Illegal Exotic Animal Trade Thrives on Facebook

13 July 2026

বাংলাদেশে বাসাবাড়িতে এক্সোটিক পেট বা বিদেশি প্রাণি পোষার ট্রেন্ড এখন ক্রমন্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিড়াল-পাখির গণ্ডি পেরিয়ে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ঝুঁকছে বিপদজনক বিদেশি সাপ, ব্যাঙ, কচ্ছপ, গিরগিটির মতো সরীসৃপের দিকে। এই শখের আড়ালে গড়ে উঠেছে এক বিশাল অবৈধ অনলাইন বাজার।

ফেসবুক পেইজ ও গ্রুপের মাধ্যমে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে এসব বিদেশি প্রাণি। লালন-পালন করতে না পেরে অনেকেই এই বিদেশি এসব প্রাণিকে মুক্ত জলাশয় বা প্রকৃতিতে ছেড়ে দিচ্ছেন, যা বাংলাদেশের জলজ পরিবেশ ও দেশীয় প্রজাতিগুলোর অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট কী-ওয়ার্ড সার্চ করে দেখা গেছে, ফেসবুকে Exotic Animals & Reptile, Exotic Pets Community of Bangladesh, Turtle Breeders of Bangladesh, Exotic Animals of Bangladesh, Exotic Pet Empire Of Bangladesh সহ প্রায় ডজনখানেক গ্রুপ ও পেইজ রয়েছে যেখানে বিভিন্ন এক্সোটিক বিদেশি প্রাণি বিক্রি হচ্ছে। 

কী কী বিক্রি হচ্ছে

আগ্রাসী কচ্ছপ: ফেসবুক পেইজ ও গ্রুপগুলোতে বিভিন্ন ধরণের এক্সোটিক প্রাণি বিক্রি হতে দেখা গেছে। এই অনলাইন বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে আছে উত্তর আমেরিকার ক্ষতিকর ও আগ্রাসী প্রজাতির রেড-ইয়ার্ড স্লাইডার কচ্ছপ। এর পাশাপাশি ইয়েলো বেলিড স্লাইডার, পিঙ্ক বেলি সাইডনেক কচ্ছপসহ আরো বিভিন্ন প্রজাতির এক্সোটিক কচ্ছপ বিক্রি করতে দেখা গেছে। দেখুন এখানে এবং এখানে। 

সাপ: এছাড়া বল পাইথন, কর্ন স্নেক, মিল্ক স্নেক এবং ক্যাটরিনা সাপ বিক্রি হচ্ছে। দেখুন এখানেএখানে, এখানে

এই তালিকায় আরও রয়েছে গাছে থাকা সবুজ ও লাল রঙের গ্রিন ইগুয়ানা, মরুভূমির লিজার্ড এবং ঘরের কাঁচের পাত্রে রাখার জন্য রঙ-বেরঙের গেকো বা গিরগিটি। দেখুন এখানে এবং এখানে

মাকড়সা ও বিচ্ছু: শুধু সরীসৃপই নয়, কোনো কোনো গ্রুপ ও পেইজে বিষাক্ত ট্যারান্টুলা মাকড়সা, ক্ষতিকর স্করপিয়ন (বিচ্ছু) এবং প্যাকম্যান ব্যাঙও বিক্রি হতে দেখা যায়। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে

গত ২ জুলাই বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট ঢাকার রূপনগরের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রজাতির ১,১০৪টি এক্সোটিক প্রাণি উদ্ধার করে।  এর মধ্যে ছিল ৮৪৬টি রেড-ইয়ার্ড স্লাইডার, ১৩৮টি রিভস কচ্ছপ, ৫৬টি কমন স্ন্যাপিং টার্টল, ৩৮টি ইয়েলো-বেলিড স্লাইডার, ১৮টি পিংক-বেলিড সাইডনেক টার্টল, দুটি কর্ন সাপ, একটি মেক্সিকান ব্ল্যাক কিংস্নেক, একটি গোল্ডেন চাকুনি ট্যারান্টুলা, একটি ব্লাড লেগ ট্যারান্টুলা, একটি ডাম্পি ফ্রগ, একটি লেপার্ড গেকো এবং একটি রাউন্ড-টেইল লেপার্ড গেকো। 

এই ঘটনার পর ফেসবুক গ্রুপ ও পেইজে এসব এক্সোটিক প্রাণি বিক্রেতারা সতর্ক হয়ে যায়। তারা এসব প্রাণি বিক্রির পোস্টগুলো সরিয়ে ফেলে। দ্য ডিসেন্ট এরকম প্রাণি বিক্রির বেশ কিছু পোস্ট সংগ্রহ করে রাখলেও পরবর্তীতে এগুলো এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এসব এক্সোটিক প্রাণি কেন ক্ষতিকর

সমস্যার মূল সূত্রপাত ঘটে যখন এই প্রাণিদের আকার বড় হতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ছোট অবস্থায় দেখতে সুন্দর রেড-ইয়ার্ড স্লাইডার কচ্ছপগুলো দ্রুত বড় হয়ে যায় এবং এদের রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন অনেক মালিক এগুলোকে ঢাকার হাতিরঝিল, ধানমন্ডি লেক বা গ্রামীণ অঞ্চলের নদী-নালা ও উন্মুক্ত জলাশয়ে ছেড়ে দেন।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেড-ইয়ার্ড স্লাইডার কচ্ছপ পরিবেশের ওপর বিধ্বংসী প্রভাবের কারণে বেশ কয়েকটি দেশে আমদানি নিষিদ্ধ। স্থানীয় জলাশয়ে ছেড়ে দেওয়া হলে, এই প্রজাতিটি দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং দেশীয় প্রজাতির সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে জলজ বাস্তুসংস্থানকে বিপর্যস্ত করে তোলে।

এমনকি শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় করতে দেশীয় ইকোসিস্টেমের জন্য ক্ষতিকর এসব কচ্ছপের খোলসে নান্দনিক রঙ করে বিক্রির ঘটনাও ঘটছে। 

জানা যায়, রেড ইয়ার্ড স্লাইডার কচ্ছপের পেট, গায়ের চামড়া এবং একুয়ারিয়ামের পানিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে। কচ্ছপ ধরার পর শিশুরা হাত না ধুয়ে মুখে দিলে বা কচ্ছপকে চুমু খেলে এই জীবাণু পেটে চলে যায়। এর ফলে শিশুদের তীব্র ডায়রিয়া, বমি, পেটে ব্যথা এবং অনেক জ্বর হতে পারে। 

এছাড়াও এসব প্রাণি প্রাকৃতিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে রাক্ষুসে সাকার মাছের মতোই জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। 

আইন কী বলে

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ অনুযায়ী, লাইসেন্স বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পজেশন সার্টিফিকেট কিংবা পারমিট ছাড়া কোনো ব্যক্তি বন্যপ্রাণী লালন-পালন, আবদ্ধ অবস্থায় রাখা, দখলে রাখা, কেনাবেচা বা পরিবহন করতে পারবেন না।

বন্যপ্রাণী আইনের ধারা ২(২৫) অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রকার ও জাতের প্রাণী যারা বনে জন্মায় এবং যাদের জীবনচক্রের বিকাশ বন্য পরিবেশে হয়, তারাই বন্যপ্রাণী। যেমন: বাঘ, হাতি, হরিণ, বনের পাখি, সরীসৃপ ইত্যাদি।

একই সঙ্গে তফসিল-৪ এ তালিকাভুক্ত সংরক্ষিত উদ্ভিদের ক্ষতিসাধন, ধ্বংস, সংগ্রহ বা পরিবহনও নিষিদ্ধ। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হাট-বাজার বা অন্য কোনো মাধ্যমে বন্যপ্রাণী কেনাবেচার বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্য পরিচালনাও আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আইনের ৩৩ ধারায় বলা হয়েছে, লাইসেন্স ছাড়া এবং নির্ধারিত শুল্ক বন্দর ব্যতীত অন্য কোনো পথে কোনো বন্যপ্রাণী, এর অংশ, ট্রফি, অসম্পূর্ণ ট্রফি, বিদেশি প্রাণী কিংবা সংরক্ষিত উদ্ভিদ বা এর অংশ বাংলাদেশে আমদানি বা বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা যাবে না। এ ছাড়া প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে সাইটিস (CITES) সার্টিফিকেট, পারমিট, অনাপত্তিপত্র (No Objection Certificate) এবং সাইটিসের আওতাবহির্ভূত প্রজাতির ক্ষেত্রে অনাপত্তিপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক।

আইন অনুযায়ী, আমদানি বা রপ্তানির সময় সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী, ট্রফি, বিদেশি প্রাণী বা সংরক্ষিত উদ্ভিদ কাস্টমস বন্দর থেকে ছাড় করতে হলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ইস্যুকৃত কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট প্রদর্শন করতে হবে। পাশাপাশি প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে নমুনা বা প্রজাতি শনাক্ত করার বিধানও রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান জানান, ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যেসব বিদেশি (এক্সোটিক) প্রাণি বিক্রি হচ্ছে সেগুলো দেশের জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।

ড. জামান বলেন, "এক্সোটিক প্রজাতিগুলো সাধারণত নতুন পরিবেশে দ্রুত অভিযোজিত (Highly Adapted) হতে সক্ষম। ফলে কোনোভাবে এসব প্রাণি প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়লে তারা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশীয় প্রজাতির আবাসস্থল ও খাদ্যসম্পদের ওপর প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে। এতে দেশীয় প্রাণীর সংখ্যা কমে যেতে পারে, এমনকি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।"

ড. ফিরোজ জামান সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে দেশে যেসব এক্সোটিক প্রাণী ইতোমধ্যে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব এখনই দৃশ্যমান। 

উদাহরণ হিসেবে তিনি মুক্ত জলাশয়ে 'সাকার ফিশ'-এর অবাধ বিস্তারের কারণে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি এবং ঢাকার হাতিরঝিলে 'রেড-ইয়ার স্লাইডার' কচ্ছপের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। 

তার মতে, এখনই যদি এই লাগামহীন অবৈধ বাজার ও অবমুক্তকরণ রোধ করা না যায়, তবে এই বিদেশি প্রজাতিগুলো দেশীয় প্রাণীর আবাসস্থল ও বাস্তুতন্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে, যার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব এড়ানো অসম্ভব হবে।

তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের অনেক দেশে জীবিত বিদেশি প্রাণী বা কীটপতঙ্গ অনুমতি ছাড়া বহন বা আমদানি করা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং আইন ভঙ্গ করলে জেল-জরিমানাসহ কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। 

কিন্তু বাংলাদেশে এ বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের বড় ধরণের ঘাটতি রয়েছে।

তার মতে, দেশে বহু বছর ধরেই এক্সোটিক প্রজাতির ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ উদ্যোগ নিতে পারেনি। 

তিনি দ্রুত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কার্যকর নীতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোর দাবি জানান।

ঘরে কোন কোন প্রাণি পোষা বৈধ

প্রাণিকল্যাণ আইন ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, যেসব প্রাণী ঐতিহাসিকভাবে মানুষের সঙ্গেই বসবাস করে আসছে এবং বেঁচে থাকার জন্য বন্য পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল নয়, সেসব প্রাণী ঘরে পোষা যায়। এর মধ্যে কুকুর ও বিড়াল অন্যতম।

এ ছাড়া বন্যপ্রাণী আইনের আওতাভুক্ত নয়—এমন বিদেশি প্রজাতির পাখি, যেমন লাভবার্ড, বাজরিগার, বিদেশি ঘুঘু ও ম্যাকাও লালন-পালন করা বৈধ। কারণ এসব পাখি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বন্য পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে জন্মায় না।

তবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হরিণ, কুমির বা নির্দিষ্ট কিছু বন্যপ্রাণীর খামার করতে হলে বন্যপ্রাণী আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী বন বিভাগের ‘চিফ ওয়ার্ডেন’-এর কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়া হরিণ পালন করা অপরাধ।