Footage Refutes Awami League’s Claim of No Police at the Scene of Mugdho’s Shooting

The image was enhanced using AI.
30 September 2026

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের শুরুতে ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তিনি শহীদ হওয়ার পর তার হত্যাকান্ড ঘিরে একের পর অপতথ্য ছড়িয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ।

২৮ সেপ্টেম্বর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনলাইন এক্টিভিস্ট Sushanta Das Gupta একটি ভিডিও প্রচার করে লিখেন, "মুগ্ধের বন্ধু যে বিশেষ তথ্য দিয়েছিল।"

ভিডিওতে পতিত আওয়ামীলীগ সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল দাবি করেন, মুগ্ধ নিহত হওয়ার পরদিন তিনি তার বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানে মুগ্ধের এক বন্ধু তাকে বলেছিলেন, ঘটনার সময় আশপাশে কোনো পুলিশ কিংবা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিলেন না।

নওফেলের বর্ণনায়, ওই বন্ধু তাকে বলেছিলেন, আন্দোলন শেষ হওয়ার পর তারা ঘোরাঘুরি করছিলেন এবং মুগ্ধ পানি বিতরণ করছিলেন। তখন হঠাৎ একটি “স্নাইপার শট” এসে মুগ্ধের মাথায় লাগে।

এরপর মুগ্ধের ফেসবুক পোস্টের প্রসঙ্গ তুলে নওফেল জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথা বলেন। তার দাবি, ওই সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে পোস্ট দেওয়ার পরদিন মুগ্ধকে হত্যা করা হয়।

নওফেলের বক্তব্য থেকে দুইটি দাবি পাওয়া যায়।

এক. মুগ্ধকে গুলি করার সময় ঘটনাস্থলে কোনো পুলিশ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিল না; আন্দোলন শেষ হওয়ার পর শান্ত পরিবেশে তিনি সবাইকে পানি দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ একটি স্নাইপারের গুলি এসে তার মাথায় লাগে।

দুই. মুগ্ধ মৃত্যুর আগের দিন জামায়াত-শিবির ও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় তাকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে।

ভিডিওতে মুগ্ধের শেষ সময়

দ্য ডিসেন্ট শহীদ মুগ্ধকে হত্যাকান্ডের সময়কার বিভিন্ন ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ এবং ঐ সময় মুগ্ধের পাশে থাকা আন্দোলনকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলেছে। দৃশ্যমান ভবন, দোকান ও সড়কের বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে ভিডিওগুলোর অবস্থান গুগল ম্যাপে শনাক্ত করা হয়। মুগ্ধ হত্যাকান্ডের ঐ সময়কার বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হওয়ার একই সময় প্রায় ১১০ মিটার দূর থেকে পুলিশকে মুগ্ধসহ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি চালাতে দেখা গেছে।

ফয়সাল আহমেদ নামে এক আন্দোলনকারীর ধারণ করা একটি ভিডিওতে মুগ্ধকে আজমপুর মোড়ে রবীন্দ্র সরণির প্রবেশমুখে দেখা যায়। ভিডিওটির সময়সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এটি বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটে ধারণ করা। স্থানটি গুগল ম্যাপে জিওলোকেট করেছে দ্য ডিসেন্ট। ঠিক একই জায়গায় অর্থাৎ রবীন্দ্র সরণির রাস্তার একটু ভিতরে আরেকটি ফুটেজেও মুগ্ধকে দেখা যাচ্ছে। এই ভিডিওটিও আগের ভিডিওটির কাছাকাছি সময়ে ধারণ করা হয়েছিলো বলে প্রতীয়মান হয়। গুগল ম্যাপে এই ভিডিওটির লোকেশন দেখুন এখানে।

আরেকটি ফুটেজে তাকে আহত একজনকে দেখে দৌড়ে গিয়ে সাহায্য করতে দেখা যাচ্ছে। তিনি তখন রবীন্দ্র সরণির ওয়ালটন প্লাজা ও এনআরবিসি ব্যাংকের সামনে অবস্থান করছিলেন। ভিডিওটির লোকেশন দেখুন এখানে।

‘পানি লাগবে পানি?’ বলে মুগ্ধ’র যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছিলো সে ভিডিওটাও ছিলো কাছাকাছি জায়গার। গুগল ম্যাপে ভিডিওটির লোকেশন দেখুন এখানে। মুগ্ধর বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমানের পোস্ট অনুযায়ী, এই ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিলো বিকাল ৫:৪২ মিনিট থেকে ৫:৫০ মিনিটের মধ্যে।

আরটিভিতে প্রকাশিত একটি সিসিটিভি ফুটেজের ৪৮ সেকেন্ডে এবং একটি ভিডিওর ২ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে মুগ্ধকে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়তে দেখা যায়। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, তখন সময় বিকাল ৫টা ৫০ মিনিট। গুলিবিদ্ধ হওয়ার লোকেশনটি গুগল ম্যাপে দেখুন এখানে।

ঘাতক বুলেটটি কোন দিক থেকে এসেছিলো

গুলিবিদ্ধ হওয়ার সিসিটিভি ফুটেজটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মুগ্ধসহ তার অপর দুই বন্ধু তখন দি ইষ্টি কুটুম কমিউনিটি সেন্টারের দিকে মুখ করে সড়ক বিভাজনের উপর বসে ছিলেন। মুগ্ধ বসে ছিলেন আজমপুরের সাইডে। তার ডানপাশে বাকি দুইজন।

এসময় আজমপুর মোড়ের দিক থেকে আন্দোলনকারীদের দৌড়ে আসতে দেখা যায়। মানুষকে দৌড়ে আসতে দেখে মুগ্ধকে উঠে দাঁড়াতে দেখা যায়। তারপর তাকে তার বাম দিকে অর্থাত যেদিক থেকে আন্দোলনকারীরা দৌড়ে আসছিলেন সেদিকে তাকাতে দেখা যায়। ঠিক সেই মুহুর্তেই তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন।

মুগ্ধের বন্ধু জাকিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, গুলি মুগ্ধের কপালে লাগে এবং ডান কানের পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। তবে শুধু মাথার অবস্থান ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা থেকে গুলির নির্দিষ্ট গতিপথ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

পুলিশের অবস্থান তখন কোথায় ছিলো

সেদিন সন্ধ্যায় আজমপুর মোড়ে পুলিশের গুলি চালানোর ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করেছে দ্য ডিসেন্ট। আরটিভিতে প্রকাশিত একটি সিসিটিভি ফুটেজে সেদিন সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটের আজমপুর মোড়ে রবীন্দ্র সরণির দিকের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। মোড়ের দিক থেকে তখন আন্দোলনকারীরা পুলিশের ধাওয়া খেয়ে রবীন্দ্র সরণির রাস্তা ধরে পিছু হটতে দেখা যাচ্ছে।

জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্সের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তরা পূর্ব থানার দিক থেকে একদল পুলিশ আজমপুর মোড়ের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের মধ্যে তিনজন সামনে চলে আসে।

একজন পুলিশ সদস্য আরও এগিয়ে প্রথমে বিএনএসের দিকে অস্ত্র তাক করে তিনবার গুলি ছোড়েন। পরে তিনি বাম দিকে ঘুরে রবীন্দ্র সরণির দিকে আরও তিনবার গুলি ছোড়েন। মুগ্ধ ও অন্য আন্দোলনকারীরা ওই সড়কেই ছিলেন।

গুগল ম্যাপে গুলি চালানোর লোকেশনটি দেখুন এখানে।

ভিডিওটির উৎস জানতে দ্য ডিসেন্ট অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক সালেহ মাহমুদ রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি জানান, একজন সহযোদ্ধার কাছ থেকে ভিডিওটি পেয়েছেন। তিনি সময়সংক্রান্ত একটি স্ক্রিনশটও সরবরাহ করেন, যেখানে বিকেল ৫টা ৫০ মিনিট দেখা যায়।

অর্থাৎ মুগ্ধ যে টাইমে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলো একই সময়ে। আজমপুর মোড় থেকে অর্থাৎ পুলিশের অবস্থান থেকে মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থান পর্যন্ত দূরত্ব গুগল ম্যাপ অনুযায়ী প্রায় ১১৫ মিটার।

এছাড়া সালেহ মাহমুদ রায়হান এই জায়গার বেশকিছু ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ করেছেন। তার দাবি, এই ফুটেজে যে অস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো হয়েছে এটি চাইনিজ টাইপ ৫৬ রাইফেল। তিনি জানান, এই ভিডিওটিতে অস্ত্রটি স্পষ্ট বোঝা না গেলেও অন্য দিক থেকে করা ভিডিও দেখে তারা এটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন।

এছাড়াও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করছেন জোবায়ের আহমদ। তিনিও দ্য ডিসেন্টকে নিশ্চিত করেছেন, ভিডিওতে পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্রটি চীনের তৈরি টাইপ ৫৬ অ্যাসাল্ট রাইফেল যেখানে ৭.৬২×৩৯ এমএম বুলেট ব্যবহার করা হয়।

অর্থাৎ, মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় আশেপাশে কোনো পুলিশ না থাকার কিংবা সেখানে সেসময় কোনো ভায়োলেন্স এবং কেওটিক সিচুয়েশন না থাকার যে দাবি করা হয়েছে সেটি সত্য নয়।

এছাড়াও, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি “বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত বিক্ষোভের সময়ে মানবাধিকার

লঙ্ঘন ও অপব্যবহার” শীর্ষক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনটির ২৪ পৃষ্ঠায় ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে সেদিনের ঘটনা নিয়ে বলা হয়েছে,

“বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন, পুলিশ ও র‌্যাব বিভিন্ন স্থান থেকে সামরিক রাইফেল থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি ছুঁড়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও ছবিগুলো থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, উত্তরা পূর্ব থানার ছাদ থেকে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। শতাধিক বিক্ষোভকারী গুলিবিদ্ধ হন এবং বেশ কয়েকজন গুলিতে নিহত হন। নিকটবর্তী একটি হাসপাতালে সেদিন ৯১ জন আহত রোগী এবং ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে পাঁচজন শিক্ষার্থী ছিলেন।”

সেখানে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, “ওএইচসিএইচআর দ্বারা বিশ্লেষণ করা চিকিৎসা ও ব্যালিস্টিক তথ্য নিশ্চিত করেছে যে, নিহতদের পুলিশ ও র‌্যাব প্রাণঘাতী গুলি দিয়ে হত্যা করেছিল। নিহতদের মধ্যে মীর মুগ্ধ ছিলেন, ২৫ বছর বয়সী একজন ছাত্র যিনি বিক্ষোভকারীদের মাঝে পানি বিতরণ করছিলেন। বিকেলের শেষের দিকে তার মাথায় রাইফেল থেকে প্রাণঘাতী গুলি করা হয়েছিল। ওএইচসিএইচআর দ্বারা প্রমাণিত একটি ভিডিওতে রবীন্দ্র সরণি স্ট্রিটে মীর মুগ্ধকে গুলি করার সময় ও স্থান ধরা পড়েছে।”

প্রত্যক্ষদর্শীরা কী বলছেন

২০২৪ সালের ২৬ জুলাই বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “মুগ্ধ যখন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তখন তার কাছাকাছি ছিলেন বন্ধু জাকিরুল ইসলাম। মুগ্ধ’র কপালে গুলি লাগার বিষয়ে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “গুলি লাগছিলো কপালে, মেয়েরা যেখানে টিপ পরে…ডান কানের পাশ দিয়ে গুলিটা বের হয়ে গেছে।”

এছাড়াও মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় সাথে ছিলেন তার বন্ধু নাইমুর রহমান আশিক। মুগ্ধ গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফেসবুকে এক পোস্টে বন্ধু আশিক বলেন, “এক পর্যায়ে আমরা ইষ্টি কুটুমের মুখোমুখি হয়ে রোড ডিভাইডারের ওপর বসলাম একটু বিশ্রামের জন্য। প্রথমে জাকির এরপর মুগ্ধ আর সবশেষে আমি। তখন পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গুলি করে নাই! শুধু টিয়ার শেল, স্প্রিন্টার আর রাবার বুলেটেই সীমাবদ্ধ ছিলো! হঠাৎ সবাই আমির কমপ্লেক্স আর রাজউক কমার্শিয়ালের দিক থেকে দৌড়ায় আসতেসে! ২/৩ সেকেন্ড পর মুগ্ধর পায়ের ওপরে হাত রেখে বললাম, চল দৌড় দেই। আমার বন্ধু শেষবারের মতো আমাকে বলল চল। জাকির উঠে দৌড় দিল আগে তারপর আমিও উঠে দৌড় দিলাম ৩ থেকে ৪ কদম যাওয়ার পর আমার সামনেই জাকিরকে দেখতেছি দোড়াইতেছে কিন্তু আমার পাশে মুগ্ধ নাই! পেছন ঘুরে তাকাতেই দেখি আমার বন্ধু ওই বসা অবস্থা থেকেই মাটিতে পড়ছে, চোখ ২ টা বড় করে আমার দিকে তাকায় আছে, হাতে সেই অবশিষ্ট বিস্কুট আর পানির বোতলের পলিথিন, কপালে গুলির স্পষ্ট চিহ্ন।

“আমি চিৎকার করলাম, ‘জাকির মুগ্ধ গুলি খাইসে’। সামনের দিকে একবার তাকাইয়া দেখলাম অসংখ্য পুলিশ অস্ত্র হাতে এদিকে আসতেছে! কেমন জানি গোলমাল লাইগা গেল! মাথা কাজ করতেছে না! শরীর নিস্তেজ হয়ে যাইতেসিল! একবার ভাবলাম মুগ্ধর পর্যন্ত যাওয়ার আগেই আমাকেও গুলি করবে! তবুও আমি দৌঁড়ায়ে মুগ্ধর কাছে গিয়ে ওরে ধইরা তোলার চেষ্টা করলাম পারতেছি না একা, পাশেই একজন সাহস করে আসল চেহারা মনে নাই! দুইজনে মিলে কোলে তুললাম মুগ্ধকে! পরক্ষণেই বেশ কয়েকজন মিলে ধরল! আমি রিক্সায় আবারও আগের মতোই কোলে নিয়ে হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি আর মুগ্ধর কপালে চাপ দিয়ে ধরে আছি যাতে রক্ত না বের হয়!”

আশিক লেখেন, “আমার কাছে সবকিছু কেমন স্লো মোশন মনে হচ্ছিল! কিছুক্ষণ পর ঝাপসা চোখে দেখলাম মুগ্ধর আইডি কার্ড হাতে ডাক্তার আমাকে বলতেছে, আপনার কি হয়, বললাম আমার ভাই! বলল আপনার কোথায় লাগছে? পানি খান, বেডে শুয়ে পড়েন! বললাম আমার কিছুই হয় নাই! ওর কি হইছে, বাইচা আছে? আমাকে বলল পালস খুঁজে পাচ্ছি না আপনি একটু রিল্যাক্স হয়ে বাসায় ফোন দেন! তখনও ক্লিয়ারলি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না! আমি স্নিগ্ধকে কল করলাম সাথে সাথে! বললাম মুগ্ধ গুলি খাইসে তাড়াতাড়ি ক্রিসেন্টে আয় ভাই! স্নিগ্ধ আসল, দেখল! ডাক্তার জানাইলো পালস পায় না! স্নিগ্ধ আমাকে ধরে কানতেসে আর অসহায়ের মতো ডাক্তারকে বলতেসে ভাই প্লিজ, প্লিজ ভাই আরেকবার দেখেন না!”

নওফেল তার বক্তব্যে মুগ্ধর যে বন্ধুর সাথে কথা হয়েছিলো দাবি করেছেন তিনি ছিলেন এই আশিক। নওফেলের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে আশিক দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “উনি ভিডিওতে আমার সম্পর্কে যেটা বলেছে সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার করেছে। উনার সাথে আমাদের দেখা হয়েছিল। উনারাই জোরপূর্বক আমাদের সাথে দেখা করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে, বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে উনারা মুগ্ধর পরিবারসহ আমাদের সবার সঙ্গে গণভবনে শেখ হাসিনার সাথে দেখা করার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু মুগ্ধর পরিবার রাজি হয়নি। দ্বিতীয়ত, তারা মুগ্ধর পরিবারকে ব্লাংক চেক অফার করেছিল, যেটা আমি মুগ্ধর পরিবারের কাছ থেকে জানতে পারি। সেটাও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। এরপর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নওফেল বাসায় আসেন। তিনি আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন।”

আশিক বলেন, “তখন মুগ্ধর পরিবার এবং আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুগ্ধর মৃত্যুকে নিয়ে যেন কোনো প্রকার অপরাজনীতি না করা হয়। কারণ তারা বারবার বলছিল, জামায়াত-শিবির হয়তো মেরেছে, বা এই স্ট্যাটাসের কারণে মারা হয়েছে—এ ধরনের বিভিন্ন কারণ দেখানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু আমাদের সামনেই পুলিশের গুলিতে খুন করা হয়েছে, সেই বিষয়টাকে আড়াল করে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এ বিষয়ে আমরা দ্বিমত জানাই।”

“আমরা সরাসরি বলেছিলাম, মুগ্ধ হত্যার বেশ কিছু ভিডিও ও প্রমাণ আমরা সংগ্রহ করেছি। আরও অনেক ভিডিও আমাদের কাছে আছে। আমরা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছিলাম, মুগ্ধর মৃত্যুকে নিয়ে যেন কোনো ধরনের অপরাজনীতি না করা হয়। কারণ আমরা পরবর্তীতে যেসব তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছি, সেগুলো যদি জনগণের সামনে আসে, আমরা যদি আপলোড করি, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সাধারণ মানুষ প্রকৃত ঘটনা জানতে পারবে। তাই আমরা বলেছিলাম, মুগ্ধর মৃত্যুকে নিয়ে যেন কোনো ধরনের অপরাজনীতি না করা হয়।” তিনি যোগ করেন।

নওফেলের দাবির বিষয়ে আশিক বলেন, “তিনি যে বলেছেন, আমি নাকি তাকে বলেছি, ‘ভাইয়া, আপনি সাইডে আসেন, আপনার সঙ্গে কথা বলব’—এই ধরনের কোনো কথাই তার সঙ্গে হয়নি। আর তিনি যে বলেছেন, আমি নাকি বলেছি সামনে কোনো পুলিশ ছিল না—এটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি ২৫ জুলাই ২০২৪ সালে আমার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ১৮ জুলাইয়ের পুরো ঘটনাটি নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছি। সেখানে আমি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছি, মুগ্ধ যখন গুলি খায় তখন সামনে আমি পুলিশকে অস্ত্র হাতে দেখেছি। তার সঙ্গে কথা বলার আগেই আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছি যে সেখানে পুলিশ ছিল। তাই তাকে গিয়ে আমি বলেছি যে পুলিশ ছিল না—এমন প্রশ্নই আসে না।”

তিনি বলেন, “ঠিক কোন বন্দুক থেকে গুলি এসে কার মাথায় লেগেছে, সেটা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে আমরা নিজেদের চোখের সামনে পুলিশকে গুলি চালাতে দেখেছি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ভিডিওতেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুলিশই গুলি চালিয়েছে। তাই আমার ধারণা, পুলিশের গুলিতেই মুগ্ধ মারা গিয়েছে। তবে চূড়ান্ত বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয়। আমরা আমাদের সব তথ্য-উপাত্ত সেখানে জমা দিয়েছি। আশা করছি, তারা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক বিচার করবেন।”

মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় তার কাছ থেকে ৫-৬ ফিট দূরে ছিলেন জিসান ইসলাম সাকিব। ফেসবুকে একটি ভিডিওর সূত্র ধরে তার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয় দ্য় ডিসেন্ট। ওইদিন সেখানে কী ঘটেছিলো জানতে চাইলে জিসান বলেন, “তখন সময় প্রায় চারটা প্লাস। আমরা যখন ছিলাম, পুলিশ তখন গুলি করছিল। প্রথমে আমরা উত্তরা পূর্ব থানার সামনে, মেইন রোডে গেলাম। যাওয়ার পর পুলিশ বলছিল, আমাদের গুলি করবে না। তারা পুরো থানার সামনে কয়েক প্লাটুন পুলিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। থানার ওপর থেকে, চারপাশ থেকে এবং ড্রোন দিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ করছিল—আমরা কোথায় কোথায় আছি। আমরা অনেক মানুষ ছিলাম, অনেক স্টুডেন্ট ছিল।”

সাকিব বলেন, “তারা বলল, গুলি করবে না। ঠিক আছে, স্টুডেন্টরা সামনে গেল। হঠাৎ দেখি, কোনো কারণ ছাড়াই দুইজন সামনে এসে গুলি করা শুরু করল। ওগুলো ছিল রাবার বুলেট। যখন গুলি করছিল, তখন আমার ডান পাশের আর বাম পাশের দুজনই গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। তাদের পা, হাত, বুক—অনেক জায়গায় আঘাত লাগে। রাবার বুলেটের আঘাত কেমন হয়, সেটা তো জানেন। অনেক কাটা-ছেঁড়া হয়েছিল। পায়ে লাগলে তো লাগেই। আমি মাঝখানে ছিলাম, তাই গুলি খাইনি। কিন্তু ডান ও বাম পাশে যারা ছিল, তারা গুলিবিদ্ধ হয়েছিল।”

“এরপর আমরা বাম দিকে ঢুকে পড়ি। রবীন্দ্র সরণি দিয়ে এগিয়ে যাই। তখন তারা শুধু গুলি করছিল না, টিয়ারশেলও ছুড়ছিল। টিয়ারশেলের কারণে আমাদের নাক-মুখের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমরা একটু পেছনে চলে আসি। গ্যাসের জ্বালাপোড়া কমানোর জন্য গ্যাসলাইট, পেস্ট—যা ছিল, সেগুলো ব্যবহার করছিলাম। তখনও তারা রাবার বুলেট ছুড়ছিল। কয়েকজন স্টুডেন্ট টিন নিয়ে সামনে এগোনোর চেষ্টা করছিল। পুলিশ যতই গুলি করুক, তারা পিছু হটছিল না, কারণ টিন দিয়ে নিজেদের আড়াল করছিল। আমরা একেক দল সামনে যাচ্ছি, গুলি খেয়ে ফিরে আসছি। আবার অন্য দল যাচ্ছে। টিয়ারশেল ছোড়া হচ্ছে, তবু একেক গ্রুপ সামনে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। একটু সুস্থ হয়ে আবার সামনে যাচ্ছে।”

সাকিব আরো বলেন, “সাড়ে তিনটা-চারটা থেকে মূল সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা টানা পাল্টাপাল্টি হামলা চলেছে। কিন্তু ছাত্ররা কেউ পিছু হটেনি, তাদের পিছু হটানোও যায়নি। বিএনএস থেকে শুরু করে রবীন্দ্র সরণী, আজমপুর—এই পুরো এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আমরা জায়গাগুলো ধরে রেখেছিলাম, যাতে কোনোভাবেই পিছিয়ে যেতে না হয়। পুলিশও চাইছিল, যেভাবেই হোক এই জায়গাটা দখল করতে। কারণ উত্তরবঙ্গের দিকে যাওয়ার অনেক রাস্তা এই পথের সঙ্গে সংযুক্ত।”

মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় আধা ঘণ্টা আগে তার এলাকার এক বড় ভাই, যিনি বর্তমানে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা, কপালে গুলিবিদ্ধ হন জানিয়ে সাকিব বলেন, “গুলিটি কপাল দিয়ে ঢুকে কান দিয়ে বের হয়ে যায়। ভাগ্য ভালো, ভেতরে প্রবেশ করেনি। তার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন ছিল। আমি খবর পাই, তাকে বাংলাদেশ মেডিকেলে নেওয়া হয়েছে। মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো বাঁচবেন না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তিনি বেঁচে যান। তার নাম আজিজ আব্দুল্লাহ। তিনি এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা। তার আগে মোর্শেদ গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর পারভেজ, যে তামীরুল মিল্লাতে পড়ত। সে-ই প্রথম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। তাকে মেডিকেলে নেওয়া হলে পরে আজিজ আব্দুল্লাহও সেখানে যান। যাওয়ার সময় তিনি দেখেন, পারভেজ মারা গেছে।”

“এরপর আমরা আবার রবীন্দ্র সরণিতে ফিরে আসি। সামনে যেতেই আবার গুলি আর টিয়ারশেল শুরু হয়। তখন আমার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। ওই সময়ই সম্ভবত মুগ্ধর একটি ভিডিও করা হয়েছিল। কে করেছে, নিশ্চিত বলতে পারব না। সবার হাতেই মোবাইল ছিল। সবাই খাবার, পানি, স্যালাইন নিয়ে সাহায্য করছিল। প্রচুর অভিভাবকও ছিলেন। আমার ব্যাগেও ফার্স্ট এইডের অনেক জিনিস আর স্যালাইন ছিল।

আমি তখন একটু পেছনে চলে আসি। মুগ্ধ আমার পাশেই ছিল। তার হাতে পানির বোতলের পুরো একটি প্যাকেট ছিল। সে আমাকে শেষবারের মতো একটি পানির বোতল দেয় এবং গ্যাসলাইট ধরতে সাহায্য করে। আমি পানি খেয়ে মুখ ধুই, পেস্ট ব্যবহার করি, ধোঁয়া নিই। এরপর আমরা একটু পেছনে এসে বসি। প্রায় আড়াই-তিন ঘণ্টা ধরে সেখানে ছিলাম বলে আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।

মুগ্ধ তখন সামনে বসেছিল। আমি তখন তাকে চিনতাম না। আমাদের এলাকার অনেকেই ছিল, আবার বাইরের লোকও ছিল। সে যে পরে গুলিবিদ্ধ হবে, সেটা কল্পনাও করিনি। আমরা রাস্তার পাশে গাছের ছায়ায় বসেছিলাম। আমি একটু সামনে হাঁটতেই দেখি, দূর থেকে তিন-চারজন পুলিশ এগিয়ে আসছে। পরে বিভিন্ন ভিডিও দেখে নিশ্চিত হয়েছি, তারা তিনজনই ছিল। তারা ফ্লাইওভারের নিচে এসে অবস্থান নেয় এবং তাক করে গুলি ছোড়ে।

প্রথম গুলিটাই মুগ্ধর মাথায় লাগে। আমি সেটা দেখেই সামনে দৌড় দিই। পরে দেখি, সবাই পেছন থেকে দৌড়ে আসছে। আমরা কয়েক সেকেন্ড সামনে গিয়ে আবার ফিরে আসি। এসে দেখি, মুগ্ধ মাটিতে পড়ে আছে। মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় ১০ সেকেন্ড পর আমরা তাকে ধরতে যাই। তার একজন বন্ধু আগে পৌঁছেছিল। পরে আমরা গিয়ে তাকে তুলে ধরি। তার মাথার নিচে আমার হাত ছিল। আমার দুই হাত রক্তে ভিজে যায়। আমার মোবাইলের কভার, ব্যাগ—সব রক্তে ভিজে গিয়েছিল। রিকশায় আমি তার মাথা ধরে ছিলাম। তার দুই বন্ধু ছিল—একজন রিকশার ওপর, আরেকজনও সঙ্গে ছিল। চার-পাঁচজন মিলে রিকশা ঠেলে আমরা তাকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাই।

ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়ার পর ভেতরে গেলাম। ডাক্তার বললেন, তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আসলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। তখনই তার মৃত্যু হয়েছিল। এরপর আর কিছু করার ছিল না। আমরা ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসি।”

জামায়াত-শিবির-ছাত্রদল নিয়ে পোস্ট শুধু মুগ্ধ নয়, আরো অনেকেই দিয়েছিলেন

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মুগ্ধ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন। পোস্টে তিনি লেখেন, “জামাত-শিবির, ছাত্রদলের উদ্দেশ্য কিছু কথা: ছাত্র‌ আন্দোলনে ঢুকে ছাত্র আন্দোলনটাকে রাজনৈতিক দলের আন্দোলন বানাবেন না। হ্যাডম থাকলে আগেই আসতেন আপনারা, সুযোগ সন্ধানী আচরণ করে এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যটা নষ্ট করবেন না , জাত চেনাবেন না। আপনি যদি ছাত্র হোন তবে ছাত্র হয়েই আসুন । আমাদের আন্দোলনে ছাত্র প্রয়োজন , কোনো উদ্দেশ্য হাসিলকারী নেতা নয়।”

নওফেলের দাবি, “মুগ্ধ একটা স্ট্যাটাস শেয়ার করেছিল জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে, ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। সে বলছিল, “আমাদের লেজিটিমেট মুভমেন্ট আপনারা হাইজ্যাক করছেন। টেররিস্টরা হাইজ্যাক করছে। এটা করতে দেওয়া যাবে না, দেওয়া হবে না। আমাদের এটা কিন্তু একটা লেজিটিমেট, ন্যায়সঙ্গত দাবি এবং আন্দোলন।”’ সো দিস ওয়াজ হিজ, মানে স্টেটমেন্ট ইন ফেসবুক, হ্যাঁ? এখন এটা বলার পরের দিনই কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়েছে। তো আমি তখন বললাম যে, ‘এই যে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে, শিবিরের বিরুদ্ধে যে স্ট্যাটাস দিল, ডু ইউ ফাইন্ড এনি লিংক?’”

কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, সেসময় এই ধরণের পোস্ট সবাই দিয়েছিলো যাতে আন্দোলনকে সরকার ট্যাগিং করতে না পারে।

২০২৪ সালের ৪ জুলাই বাংলাভিশনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের বলতে শোনা যায়, “এটা কোনো দলের নয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।”

এছাড়াও ১৭ জুলাই কোটা আন্দোলন ইস্যু নিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, “কোটা নিয়ে আন্দোলন এখন আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নেই। এখন রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।”

১৬ জুলাই আদিব সালেহ নামে একজন এক পোস্টে লিখেছেন, “কোটা আন্দোলন কোনো ব্যানারে হচ্ছে না। কিছু ছাত্রসংগঠন নিজস্ব ব্যানারে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আবার কেউ কেউ নিজস্ব ব্যানারে মিছিল করেছে। আমি মনে করি এটা একটা চরম ভুল হবে। ছাত্র আন্দোলন হোক ছাত্রদের ব্যানারে। আপনি যোগ দিলে সেটা চুপচাপ দিন। ঢাকঢোল পিটিয়ে তো এত বছরেও আপনারা কিছু করতে পারলেন না৷ এখনও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাঁশ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না। তাই চুপ থাকেন, নয়তো দূরে থাকেন। ঝামেলা বাড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জ্বালাতে আসবেন না।”

২০২৪এর ১৮ জুলাই মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ নামে একজন তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “এই আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের এবং গণমানুষের৷ স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে আমাদের আন্দোলন প্রশ্নবিদ্ধ করলে প্রতিহত করা হবে৷ কোনো ২য়, ৩য় বা ৪র্থ পক্ষ আমাদের মাথায় লবণ রেখে কাঁঠাল ভাঙতে আসবেন না৷”

রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্দোলকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের মাধ্যম না বানানোর জন্য করা এরকম আরো পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।

আন্দোলনকারী জিসানের কাছ থেকে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তখন মোটামুটি সবাই এধরণের পোস্ট দিয়েছিলো যাতে সরকার বলতে না পারে যে এটা রাজনৈতিক আন্দোলন। এটা তো সবারই আন্দোলন ছিলো। সো শিক্ষার্থীরা চেয়েছে যেন কেউ কোনো দলীয় ব্যানারে না আসুক।”

মুগ্ধর বন্ধু আশিকের কাছে স্ট্যাটাসটির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “স্ট্যাটাসের বিষয়টি নিয়ে যে বলা হচ্ছে, জামায়াত-শিবির বা ছাত্রদলের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে মুগ্ধকে হত্যা করা হয়েছে—এটা সঠিক নয়। ওই স্ট্যাটাসে জামায়াত-শিবির কিংবা ছাত্রদলের বিরুদ্ধে কিছু বলা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছিল, এই আন্দোলন ছাত্রদের আন্দোলন, কোনো রাজনৈতিক দলের আন্দোলন নয়। কেউ যদি আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে চান, তাহলে ছাত্র হয়েই আসবেন, রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়।

ওই স্ট্যাটাসের উদ্দেশ্য ছিল, আন্দোলনকে যেন রাজনৈতিক খাতে প্রভাবিত করা না হয়। আপনারা চাইলে মুগ্ধর স্ট্যাটাসটি আবার পড়তে পারেন। সেখানেও বলা হয়েছিল, এটি একটি যৌক্তিক আন্দোলন এবং এই আন্দোলনে রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, ছাত্র হিসেবে অংশ নিতে। আমরা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। সেই আন্দোলনের উদ্দেশ্য যেন অন্যদিকে প্রবাহিত না হয় এবং আন্দোলনের মূল মোটিভ যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সে কারণেই মুগ্ধ ওই কথাগুলো লিখেছিল।”

অর্থাৎ, মুগ্ধ যেরকম পোস্ট দিয়েছিলেন, সেরকম আরও অনেকেই দিয়েছিলেন। এই পোস্টের কারণেই যদি তাকে হত্যা করা হতো, তাহলে একই ধরনের পোস্ট দেওয়া অন্যদেরও টার্গেট হওয়ার কথা। কিন্তু সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। অর্থাৎ, শুধু ওই স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণেই মুগ্ধকে হত্যা করা হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়াও, মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঠিক একই সময়ে পুলিশকে গুলি চালাতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরাও একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন।