিন গুণ কাছাকাছি বা তার বেশি, হ্যাঁ, এটা বলছি।”

কোন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি এই সংখ্যা বলেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ইমি বলেন, “আমি যতগুলা ঘটনা জানি, আমার মনে হয়েছে সংখ্যাটা এরকম।”

পরে তিনি স্বীকার করেন, তার জানা বিভিন্ন ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই তিনি সংখ্যাটি ধারণা করেছেন।

দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়, ওএইচসিএইচআরের হিসাবে জুলাই-আগস্টে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হয়ে থাকলে তার তিনগুণ দাঁড়ায় প্রায় ৪,২০০। অথচ প্রকাশিত কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহতের সংখ্যা এর কাছাকাছি পাওয়া যাচ্ছে না।

এর জবাবে ইমি বলেন, “আচ্ছা, বুঝতে পারলাম। তাইলে ব্যাপারটা আমি রিভাইজ করার চেষ্টা করতে পারি। আমার যদি মনে হয় যে আসলে আমার কাছে যেই ইনফরমেশন আছে সেটা রং, আমি এটা কারেক্ট করে নিব।”

ইমির বক্তব্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহত হওয়ার সংখ্যা প্রায় ৪,২০০ বা তারও বেশি হওয়ার কথা।

কিন্তু আওয়ামী লীগের নিজেদের প্রকাশিত তালিকায় ৫৩০ জন এবং আওয়ামীপন্থী জিসিডিজির প্রতিবেদনে ২১৩ জন নিহত হওয়ার দাবি পাওয়া যায়।

ইমিও তার দাবির পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা যাচাইযোগ্য তথ্য দিতে পারেননি এবং বলেছেন, নিজের জানা বিভিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে তিনি সংখ্যাটি অনুমান করেছেন।

জুলাইয়ে নিহত মানুষের তুলনায় গত দুই বছরে প্রায় তিনগুণেরও বেশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।