পাকিস্তান আমলে নয়, স্বাধীনতার পর জেনারেল হন এম এ জি ওসমানী

Mohammed Raihan
লেখক
মোহাম্মদ রায়হান
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে নিয়ে একটি ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে—পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তাকে জেনারেল পদ দেওয়ার সময় তার উচ্চতা নিয়ে একজন পাকিস্তানি জেনারেল প্রশ্ন তুলেছিলেন।

ফেসবুকে Munim Shaju নামের একজন লিখেছেন:“আজ খুব মনে পড়ছে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর সেই ঐতিহাসিক উক্তি--যখন তুখোড় ট্যালেন্ট বাংগালী ছেলে ওসমানীকে জেনারেল রেঙ্ক দিতে বাধ্য হয়ে পাকি জেনারেল তাচ্ছিল্য করে বলেছিল, ‘তোমার হাইট যেখানে রিকয়ারমেন্টের থেকে কম সেখানে কীভাবে সাহস কর জেনারেল রেঙ্ক নিতে?’ ওসমানী সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন— ‘Napoleon was two inches lower than me!!’”

পোস্টটি দেখা যাবে এখানে

একই ধরনের বক্তব্য ঢাকা পেপার্সের ফটোকার্ডেও ব্যবহার করা হয়।

গত ১ সেপ্টেম্বর অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা পেপার্স-এর ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীকে নিয়ে পোস্ট করা একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, “তুখোড় ট্যালেন্ট বাঙালি ছেলে ওসমানীকে জেনারেল র‍্যাঙ্ক দিতে বাধ্য হয়ে পাকি জেনারেল তাচ্ছিল্য করে বলেছিল 'তোমার হাইট যেখানে রিকয়ারমেন্টের থেকে কম সেখানে কীভাবে সাহস কর জেনারেল রেঙ্ক নিতে?' ওসমানী সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল-'নেপোলিয়ন আমার চেয়ে দুই ইঞ্চি খাটো ছিলেন!”

উক্ত ফটোকার্ডে দুটি দাবি পাওয়া যায়। প্রথমত, জেনারেল ওসমানীকে জেনারেল পদমর্যাদা দিতে একজন পাকিস্তানি জেনারেল বাধ্য হয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, ওসমানীকে জেনারেল পদমর্যাদা দেওয়া ওই ব্যক্তি ছিলেন পাকিস্তানি এবং ঘটনাটি ঘটেছিল পাকিস্তান আমলে। 

কিন্তু যাচাই করে দাবি দু’টির সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

সংশ্লিষ্ট কী-ওয়ার্ড সার্চ করে  মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া সম্পাদিত 'স্বাধীনতা: সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা' বইয়ে এরকম একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।

বইটির ২য় খণ্ডের ৪৬ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “খর্বকায় ওসমানী সাহেবের খড়ের আঁটির মতো দুই বান্ডিল গোঁফ ছাড়া বাদ বাকি চেহারা ছবি দেখে জেনারেল বলে মনেই হতো না। তার উচ্চতা নিয়ে তিনি একটি কাহিনী অনেককেই শুনিয়েছেন। কিংস কমিশনের মৌখিক পরীক্ষায় বোর্ডের একজন পরীক্ষক তাকে বলেছিলেন, মি. ওসমানী, তুমি কি তোমার এই খর্বাকৃতি অবয়ব সম্বন্ধে অবহিত আছ? ওসমানী সাহেব বললেন, হ্যাঁ, আছি। ঐ প্রশ্নকর্তা আবার বললেন, এই ছোটখাট শরীর নিয়ে তুমি কী করে বিশালদেহী পাঞ্জাবী, সিন্ধী, পাঠানদেরকে কমান্ড করবে? তরুণ ওসমানী জবাব দিলেন, স্যার, আমার খর্বাকৃতি সম্বন্ধে আমি যেমন সচেতন আছি, তেমনি আমি অবগত আছি নেপোলিয়ন বোনাপার্টি থেকে আমি দু'ইঞ্চি লম্বা।”

অর্থাৎ, কিংস কমিশনের মৌখিক পরীক্ষার সময় ঘটনাটি ঘটেছিলো বলে উক্ত বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। কিংস কমিশন বলতে সাধারণত ব্রিটিশ আমল এবং তৎকালীন অবিভক্ত ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীতে নিয়োগের প্রক্রিয়াকে বোঝানো হতো। 

অর্থাৎ, এটি ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীতে নিয়োগের সময়কার ঘটনা, পাকিস্তান আমলে নয়।

এছাড়াও, ঢাকা পেপার্সের ফটোকার্ডে ঘটনাটিকে ওসমানীর ‘জেনারেল র‍্যাঙ্ক’ পাওয়ার সময়কার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৭ অক্টোবর ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

এর পরদিন তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন। ১৯৫৬ সালে তিনি কর্নেল হন এবং ১৯৬৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওই পদেই ছিলেন।

অর্থাৎ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি জেনারেল পদে উন্নীত হননি।

বাংলাপিডিয়ায় আরও বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর ওসমানীকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ‘জেনারেল’ পদে উন্নীত করা হয়, যা ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছিল।

অর্থাৎ, ওসমানীকে জেনারেল পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সময়ে। পাকিস্তান আমলে নয়।

এ বিষয়ে দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে ঢাকা পেপার্সের হেড অব ইনপুট আরিফ রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

তিনি বলেন, ফটোকার্ডটির লেখায় তাদের পক্ষ থেকে “একটি বড় তথ্যগত ভুল” হয়েছিল।

তার ভাষ্য, “এআই ব্যবহারের কারণে এই অনিচ্ছাকৃত ভুলটা হয়। আমরা কার্ডটা ঠিক করে এবং রেফারেন্স উল্লেখ করে সংশোধনী দিয়েছি।”

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এমন ভুল এড়াতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সতর্ক করা হয়েছে।

এছাড়াও সংশোধনী প্রকাশ করে ঢাকা পেপার্স ফেসবুক পোস্টে জানায়, “ওসমানীর উক্তির প্রেক্ষাপট বর্ণনায় তাদের তথ্যগত ভুল হয়েছিল।”

ঢাকা পেপার্স জানায়, তাদের কার্ডে ঘটনাটি একজন পাকিস্তানি জেনারেলের সঙ্গে এবং ওসমানীকে ‘কর্নেল’ পদমর্যাদা দেওয়ার সময়কার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এই প্রেক্ষাপট সঠিক নয়।

সংশোধনীতে তারা বলে, ঘটনাটি আসলে ব্রিটিশ আমলের। তরুণ ওসমানী মিলিটারি রিক্রুটিং বোর্ডের মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সময় একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা তার কম উচ্চতা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন।

এর জবাবে ওসমানী নেপোলিয়ন বোনাপার্টের চেয়ে তিনি দুই ইঞ্চি লম্বা বলে মন্তব্য করেছিলেন—এমন বর্ণনা ঐতিহাসিক সূত্রেও পাওয়া যায়।

ঢাকা পেপার্সের ভাষ্য, “জেনারেল ওসমানীর এই উক্তিটি সঠিক হলেও এর প্রেক্ষাপট বর্ণনায় আমাদের তথ্যগত ভুল ছিল।”