World Cup Fever Fuels Fake News in Bangladesh Media
বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু মাঠের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনেও। বিশ্বকাপকে ঘিরে অসংখ্য ছবি, ভিডিও, উক্তি ও বিভিন্ন তথ্য যাচাই ছাড়াই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের মূলধারার অনেক সংবাদমাধ্যমও এসব বিভ্রান্তিকর দাবি ও ভুয়া তথ্যকে যাচাই না করেই সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করেছে।
দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, গত ১১ জুন ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত প্রায় এক মাসে বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট অন্তত ৯টি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর খবর দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে পুরোনো ছবি-ভিডিওকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে, ভিন্ন দেশের ফুটেজকে বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট দাবি করে, এআই-নির্মিত কনটেন্টকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে এবং ভিত্তিহীন বা মনগড়া উক্তিকে খেলোয়াড় ও কোচদের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব দাবির সত্যতা যাচাই করে দ্য ডিসেন্টসহ বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান সেগুলো খণ্ডন করেছে।
নিচে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এমন ৯টি দাবির ফ্যাক্টচেক তুলে ধরা হলো।
ভিত্তিহীন উক্তিকে হালান্ডের নামে প্রকাশ
বিশ্বকাপ চলাকালে নরওয়েজিয়ান ফুটবলার আর্লিং হালান্ডের নামে একটি ভিত্তিহীন উক্তি প্রকাশ করে ডেইলি স্টার, যুগান্তরের ছাপা সংস্করণ, এশিয়া পোস্ট, এটিএন নিউজ, সময়ের আলোসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। খবরে দাবি করা হয়, হালান্ড বলেছেন, “মেসি আমাকে কখনোই বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট ছুঁতে দেবে না।”
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে হালান্ডের কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন মন্তব্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, একটি এডিট করা স্ন্যাপচ্যাট স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে যাচাই ছাড়াই এ খবরগুলো প্রকাশ করা হয়েছে।
রোনালদোকে নিয়ে ভুয়া উক্তি প্রচার
স্পেনের কাছে হেরে পর্তুগালের বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর সাবেক পর্তুগাল কোচ ফের্নান্দো সান্তোসের নামে একটি ভুয়া বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে ফটোকার্ড প্রকাশ করে যমুনা টেলিভিশন, নাগরিক টিভি এবং সময়ের আলো। প্রকাশিত সেই ফটোকার্ডটিতে দাবি করা হয়, সান্তোস বলেছেন, “একটি নকআউট ম্যাচে রোনালদোকে বেঞ্চে রাখার কারণে আমাকে পর্তুগালের কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর আজ সবাই দেখল, কোচ রোনালদোকে পুরো ৯০ মিনিট খেলাতে চাওয়ায় গনসালো রামোস মাঠে নামার সুযোগই পেল না।”
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে এই দাবির কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম এবং পর্তুগিজ গণমাধ্যমে অনুসন্ধান করেও ফের্নান্দো সান্তোসের এমন কোনো মন্তব্যের অস্তিত্ব মেলেনি, এমনকি বিশ্বকাপ থেকে পর্তুগালের বিদায়ের পর তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার বা প্রতিক্রিয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি।
রোনালদোর বিদায়ে এআই ভিডিওকে ড্রোন শো দাবি
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিদায় উপলক্ষে মাদেইরায় ড্রোন শোর আয়োজন করা হয়েছে—এমন দাবি করে একটি এআই-নির্মিত ভিডিও প্রকাশ করে ইত্তেফাক, দ্য নিউজ, ঢাকা টুডে, বাংলা টিভিসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি এবং পর্তুগালে রোনালদোর সম্মানে এমন কোনো ড্রোন শোর আয়োজনের তথ্য পাওয়া যায়নি। ভিডিওটির মূল প্রকাশকারী নিজেই এটিকে এআই-নির্মিত বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া এআই শনাক্তকরণ টুলেও ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
মরিনিয়োর ভুয়া মন্তব্য আল জাজিরা হয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে
আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচের রেফারিং নিয়ে হোসে মরিনিয়োর নামে একটি মন্তব্য প্রকাশ করে আল জাজিরা। সেই প্রতিবেদনকে সূত্র ধরে বাংলানিউজ২৪ ডট কম, যুগান্তর, কালের কন্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ইত্তেফাক, আমার দেশ, এখন টিভি, বাংলাভিশন, এটিএন নিউজ, নাগরিক টিভি, কালবেলাসহ বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করে।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, মরিনিয়ো কোথাও এমন মন্তব্য করেছেন—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। পরে দ্য ডিসেন্ট আল জাজিরার প্রতিবেদকের কাছে মন্তব্যটির উৎস জানতে চাইলে সংবাদমাধ্যমটি তাদের একটি প্রতিবেদন থেকে ওই উদ্ধৃতি সরিয়ে সংশোধনী প্রকাশ করে এবং জানায়, আরও পর্যালোচনার পর মন্তব্যটির কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস পাওয়া যায়নি।
মিশরের প্রতি মরক্কোর সংহতির দাবিতে পুরোনো ছবি প্রচার
আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচের পর মিশরের প্রতি সংহতি জানিয়ে মরক্কো জাতীয় ফুটবল দল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছে—এমন দাবি করে কালবেলা, আরটিভি, ডেল্টা টাইমসসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
তবে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের যাচাইয়ে দেখা যায়, মরক্কো ফুটবল দলের কোনো ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে এমন পোস্ট করা হয়নি। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত মরক্কো দলের খেলোয়াড় ও কোচদের ছবিগুলোও সাম্প্রতিক নয়; এগুলো গত মার্চে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ প্রি-ইভেন্ট অ্যাকসেস ডে-তে তোলা পুরোনো ছবি, যা ভুল প্রেক্ষাপটে প্রচার করা হয়েছে।
রোনালদোকে নিয়ে জর্জিনার ভুয়া পোস্ট ও এআই ছবি প্রচার
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ বিদায়ের পর তার সঙ্গী জর্জিনা রদ্রিগেজের আবেগঘন পোস্ট দাবিতে একটি এআই-নির্মিত ছবি ও ভুয়া ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট প্রচার করে একাত্তর টিভি।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি এবং এটি জর্জিনার কোনো অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত হয়নি। বরং জর্জিনার নামে পরিচালিত একটি ভুয়া ফেসবুক পেজ থেকে পোস্টটি ছড়ানো হয়।
আইসা মান্দির নামে ভুয়া উক্তি প্রকাশ করল একাধিক সংবাদমাধ্যম
আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচে লিওনেল মেসিকে ঘিরে বিতর্কের পর আলজেরিয়ান ডিফেন্ডার আইসা মান্দির নামে “গত রাতে যদি আমার গোড়ালি ভেঙেও যেত, তবু মেসি কোনো কার্ড পেত না”—এমন একটি উক্তি প্রকাশ করে মাছরাঙা টিভি, চ্যানেল২৪, স্টার নিউজ, টি-স্পোর্টস, কালবেলা, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, আমাদের সময়, ইত্তেফাকসহ আরো অনেক সংবাদমাধ্যম।
তবে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের যাচাইয়ে দেখা যায়, মন্তব্যটির কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস নেই। এটি মূলত একটি অনির্ভরযোগ্য ফুটবলভিত্তিক এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো একটি ভুয়া স্ক্রিনশটের ওপর ভিত্তি করে প্রচারিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বা আইসা মান্দির কোনো অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মন্তব্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বরং রয়টার্সকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় মান্দি মেসিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রশংসাই করেছিলেন।
টনি ক্রুসের নামে ভুয়া উক্তি প্রচার
আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচের রেফারিং বিতর্ক নিয়ে জার্মান ফুটবল কিংবদন্তি টনি ক্রুসের নামে একটি মন্তব্য প্রচার করে স্টার প্লে। পোস্টে দাবি করা হয়, ক্রুস আর্জেন্টিনার পক্ষে রেফারির পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নাকচ করে একটি দীর্ঘ মন্তব্য করেছেন।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে টনি ক্রুসের কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাক্ষাৎকার বা নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সূত্রে এমন বক্তব্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, যাচাই ছাড়াই তার নামে একটি ভুয়া উক্তি প্রচার করা হয়েছে।
রেফারি ও ফিফার দুর্নীতির দাবিতে পুরোনো ভিডিও প্রচার
আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচের রেফারিং বিতর্কের প্রেক্ষাপটে 'রেফারি ও ফিফার দুর্নীতির কারণে স্টেডিয়ামে মর্মান্তিক ঘটনা' দাবিতে একটি পুরোনো ভিডিও প্রচার করে দৈনিক ইনকিলাব।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটির সঙ্গে বিশ্বকাপ বা আলোচিত ম্যাচের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি মূলত ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্যারাগুয়ের দুই ক্লাব অলিম্পিয়া ও সেরো পোর্তেনিওর ম্যাচ চলাকালে সমর্থক ও পুলিশের সংঘর্ষের ভিডিও, যা ভুল প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে।