Family of an Accused Disputes Police Account Reported by the Media

ছবিঃ সংগৃহীত
3 June 2026

গত এপ্রিলের শেষের দিকে কামরাঙ্গীচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে চার যুবককে গ্রেফতারের দাবি করেছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে পুলিশের দায়ের করা মামলা ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, ঢাকার কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওই চার যুবককে আটক করা হয়েছে।

আটক চার ব্যক্তি হলেন, মো. ইমরান চৌধুরী (২৯), মো. মোস্তাকিম চৌধুরী (২৫), রিপন হোসেন শেখ (২৮) ও আবু বক্কর (২৫)। পুলিশের বরাতে সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয় আটককৃতরা সন্ত্রাসী সংগঠন টিটিপির সাথে জড়িত। তবে দ্য ডিসেন্ট এই দাবি স্বাধীন ভাবে যাচাই করতে পারেনি।

আটককৃতদের মধ্যে আবু বক্করকে গ্রেফতারের স্থান ও সময় হিসেবে পুলিশের দায়ের করা মামলার এজহারে বলা হয়েছে, “কামরাঙ্গীরচরের তারা মসজিদ–সংলগ্ন কয়লাঘাট এলাকার একটি বাসা থেকে ২৭ এপ্রিল দিবাগত রাত ৩টা ৫ মিনিটে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৮ এপ্রিল সকাল পৌনে ছয়টার দিকে কেরানীগঞ্জের জিয়ানগর এলাকা থেকে মোস্তাকিমকে এবং সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুর শিকসন ব্রিজ–সংলগ্ন এলাকা থেকে রিপন ও আবু বক্করকে গ্রেপ্তার করা হয়। চারজনের মধ্যে ইমরান ও মোস্তাকিম আপন ভাই।”

কিন্তু আবু বক্করের পরিবারের দাবি, মামলার এজহারে বক্করকে গ্রেফতারের স্থান ও সময় বিষয়ে উল্লিখিত তথ্য এবং গোয়েন্দা পুলিশের বরাতে মিডিয়াতে প্রকাশিত তথ্য সঠিক নয়। 

পরিবার বলছে, বক্করকে ২৮ এপ্রিল সকালে নয়, বরং ২৭ এপ্রিল দুপুরে গ্রেফতার করা হয়। এবং গ্রেফতারের স্থান কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুর শিকসন ব্রিজ–সংলগ্ন এলাকা নয়, বরং তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে। চীনে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর তাকে আটক করা হয় এবং আটকের তৃতীয় দিনে পুলিশ তাকে গ্রেফতার দেখায় বলে দাবি পরিবারের। 

দৈনিক প্রথম আলো, যুগান্তর, ডেইলি স্টার, দেশরূপান্তর, ইত্তেফাক, ঢাকা ট্রিবিউনসহ মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলোতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রেস ব্রিফিং, গোয়েন্দা সূত্র ও মামলার এজহারের বরাতে বলা হয়েছে, আটকৃতদের কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। প্রতিবেদনগুলোতে অভিযুক্তদের পরিবারের ভাষ্য কিংবা অন্য কোন সূত্র থেকে আটকের স্থান ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়েছে এমনটা বলা হয়নি। শুধুই পুলিশের দায়ের করা মামলা এবং গোয়েন্দা পুলিশের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই খবর প্রকাশ করেছে।

মূলধারার মিডিয়ায় এই চারজনের গ্রেফতারের খবর প্রকাশের আগে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র থেকে আবু বক্করে গ্রেফতারের তথ্য এবং পাসপোর্টের একটি কপি দ্য ডিসেন্ট’র এর হাতেও এসেছিল। তবে ডিসেন্ট যে কোন খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে উগ্রবাদ সংক্রান্ত খবর প্রকাশের আগে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তার পক্ষের (পরিবার বা আইনজীবী) ভাষ্য, অভিযুক্তের উগ্রবাদী কার্যক্রমের প্রমাণাদি (যেমন অনলাইন কার্যক্রম বা অন্যান্য বিষয়) একাধিক সূত্র থেকে এবং নিজস্ব পদ্ধতিতে যাচাই করে নেয়ার নীতি মেনে চলে। এসব বিষয়াদি ছাড়া উগ্রবাদ ইস্যুতে কোন ধরনের রিপোর্ট প্রকাশ না করাই দ্য ডিসেন্ট এর নীতি।

আলোচ্য চার যুবকের গ্রেফতারের বিষয়েও প্রাপ্ত তথ্য যথেষ্ট না হওয়ায় এবং পরিবারের ভাষ্য না পাওয়ায় দ্য ডিসেন্ট খবরটি প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে।

পরে বাংলাদেশে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাস দমন নিয়ে কাজ করা একাধিক সংস্থার উচ্চপদস্থ একাধিক সূত্র দ্য ডিসেন্টকে জানায়, আবু বক্করকে কামরাঙ্গীরচর থেকে নয় বরং চীন যাওয়ার সময় বিমানবন্দর থেকেই আটক করা হয়েছে। এছাড়া সংবাদমাধ্যমে তাকে ২৮ এপ্রিল আটক করার কথা বলা হলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে তাকে ২৭ এপ্রিল দুপুরে আটক করা হয়েছে। 

অর্থাৎ, আবু বক্করের গ্রেফতারের সময় উল্লেখ করার ক্ষেত্রে অন্তত একদিনের তথ্য গরমিল করা হয়েছে মামলার এজহারে এবং মিডিয়াকে দেয়া গোয়েন্দা পুলিশের বক্তব্যে।

যা বলছে আবু বক্করের পরিবার

আবু বক্করের বোন জোছনা বেগম দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “২৭ তারিখ দুপুর ২টা ২০ এ আমার ভাইয়ের ফ্লাইট ছিল। ও এয়ারপোর্ট থেকে ফোন দিয়ে মাকে বলল, "মা, আমি ইমিগ্রেশন পার হইছি, প্লেনে উঠলে আর ফোন দিতে পারবো না।" এরপর থেকে ওর ফোন বন্ধ। পুলিশ পরের দিন আমাদের বাসায় আসলো তল্লাশি করতে, কিন্তু কিছুই পায় নাই। পুলিশকে জিজ্ঞেস করলে বলে থানায় গিয়ে যোগাযোগ করতে। তো আমি থানায় গেলাম পর বলতেছে র‌্যাবে আছে। তারপর আমরা আর কোন খবর পাই না। তো এখানে, ওখানে তারপর ডিবি অফিসে গেলাম। ওখানে গিয়ে ওর পরিচয় দিয়ে বললাম র‌্যাব নাকি ধরছে! তারা হাসতেছে আর বলতেছে এমন কোন কাহিনী আছে যে র‌্যাবে ধইরা ডিবি’র কাছে দেয়? উনারা স্বীকারই করে নাই। পরে আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানলাম ওর নামে মামলা হইছে। ডিবি, পুলিশ বা র‍্যাব কেউ আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনাই, কোনো সঠিক তথ্যও দেয় নাই।”

ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম দ্য ডিসেন্টকে অবশ্য বলেছেন, আবু বক্করকে মামলায় উল্লেখ করা সময়ের একদিন আগে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করার তথ্যটি সঠিক নয়। 

“আমরা তাকে কামরাঙ্গীরচরে আটক দেখাতে পারলে বিমানবন্দরে দেখাতে পারবো না কেন? যেখান থেকে আটক করা হয়েছে সেখানেই দেখানো হয়েছে”, বলেন তিনি।

র‌্যাব বিমানবন্দর থেকে আটক করে ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছে এমন তথ্য সঠিক কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এরকম কোন কিছু ঘটেনি। তবে তাকে বিমানবন্দর হয়তো জিজ্ঞাসাবাদ করে থাকতে পারে।”

কোন সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সে (আবু বক্কর) বলেছে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছে। কারা করেছে জানিনা।”

তিনি দাবি করেন, এত আগের তথ্য তার মনে নেই।  

ডিবি পুলিশের ব্রিফিংয়ের আগে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে গ্রেফতারের খবর

ডিবি পুলিশ আবু বক্করসহ অন্য তিনজনকে আটক করার কথা ২৯ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানালেও তার আগের দিন ২৮ এপ্রিল ফেসবুকে কিছু গ্রুপ ও পেইজ থেকে আবু বক্করকে আটকের তথ্য প্রচারিত হয়েছে।

যেমন, ২৮ এপ্রিল ‘দিনপত্র’ নামের একটি পেইজে বিমানবন্দর সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়, ২৭ এপ্রিল দুপুর ১৪:২৭ মিনিটে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে (MU-2036) গুয়াংজু যাওয়ার উদ্দেশ্যে আবু বক্কর ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। তবে গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই (সিটিইউবি)-এর নিকট আগে থেকেই তার জঙ্গি সম্পৃক্ততার তথ্য ছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ইমিগ্রেশনের আইএনএস (INS) এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। ​আটকের পর ইমিগ্রেশন নথিতে ‘সেলফ অফলোড’ প্রদর্শন করে এবং জিডি নং-২১৫০ মূলে তার বহির্গমন সীল বাতিল করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিকেল ১৬:০০ ঘটিকায় ডিজিএফআই-এর মেজর ফেরদৌস আহমেদ অভিযুক্ত আবু বক্করকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে বের করে র‍্যাব-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সিদ্দিকুর রহমানের নিকট হস্তান্তর করেন।

দ্য ডিসেন্ট এর পক্ষ থেকে একাধিকবার চেষ্টা করেও র‍্যাব-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সিদ্দিকুর রহমানের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

‘দিনপত্র’ ফেসবুক পেইজটির সাথে একটি ওয়েবসাইটের ঠিকানা যুক্ত রয়েছে যেটির নাম www.dinpatra.in; অর্থাৎ, ওয়েবসাইটের ডোমেইনটি ভারতীয়। তবে এটির ঠিকানা হিসেবে রয়েছে ঢাকার ১২০ তেজগাঁ শিল্পাঞ্চল এবং সম্পাদক হিসেবে রয়েছে মো: শাহাবুদ্দিন সম্রাট এর নাম রয়েছে। যদিও তার সাথে যোগাযোগের কোন উপায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আবু বক্কর ছাড়াও গ্রেফতার হওয়ার অন্য ৩ জনের মধ্যে ইমরান চৌধুরী ও মোস্তাকিম চৌধুরী আপন ভাই। তাদের পরিবারের সাথেও কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। তবে তাদের পরিবার দুই ভাইয়ের গ্রেফতার সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশের দেয়া তথ্যের বিষয়ে কোন অভিযোগ করেননি।

আবু বক্কর, ইমরান ও মোস্তাকিমের ফেসবুক আইডি খুঁজে পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট। এর মধ্যে মোস্তাকিমের আইডিটি লক করা। আবু বক্কর তার আইডির বায়োতে তিনি লিখে রেখেছেন, “শহিদি তামান্না বুকে লালন করি।” 

বক্করের ফেসবুক পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিনি ওসামা বিন লাদেন, মোল্লা ওমর, আরসা প্রধান আবু আম্মার জুনুনিকে নিয়ে পোস্ট করা বিভিন্ন কন্টেন্ট নিয়মিত শেয়ার দিতেন। এছাড়া গনতন্ত্রকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলে একাধিকবার পোস্ট করেছেন তিনি।

চারজনকে গ্রেফতারের পর পুলিশের দায়ের করা মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযানে আটককৃতদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ওয়ান শুটারগান, ১৪টি গুলি, তিনটি গুলির খোসা, একাধিক স্মার্টফোন, একটি ল্যাপটপ, মেটাল ডিটেক্টর, দুটি ড্রোন, সাতটি ঘড়ির বেল্ট, সামরিক পোশাক, জিহাদি বই, ৯০০ গ্রাম গানপাউডার ও পাঁচ বোতল অ্যাসিড উদ্ধার করা হয়েছে। আসামিরা বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন, সরকার ও দেশকে অস্থিতিশীল করতেই আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, বিস্ফোরক দ্রব্য, জিহাদি বই, ড্রোন ও সামরিক পোশাক নিজেদের কাছে রেখেছিলেন।

মানবাধিকার কর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, "সংশোধিত ৫৪ ধারা অনুযায়ী কাউকে আটক করতে হলে কী কারণে আটক করা হচ্ছে এবং তার অবস্থান পরিবারকে জানাতে হবে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাকে আদালতে হাজির করতে হবে। এমনটা যদি না হয় তাহলে সেই আটক কিংবা গ্রেপ্তার একটি বেআইনি আটক এবং গ্রেফতার। যেহেতু ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাকে আদালতে উপস্থিত করানো হয়নি, মানবাধিকার আইন অনুযায়ী এটা জোরপূর্বক গুম, যা মানবতা বিরোধী অপরাধও এবং এই অপরাধের বিচার করা হচ্ছে আইসিটি ট্রাইবুনালে, অন্যদিকে এসব অপরাধের ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে তো কোন লাভ হবে না। একটা অপরাধ দিয়ে তো আরেকটা অপরাধকে থামানো যাবে না। হাসিনার আমলে মানবতা বিরোধী অপরাধ হয়েছে, ইউনূসের আমলেও হয়েছে যা জোরপূর্বক গুমের দ্বারা হয় নাই, তবে বিচার বহিৰ্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। এখনও এসব অপরাধের ধারাবাহিকতা চলছে। যেসব বাহিনীর কর্মকর্তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার চলছে সেসব বাহিনী যদি এখনো সেসব অপরাধ করে তাহলে তো বুঝা যায় তারা এগুলো বন্ধ করবে না। বাংলাদেশের মানবাধিকার হরণ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের ধারাবাহিকতা চলতে পারে না এবং অপরাধের মাত্রা যতই ঘৃণ্য এবং অভিযুক্ত যত ভয়াবহ হউক না কেন।"